নদীকে নিজের মতো বাঁচতে দিতে হবে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:২৩ এএম

কানাডার খ্যাতনামা নদী বিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলা ১৯৮০ সালে নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘বিসি রিভারর্স ডে’ পালনের উদ্যোগ  নেন এবং  সেই সূত্র ধরে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া (বিসি) ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বিশ্ব নদী দিবসের শুভযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে। ‘বিসি রিভারর্স ডে’ পালনের সাফল্যের হাত ধরেই ‘বিশ্ব নদী দিবস’ আন্তর্জাতিক রূপ পায় এবং অদ্যাবধি পৃথিবীর ৬০টি দেশে বিশেষ মর্যাদায় বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ নদী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরি করতে ‘জীবনের জন্য জল দশক’ ঘোষণা করে এবং ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ নদী দিবস পালন করে আসছে। এ বছর নদী দিবস উপলক্ষে ‘নদী একটি জীবন সত্তা, এর আইনি অধিকার নিশ্চিত করি’ স্লোগানকে সামনে রেখে বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে।

যে নদীর জন্য এই নদী দিবসের এত আয়োজন সেই নদীই আজ দখলে-দূষণে ভারাক্রান্ত, জরাজীর্ণ। দেড় হাজার নদীর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশে বছরজুড়ে নাব্যসম্পন্ন নদীর অস্তিত্ব রয়েছে মাত্র ২৩০টির। হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় আজ প্রতীয়মান বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীই হয়ে পড়েছে বিপন্ন, অস্তিত্বহীন। বাংলাদেশের নগর-সভ্যতার বিকাশে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উজান থেকে নেমে আসা পানি সংকট নদ-নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় নেতিবাচক ভূমিকা  রেখে চলেছে।  নিয়ন্ত্রণহীন  দখল-দূষণে পিষ্ট হয়ে মরে গেছে অধিকাংশ নদ-নদী, খাল-বিল। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পাশ ঘেঁষে বহমান ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় দখলের ফলে পানিধারণ ক্ষমতা ক্রমশ কমে গেছে। মাত্রাতিরিক্ত দূষণ বুড়িগঙ্গার পানির স্বাভাবিক রং পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। বৃষ্টির পানির মিশ্রণও দূর করতে পারছে না দূষণের মাত্রা। বর্তমান অবস্থায় বুড়িগঙ্গার কয়েকটি অংশের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কাছাকছি নেমে আসে। পানির অম্ল এবং ক্ষারের মাত্রা নির্দেশক (পিএইচ মান) হয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক। এমনকি বুড়িগঙ্গার পানির বিদ্যুৎ-পরিবাহিতা স্বাভাবিক মাত্রার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গায় এখন কোনো জলজ প্রাণী ও মাছ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই।

আজ প্রায় দুই কোটি জনঅধ্যুষিত ঢাকা শহরের সকল কঠিন ও তরল বর্জ্যরে অপসারণ ক্ষেত্র হচ্ছে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ। রাজধানী ঢাকার এককালের জলধারায় কুলকুল ধ্বনিতোলা ২৭টি খালও আজ চলে গেছে দখলদারের হাতে। মাটি, বালু ফেলে অনবরত ভরাট করে ফেলা হচ্ছে নদীপাড়, কালক্রমে পুরো নদীই। আজ তাই বেশিরভাগ নদী মৃত। ভরাট জমিতে নদীর পাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ দালানকোঠা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান। নদীর পাড় দখল করে দেদার চলছে বালু, কাঠ বিক্রির রমরমা ব্যবসা। এমনকি সরকারি ভূমিতে প্লট তৈরি করে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন। দেশের বিভিন্ন নদীর তীরে রয়েছে হাজারো রকমের জাহাজভাঙা ও লঞ্চ-স্টিমার মেরামত শিল্প। জলযানের ভাঙা অংশ, তেল, মবিল, তেলজাত সামগ্রী সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীতে। পুরান ঢাকা, জিঞ্জিরা, কালীগঞ্জ এলাকার হাজার হাজার ছোট-বড় কলকারখানার তৈলাক্ত বর্জ্য, ছাপাখানা, টেক্সটাইল, কাপড় ডাইংয়ের বিষাক্ত রাসায়নিক রং প্রতিনিয়ত মিশছে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানিতে। এমনকি হাজারীবাগের ট্যানারির মারাত্মক পানি দূষণকারী রাসায়নিক বর্জ্য কোনো পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি অপসারণ করা হয় বুড়িগঙ্গায়। ঢাকা ওয়াসার হিসাবমতে, প্রতিদিন ঢাকা মহানগরের ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। হাজারীবাগ ট্যানারি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিতে মিলিত হচ্ছে। এসব বর্জ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক এসিড। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার ১৮টি স্থানের মধ্যে ৭টিতে ট্যানারিসহ শিল্পবর্জ্যরে কারণে ভয়াবহ দূষণ হচ্ছে। ওয়াসার স্যুয়ারেজ অপসারণের ক্ষেত্র হচ্ছে বুড়িগঙ্গা। হাসপাতাল বর্জ্যরে মিশ্রণজনিত কারণেও নদ-নদীর ভয়াবহ দূষণ ঘটে। নদী তীরবর্তী বসতবাড়ি ও বাজারের সকল ধরনের বর্জ্য ফেলা হয় বুড়িগঙ্গায়। 

শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, শিল্প নগরী নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে দেশে শিল্পজনিত নদীদূষণের মাত্রা বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলের সীতাকু-ে প্রতিষ্ঠিত জাহাজভাঙা শিল্পবর্জ্যে নিয়ন্ত্রণহীন ঘটছে পরিবেশ দূষণ। জাহাজভাঙা শিল্প  থেকে নিঃসরিত অপরিচ্ছন্ন তেল, মবিল সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় পানি হয়ে পড়ে বিবর্ণ। এছাড়া পুরনো জাহাজভাঙার ফলে পানিতে সিসা, তামা, দস্তা, পারদ, ক্রমিয়ামের মতো নানা বিষাক্ত ধাতব পদার্থের মিশ্রণ নিচ্ছে ভয়াবহ রূপ। ফলে পানি ছাড়াও উপকূলবর্তী এলাকার মাটিও দূষিত হয়ে পড়ছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার গাছপালার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। সমুদ্র ও নদীর  মাছ এবং উপকূলের পশুপাখির রোগ-বালাইসহ মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের পানি দূষণের ফলে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ না করলে সমুদ্র ও নদী উপকূলীয় এলাকার পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন।

দূষণে আক্রান্ত বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, মধুমতি, ধলেশ্বরী, আড়িয়ালখাঁ, পশুর, ভৈরব, বিষখালী, বালু, মনু, কপোতাক্ষ, করতোয়া, মহানন্দা, সুরমা, কুশিয়ারা, কীর্তনখোলা, বলেশ্বর, সন্ধ্যা,  খোয়াই, ধরলা,  গোমতি, পায়রা, বংশী, হালদা, খোয়াই, কালিগঙ্গা, কুমার নদী ও খাল-বিলের পানিদূষণের কারণে ভূপৃষ্ঠের পানি হয়ে পড়ছে ব্যবহার অযোগ্য। ফলে দেশের মানুষ শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানায় বসানো হচ্ছে  গভীর নলকূপ। উত্তোলন করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি। পান ছাড়াও কৃষিকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব পানি। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর ভূ-অভ্যন্তরের পানির স্তর ১ থেকে ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আর ভূগর্ভেও পানি পাওয়া যাবে না, দেখা দেবে ভয়াবহ পানি-সংকট।

বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগসহ দেশের নদ-নদীকে দখল আর দূষণের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখে নিরাপদ নৌযোগাযোগ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নদ-নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ধরে রাখতে নদীভাঙন ও নদী ভরাট রোধ করা জরুরি। এর জন্য বন্ধ করতে হবে নদীর অবৈধ দখল। নদীতে অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্যারাজ নির্মাণ করা যাবে না। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে নদীভাঙন ও মৎস্যসম্পদ বিনষ্টের সর্বনাশা আয়োজন বন্ধ করতে হবে। কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে পানির অপচয় রোধ করতে হবে। অভিজ্ঞজনের মতে, সেচকাজে বর্তমানে ব্যবহৃত পানির প্রায় অর্ধেক দিয়ে নতুন প্রযুক্তিতে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব । নদী পুনর্খনন ও নদীশাসনের জন্য পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করা হলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিওে এলে নদীদূষণরোধে সহায়ক হবে। নদ-নদীর পানিদূষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে ওয়াসার স্যুয়ারেজ নির্গমনসহ নদ-নদীর পানিতে সব রকমের কঠিন, গৃহস্থালি ও সেনিটারি বর্জ্যরে মিশ্রণ রোধ করা অত্যাবশ্যক।

নদীতীরে শিল্পকারখানা নির্মাণ বন্ধ করাসহ শিল্পকারখানার রাসায়নিক ও ট্যানারি বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করে এর নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নদী ও সমুদ্রের পাড়ে জাহাজভাঙা শিল্প, লঞ্চ, স্টিমার নির্মাণ ও মেরামতকালে নদী ও সমুদ্রের পানিতে কারখানার তৈলাক্ত বর্জ্যরে মিশ্রণ প্রতিহত করতে পারলে নদীদূষণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। কৃষিক্ষেতে ব্যবহৃত  রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মিশ্রিত পানি যাতে খাল-বিল-নদীতে না এসে মিশতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সমুদ্রে কোনোরূপ তেজস্ক্রিয় পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাসহ নদীদখল ও দূষণকারীদের আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। নদ-নদী দখল ও দূষণরোধে দেশের আপামর জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হতে পারে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নদ-নদীর ভয়াবহ দখল ও দূষণরোধ করে বাংলাদেশের নদ-নদীর পূর্বের চেহারায় ফিরিয়ে আনতে পারলে বাংলাদেশের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ সামগ্রিক পরিবেশ-প্রতিবেশ উন্নত হবে। নদীর দূষণ বন্ধ হলে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমে যাবে, পানির স্তর নেমে যাবে না নিচে। নদ-নদীর পানি মাছসহ জলজ প্রাণীর নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র  হবে।

নদীকে ঘিরেই চলছে সভ্যতার ক্রমবিকাশ। তাই নদীর পানিপ্রবাহ সচল রাখতে, নদীদূষণ রোধ করতে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত নিয়ন্ত্রণ। নদী আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন হলে তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের নদীগুলো চূড়ান্ত অর্থে আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদ-নদীর জীবন্ত সত্তা টেকসই করতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর প্রবাহের গুণগত ও পরিমাণগত মান সুরক্ষিত রাখতে হবে।  জীবন্ত সত্তা নদীর আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। নদী সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ-১৯৯৭ জাতীয় সংসদে দ্রুত অনুস্বাক্ষরের ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত স্বেচ্ছাচারিতার বশবর্তী হয়ে বর্জ্যরে ভারে নদ-নদীর পানি যেন না হয় দূষিত, দখলের কব্জায় পড়ে নদীর গতিপথ যেন না হয় সংকুচিত, যেন সমুদ্রের অতল জলরাশির জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন জোগান দেওয়া অফুরান শৈবাল যেন না হয় বিপন্ন সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। যে নদ-নদী সমুদ্রের অফুরান জলধারা সৃষ্টির অপূর্ব রহস্য, তাকে নিজের মতো বাঁচতে দিতে হবে।

লেখক

প্রকৌশলী ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত