হঠাৎ অভিযান কেন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:০১ পিএম

দেশটা যে অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে সে কথা মৃদু আকারে হলেও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আসছিল। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর হচ্ছিল বেশ জোরেশোরেই। পত্রিকার কলাম ও টিভি টকশোতেও আলোচনা হচ্ছিল। দুর্নীতি বিষয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণকারী দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোও কিছুটা আওয়াজ দিচ্ছিল। কিন্তু সে কথায় কান দেওয়ার সময় ছিল না শাসকদের। কখনো তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরলে বলা হতো, বিএনপির আমলেও দুর্নীতি ছিল। ভাবখানা এমন যে বিএনপির আমলে দুর্নীতি হয়েছে বলে এখনকার দুর্নীতি জায়েজ।

 

কিন্তু চাইলেই কি আর সব ঢেকে রাখা যায়? যখন একটা বালিশ কিনে ফ্ল্যাটে ওঠাতে লাগে সাত হাজার টাকা, হাজার টন কয়লা বাতাসে খেয়ে ফেলে, ৩২০ টাকার বই হয়ে যায় ৮৮ হাজার টাকা, একটা পর্দার দাম হয়ে সাড়ে সাঁইত্রিশ লাখ টাকা, এক শিট টিন বা একটা সিলিং ফ্যানের দাম হয় এক লাখ টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসায় তার চা-রুমে বসার একটা চেয়ারের দাম হয় ৫০ হাজার টাকা, তখন হয়তো একটু  নাড়াচাড়া না দিয়ে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। যাক, এতদিন ধরে বলে আসা অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। এতদিন পরে হলেও গোয়েন্দা রিপোর্ট আমলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি লাগামহীন হয়ে পড়েছে, শুধু এই কারণেই কি হঠাৎ শুরু হয়ে গেল এই অভিযান? এই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে। চলছে নানান রকম বিশ্লেষণ। দুর্নীতি ও লুটপাটের এই চিত্র তো আগেও জানা ছিল। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে এমন সাঁড়াশি অভিযান শুরুর নির্দেশ এলো? দেশের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মতোই এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বিবিসি বাংলা। শেখ হাসিনা কেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ সজাগ হলেন শিরোনামে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সাংবাদিক কাদির কল্লোলের রিপোর্টটিতে অভিযানের যে সম্ভাব্য কারণগুলো তুলে ধরা হয় তা এই রকম

 

এক.  আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক বড় দুর্বলতা হচ্ছে গত দুটি নির্বাচন। দুটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সে জন্য ‘উন্নয়নের গণতন্ত্রের’ সেøাগান দিয়েছে আওয়ামী লীগ বা সরকার। কিন্তু সেই ‘উন্নয়নের যাত্রাতেও’ তারা ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু নেতা ‘দানবের মতো চেহারা’ নিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তা মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ তৈরি করেছে এবং আওয়ামী লীগের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় চলে গেছে। এখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটা ‘ইতিবাচক ভাবমূর্তি’ তৈরি করতে চাইছে।

দুই. ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর অনেকের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের কারণে মানুষের মাঝে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ বড় ইস্যু হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ বা সরকারের অস্তিত্বই সংকটে পড়েছে। ফলে দলের অস্তিত্ব বা সরকারকে রক্ষা করার বিষয়ও একটা কারণ হতে পারে।

তিন. এছাড়া বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে এমন একটা অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বই পারে নিজেদের দলে বা সরকারের ভেতরে স্বচ্ছতা আনতে। দুর্নীতি দমনে অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে এমন আলোচনার সুযোগ যাতে না হয়।

চার. আওয়ামী লীগ যেহেতু গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা এমন সব অভিযোগের মুখে রয়েছে, সেজন্য ‘দুর্নীতিবিরোধী’ একটা অবস্থান তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে কাছে টানার একটা চেষ্টাও থাকতে পারে।

পাঁচ. সরকারের পদক্ষেপ বা চলমান অভিযান নিয়ে আওয়ামী লীগের মাঠের নেতাকর্মীদের মাঝে কোনো ধারণা ছিল না।

 

সেজন্য কোনো কোন্দল থেকে দলে বা সহযোগী সংগঠনগুলোতে কোনো অংশকে কোণঠাসা করার জন্য এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এমন অনেক জল্পনা-কল্পনাও রয়েছে। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণও মিস্টার কাদির কল্লোলের কাছাকাছিই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে যে বিষয়টি নিয়ে সবাই মুখ খুলতে অস্বস্তিবোধ করেন ও এড়িয়ে যান, সে বিষয়ে সামান্য ইঙ্গিত দিয়েছেন সাংবাদিক কাদির কল্লোল। তা হলো ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কোনো অংশকে কোণঠাসা করার জন্য’ এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে কি না। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই কোন্দলের বিষয়টিই থাকে আলোচনার কেন্দ্রে। যে কারণেই হোক, অভিযানটা যে শুরু হয়েছে এটাই বড় কথা। ইতিমধ্যে এ অভিযানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে যুবলীগ নেতা সম্রাটকে গ্রেপ্তার না করায় সন্দেহের ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে। সে সঙ্গে যোগ হয়েছে বিউটি পার্লার ও বারের মতো জায়গায় অভিযানের বিষয়টি। বর্তমানে যে মোটিভ নিয়ে দুর্নীতিকে টার্গেট করে অভিযান শুরু হয়েছে তার সঙ্গে বিউটি পার্লার-বার এক কাতারে আসে না। অনেকেই মনে করছেন, অভিযানটিকে বিতর্কিত ও দুর্বল করে ভিন্নপথে নিয়ে যাওয়ার কৌশল এটি।

 

এ অভিযানের পরিণতি যাই হোক। এ পর্যন্ত যে সব তথ্য পাওয়া গেছে তাও কম নয়। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া সবচেয়ে আলোচিত দুই যুবলীগ নেতা জি কে শামীম ও খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার যে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা ও অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে সেটা সাধারণ মানুষকে চোখ কপালে তুলতে বাধ্য করেছে। জি কে শামীমের বাসায় যে কোটি টাকার ওপরে ক্যাশ ও প্রায় দুইশ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে তারচেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হলো তিনি কাদের টাকা দিয়ে পেলেপুষে রাখতেন। সংবাদমাধ্যমে এসেছে, জি কে শামীম ঠিকাদারি কাজ পেতে দুজন সাবেক প্রকৌশলীকেই ঘুষ দিয়েছেন দেড় হাজার কোটি টাকা। কাজ পেতে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সম্প্রতি ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। গণপূর্তের ঢাকা জোনের আরেক সদ্য সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকেও ঘুষ দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা। দৈনিক সমকাল (২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯) লিখেছে, শামীম প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা ও কিছু নেতাকে ম্যানেজ করেই ‘ঠিকাদার মোগলে’ পরিণত হন। ক্ষমতাসীন দলের এক শীর্ষ নেতাকে ‘সন্তুষ্ট’ রাখতে নিয়মিতই মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো। এর বাইরেও তার অর্থভোগীর তালিকা অনেক দীর্ঘ। দুজন প্রকৌশলীর নাম লিখলেও ক্ষমতাসীন দলের যে শীর্ষ নেতা, রথী-মহারথীকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতেন শামীম তাদের নাম প্রকাশ করতে কেন শঙ্কিত বা সংকোচ বোধ করেছে পত্রিকাগুলো সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

 

পিয়ন থেকে যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক হওয়া কাজী আনিসুর রহমানের মাত্র সাত বছরে অর্জিত সম্পদ দেখলেও অনেকে ভিমড়ি খেতে পারেন। কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে ২০০৫ সালে যখন যোগ দেন তখন তার বেতন ছিল মাসে মাত্র ৫ হাজার টাকার মতো। সাত বছরের মাথায় বনে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক। তিনি এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। (সূত্র-প্রথম আলো)। আওয়ামী লীগের থানা পর্যায়ের মধ্যম সারির নেতাদের পর্যন্ত দুর্নীতি ও অবৈধ টাকার পরিমাণ যে কত সেটা এ অভিযান না হলে বুঝা যেত না। ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক ও তার ভাই একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া এবং তাদের এক কর্মচারী ও এক বন্ধুর বাসায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা, ৮ কেজি সোনা এবং ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এই গুণধর সহোদর আবার ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের শেয়ারহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রক। অভিযানে এখনো যে পর্যায়ের নেতাদের ধরা হচ্ছে, তাদেরই যে পরিমাণ অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও মাদকের সন্ধান মিলছে তাতে আরেকটু ওপরে গেলে যে কী বের হবে আল্লাহ মালুম। সে কারণেই অভিযান নিয়ে অনেকের উচ্ছ্বাস থাকলেও একই সঙ্গে শঙ্কাও আছে এর পরিণতি নিয়ে।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের চোর-ডাকাত-দুর্নীতিবাজদের ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে আমরা খুশি। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনুগতরা এমনভাবে বলতে শুরু করলেন যে নিজ দলের বিরুদ্ধে এমন অ্যাকশন শুধু শেখ হাসিনাই নিতে পারেন। কিন্তু তারা ভুলে যান, ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার বছর না পেরুতেই ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে যে অপারেশন ক্লিনহার্ট শুরু হয়েছিল তা চলেছিল ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। তখন বিএনপি দলীয় দুজন প্রভাবশালী এমপিকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সে অভিযানে। শুধুই অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি দলের এমন প্রভাবশালী এমপিকে গ্রেপ্তার করার নজির এদেশে কয়টা আছে? ডেভিডসহ অনেক ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতার মৃত্যু হয়েছিল সে অভিযানের সময়। কোনো সরকারের সময়ে সরকারি বাহিনীর অভিযানে সরকারি দলের এত সংখ্যক নেতা নিহত হওয়ার ঘটনা এ দেশে আর নেই। যদিও বিচারবহির্ভূত সে হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যাপক সমালোচিত হয় বিএনপি।

 

এখনকার অভিযানে গ্রেপ্তারদের অবস্থান খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, খালেদা জিয়ার সরকারের সেই অভিযানের ধারেকাছেও পৌঁছায়নি এটা। প্রধানমন্ত্রী নাম উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। অপরিকল্পিতভাবে শুরু করা সেই অপারেশন ক্লিনহার্ট করেও বিএনপি সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে সফলতার দাবিদার হতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকারও এ অভিযানকে সঠিক পরিণতিতে নিয়ে যেতে না পারলে এটা যে তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে।লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত