কথিত আছে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের দিকে মানুষ ব্যবসায়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল এবং খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ এর মধ্যে বণিকরা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। ক্রেতা বা গ্রাহকদের সঙ্গে তাদের আচরণ এবং ক্রেতাদের চাহিদা কীভাবে পূরণ করা যায়, সেসব ধারণা বণিকদের আগে থেকেই ছিল। শিল্পযুগের সূচনা গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে বিশাল এবং নতুন চ্যালেঞ্জ এনেছিল। তথ্যপ্রযুক্তির উদ্ভাবন সেসব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ কমিয়ে আনার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৪৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে পণ্যের মান নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করা হয়, যার ফলে গ্রাহকেরা গুণগত মানে ভালো পণ্য ভোগ করতে পারছেন। এভাবে বিভিন্নভাবে গ্রাহক সেবার মানবৃদ্ধি করতে প্রতিনিয়ত কাজ হয়ে আসছিল।
সেই ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকে প্রাইভেট অটোমেটিক ব্রাঞ্চ একচেঞ্জ (চঅইঢ) বিপুলসংখ্যক কল পরিচালনা করতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর ফলে একজন ক্রেতা সহজেই বিক্রয়-পূর্ব ও পরবর্তী সেবা পেয়ে থাকে। এগুলো এখন ‘কল সেন্টার’ নামে জনপ্রিয় হয়েছে। ১৯৬৫ সালে এমআইটির কম্পেটিবল টাইম-শেয়ারিং সিস্টেম (ঈঞঝঝ) মেইল প্রথম হোস্ট-ভিত্তিক ইলেক্ট্রিক্যাল মেইল চালু করে। নব্বইয়ের দশকের পরে অনলাইনে গ্রাহকদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রাথমিক উপায় হয়ে ওঠে ব-সধরষ (ইমেইল)। এটা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যা শুধু গ্রাহক সেবাতেই না অন্যান্য যেকোনো দাপ্তরিক কাজেও বহুলভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। ১৯৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে ইন্টারেক্টিভ ভয়েস রেসপনজ (ওঠজ) আবিষ্কার করা হয়। (যে যন্ত্রটি গ্রাহককে টেলিফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ করে দেয়)। সেই একই সময় গ্রাহক সম্পর্কের ব্যবস্থাপনায় (ঈজগ) ডেটাবেস সফটওয়্যার গ্রাহক সেবাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। নতুন ডস-চালিত অফিস কর্মীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য হেল্প ডেস্কের উত্থান ঘটে ঠিক একই সময়ে। আশির দশকের শেষের দিকে কোয়ান্টাম লিঙ্কটি কমোডোর ৬৪৮ এর জন্য অনলাইন মেসেজ (ঙখগ) তৈরি করে, (তাৎক্ষণিক বার্তা প্রেরণের পথ) এবং পরবর্তীকালে সরাসরি চ্যাট আবিষ্কার করে। কোয়ান্টাম লিঙ্কটি পরে আমেরিকান অনলাইন (অঙখ)-এ রূপান্তরিত হয়ে যায়। এসব শুধু গ্রাহক সেবার উন্নত এবং আধুনিক মানের কথা চিন্তা করেই এগোতে থাকে। মানুষের আচরণ, চাহিদা, স্বাদ, সামর্থ্য ইত্যাদি মাথায় রেখে সেবার মান কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে।
১৯৮৩ সালে ‘কল সেন্টার’ শব্দটি তৈরি হয়েছিল। ২০০০ সালের দিকে এগুলো ‘পরিষেবা ডেস্ক’ বা হেল্প ডেস্ক ধারণাটিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে কম্পিউটার টেলিফোন ইন্টিগ্রেশন (ঈঞও) টেলিফোন সিস্টেমে গ্রাহকদের আচরণ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে ওঠজ প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ শুরু করে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। উল্লেখ্য, গ্রাহক পরিষেবা সপ্তাহটি আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ হিসেবে চালু করেছিলেন ১৯৯২ সালের দিকে। ১৯৯৮ সালে জেরেমি মিলার যে প্রযুক্তিটি আবিষ্কার করেন যা লাইভ চ্যাট হিসেবে প্রকাশ পায়, পরে জি-টক, ওলার্ক এবং অন্যান্য কোম্পানি এটাকে গ্রাহকদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯৮ লাইভপারসন আত্মপ্রকাশ করে যা এখন বৃহত্তম লাইভ চ্যাট সংস্থা। ১৯৯০ এর শেষের দিকে এবং ২০০০-এর গোড়ার দিকে বিভিন্ন সংস্থা সামগ্রিকভাবে ব্যয় কমানোর জন্য অফশোর লোকেশনে আউটসোর্সিং গ্রাহক পরিষেবা গঠন করে ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। ১৯৯৯ সালে সেলসফোর্স ডটকম সিআরএম-এ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অনলাইন সহায়তা ডেস্কের উত্থান ঘটে। যা সারা বিশ্বে গ্রাহকদের কাছে সহজ সেবার মাধ্যম হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০০৬ সালে টুইটার চালু হয়েছে। ২০১১ সালের মধ্যে প্রতিদিন ৬৫৫ মিলিয়ন টুইট প্রেরণ করা হয় এবং সংস্থাগুলো যখন সমস্যাগুলো (বা প্রশংসা) পেয়ে থাকে তখন গ্রাহকদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য এবং টুইটারের সংখ্যার ভিত্তিতে ব্যক্তির ‘সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা’ উপলব্ধি করতে টুইটার একটি ভালো প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে শুরু করে। ২০০৯ সালে অ্যালার্ক প্রথম লাইভ চ্যাট তৈরি করেন যা ওয়েবের পাতায় থাকে এবং বিরক্তিকর ‘পপ-আউট’ এর প্রয়োজনীয়তা দূর করে- লাইভ চ্যাট ইন্টারনেটের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়াটির নীতি ফিরিয়ে আনে। ২০১৫ সালে ফেইসবুক মেসেঞ্জার ফর বিজনেস চালু করে এবং তাদের মোবাইল ডিভাইসে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মেসেজিং প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর গতি সেট করে। ২০১৭ সালে চ্যাট ওয়ার্ল্ড লাইভ মেসেজিং এবং লাইভ চ্যাট দ্বারা আলাদা হয়ে যায়।
ডিলন ও ম্যাকলিন ১৯৯৩ সালে ইনফরমেশন সিস্টেম সাকসেস (ওঝঝ) মডেল তৈরি করেন। এখানে তারা পদ্ধতি এবং তথ্যের গুণগত মান একজন গ্রাহকের সেবার মানকে উন্নত করতে পারে বা কাস্টমারকে তৃপ্ত করতে পারে বলে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও তারাই গবেষণা করে আরও দশ বছর পরে অর্থাৎ ২০০৩ সালে সেই মডেলকে সংশোধন করে বলেন শুধু পদ্ধতি এবং তথ্যের গুণগত মানই না সেবার গুণগত মানও এই মডেলের জন্য দরকারি। এই গবেষণায় তারা বলেন এই তিনের (ইনফরমেশন কোয়ালিটি, সিস্টেম কোয়ালিটি এবং সার্ভিস কোয়ালিটি) সমন্বয়ই একজন গ্রাহককে পরিতুষ্টি দিতে পারে। সারা বিশ্বে যেখানে গ্রাহককে লক্ষ্মী মনে করা হয়ে থাকে সেখানে বাংলাদেশে গ্রাহকদের সেবার মানের অবস্থান কোথায় একটা বাস্তব গল্পের মাধ্যমে এই লেখাটা শেষ করছি। ক্রেডিট কার্ডের দ্বারা আমি আমার যাবতীয় সাংসারিক খরচ করে থাকি, মোট কথা আমি যেখানে কার্ডের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য পরিশোধ করতে পারি, সেখানে কার্ড ব্যবহার করি। প্রতি মাসে আমি সাধারণত বাংলাদেশি টাকায় কেনাকাটা করি ও নিয়মিত বিল পরিশোধ করে থাকি। এ মাসে আমি ই-কমার্সের মাধ্যমে একটা ট্রানজেকশন করেছি। এই ট্রানজেকশনের সময় ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিসে ফোন দিলে, তারা আমাকে ফোনে অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগ না দিয়ে ইমেইলে সেই অনুরোধ জানাতে বলে। ইমেইলে জানানোর পরে ব্যাংক কর্মকর্তা ইমেইলে উত্তর না দিয়ে আমাকে ফোনে জানিয়ে দেয় যে, সেই সেবা চালু করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো গ্রাহক সেবার কাজটা তারা ইমেইলের মাধ্যমে উত্তর না দিয়ে ফোনে কেন সম্পন্ন করে?
এবারে যেহেতু আমার ২টা আলাদা বিল অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকা ও আমেরিকান ডলারের বিল ছিল আমি তাদের কাছে ফোনে জানতে চাই কীভাবে বিলটা পরিশোধ করব। তারা আমাকে জানাল যে মোট টাকা দিলেই হবে তারা আমার বাংলাদেশি টাকা ও আমেরিকান ডলারের বিলটি আলাদা করে নিয়ে নেবে। ফলে আমি ঊষবপঃৎড়হরপ ঋঁহফ ঞৎধহংভবৎ (ঊঋঞঘ) করে দিই । মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে জানতে পারি আমার বিল পরিশোধ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমার আমেরিকান ডলারের বিলটা পুরোপুরি পরিশোধিত হয়নি। বরং বাংলাদেশি টাকায় যা বিল তার থেকে তিন হাজার টাকা বেশি রেখে দিয়েছে। ব্যাংকে ফোনে জানানোর পরে তারা আমাকে বলে যে একটা ইমেইল করে বিষয়টা তাদের জানাতে। আরও বলে যে গ্রাহকের ভুলের কারণে বিলটা পরিশোধ হয়নি এটা যেন আমি ইমেইলে উল্লেখ করি। আমি তাদের কথা মতো ইমেইলে জানিয়েছি, কিন্তু আমি বলেছি তাদের ভুলের কারণে আমার বিল পরিশোধ হয়নি। তারা ইমেইলটা পায় এবং আমাকে ফোনে জানায় তারা কাজটি করবে। কল সেন্টারে আমার বারবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও তারা বলেন যে, তাদের ম্যানেজমেন্ট শুধু ফোনের মাধ্যমে উত্তর দেন। তারা মেইলে কোনো সার্ভিস দেন না, শুধুই গ্রহণ করেন। আমাদের প্রতিনিয়ত এরকম আরও অনেক জটিল অসুবিধায় পড়তে হয়। সারা বিশ্ব যেখানে গ্রাহক সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে, বাংলাদেশে সেটা কোন পর্যায়ে তা সহজেই অনুমেয়। প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে এই সেবার দুর্বলতা কোথায় তা নিয়ে সময় এসেছে ভাববার ও গবেষণার। কেননা গ্রাহকের কাছে বোধগম্য নয় দুর্বল সেবা নাকি সেবার দুর্বলতা?
লেখক : ব্যাংকার