শুদ্ধি অভিযান আর অন্ধ আশাবাদ

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৪৪ পিএম

পাকিস্তান আমলের ঘটনা। বিচারপতি ইব্রাহিম প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে অনুরোধ করেছেন উত্তম একখানা সংবিধান প্রণয়নে তৎকালীন সেনা-আমলা শাসকদের সাহায্য করতে। উত্তরে অধ্যাপক রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘আপনি সরল মানুষ তাই বিশ্বাস করেছেন।’ দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযান বিষয়ে অভিজ্ঞজনদের মতামত পড়লে প্রায়ই মনে হতে পারে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের চেয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক বেশি বিস্মৃতিপ্রবণ। স্মৃতি ও ইতিহাস যাদের ধারণ করে রাখার কথা, ‘সারল্যগুণে’ তারাই যদি তা ভুলিয়ে দেওয়ার আয়োজন করতে থাকেন, আর এর সঙ্গে যুক্ত যদি হয় আরোপিত কিংবা স্বেচ্ছাকৃত বাকসংবরণ, তাহলে সেই জাতির অন্ধকার কাটানো কঠিন। তখন সাধারণ মানুষের সম্বল হয় কাণ্ডজ্ঞান, স্বতঃস্ফ‚র্ত আশাবাদ কিংবা পূর্ব অভিজ্ঞতাজনিত নৈরাশ্য।

যেমন চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যেন অব্যাহত থাকে, সেই বিষয়ে আকুল আবেদন জানিয়েছেন অর্থনীতির শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুণী অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। তার লেখার একটা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত হলো, দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারী সূত্রপাত হয়েছে ১৯৭৫ সালের পর। প্রায় একই রকম নিবেদন জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান। তিনি অবশ্য জানিয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু এ রকম শুদ্ধি অভিযান করেছিলেন। আর এই শুদ্ধি অভিযান করতে গিয়ে তিনি বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন, চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তার দলই বিরুদ্ধতা করেছে’ (সময় টেলিভিশন)।

মঞ্জুরুল আহসান খান হয়তো ড. মঈনুল ইসলামের চেয়ে একটু কম বিস্মৃতিপরায়ণ, তার বলা বঙ্গবন্ধুর আমলের অভিযানটি অন্তত এইটুকু প্রমাণ করে, দুর্নীতির জন্ম-সালবিষয়ক ড. মইনুল ইসলামের প্রচারটি অত্যন্ত ভ্রান্ত; বড়জোর বলা যেতে পারে, জেনারেল জিয়ার আমলের দুর্নীতি পূর্ববর্তী দুর্নীতিরই ধারাবাহিকতা।

২. কিন্তু জিয়ার আমলে দুর্নীতির ধারাবাহিকতার মধ্যে আমরা একটা গুণগত পার্থক্য পাব। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের আমলটিতে দুর্নীতি-দখল-লুণ্ঠনের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে পাওয়া যাবে, তারা প্রধানত তৎকালীন শাসকদলীয় নেতাকর্মী। এদের মাঝে যেমন অন্যতম ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা, রেডক্রসের চেয়ারম্যান ছিলেন, ছিলেন ঢাকা শহরের মূর্তিমান আতঙ্কও।

জিয়ার আমলে এই দুর্নীতিতে বেসরকারি অংশটা কমে আসে। ক্ষমতার প্রধান ভাগটা যেহেতু তখন উপভোগ করছিলেন সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, সবকিছু চলছিল তাদেরই তদারকিতে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও খানিকটা দৌড়ের ওপরই ছিলেন, ফলে ভাগবাঁটোয়ারায় দুর্নীতিরও বড় অংশের মাখন জুটেছিল আমলাতন্ত্রের ভাগ্যে। এই পরিস্থিতির বিবরণ যথাযথভাবেই এসেছে ড. মইনুল ইসলামের লেখাতেওÑ ‘সুযোগ শিকারি ডানপন্থি ও বামপন্থি নেতা-পাতিনেতা-কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সিভিল আমলা, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের কেনাবেচার রাজনীতির মাধ্যমে অথবা নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে জড়ো করে সেনানিবাসে বসেই জিয়াউর রহমান গড়ে তুলেছিলেন তার রাজনৈতিক দল বিএনপি। তিনি নিজে দুর্নীতি না করলেও তার আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছিল... এক সাক্ষাৎকারে জিয়া স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি অপরিহার্য বাস্তবতা।’

কিন্তু ড. মইনুল ইসলামের মতানুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে ‘নিজে দুর্নীতি না করলেও’ জিয়ার আমলে দুর্নীতিতে সবাইকে অভ্যস্ত ও অংশীদার করে ফেলার এই প্রক্রিয়াটাকে পরিমাণগত দিক দিয়ে শুধু নয়, গুণগত দিক দিয়েও কত নগণ্য মনে হয় আজকের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে! অর্থনীতি অনেক বিশাল, দুর্নীতির পরিমাণ তাই সংগত কারণেই অনেক বেশি এভাবে দুর্নীতির মাত্রাবৃদ্ধির সাফাই গাওয়া যায় না। তা ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়, কিন্তু বাংলাদেশে নির্মাণব্যয় বহুক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি। বরং আরেক দিক দিয়ে, বাংলাদেশে নির্মাণকাজের গুণগত মান এর চেয়ে খারাপতর কখনো ছিল কি নাÑ সেই ভাবনা ভাবতে হবে। অর্থাৎ দুর্নীতির মাত্রা শুধু এক টাকার সামগ্রী ১০০ টাকায় কেনার মাঝে নয়, সামগ্রীটার মানও অত্যন্ত খারাপ করার মাধ্যমে দুই ধারী তলোয়ারেও পরিণত হয়েছে আজকের দিনে। ঋণখেলাপি কিংবা আর সব দুর্নীতিও আনুপাতিক দিক দিয়ে অতীতের সর্বনজির ভঙ্গ করেছে, এটার নমুনা অধ্যাপক মইনুল ইসলামের অন্য বহু লেখায় মিলবে।

৩. চলমান দুর্নীতিবিরোধী ‘শুদ্ধি’ অভিযানের আরেকটি দিক খুবই আকর্ষণীয় বোধ হওয়ার কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে। সেটা হলো এই অভিযান সম্ভবত বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আমলাতন্ত্রকে পুনরায় শক্তিশালী করল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বহর ও বাহিনীর তুলনায় এবং আওয়ামী আমলেই। আওয়ামী লীগ যেমন নামমাত্র নির্বাচনকে সামনে রেখে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে, রাষ্ট্রক্ষমতাতেও এখন আওয়ামী লীগের নামমাত্র আবরণ সামনে রেখে আমলাতন্ত্র অধিষ্ঠিত হয়েছে বা হওয়ার প্রক্রিয়া জারি আছে। যুবলীগের সভাপতি সম্ভবত এই ইঙ্গিতটিই করেছিলেন ক্যাসিনো-কাণ্ডের শুরুতেই এটাকে ‘বিরাজনীতিকরণ’ হিসেবে অভিহিত করে। এর প্রভাব হয়তো দীর্ঘ মেয়াদে আমরা রাষ্ট্রজুড়ে দেখতে পাব।

আরও কৌত‚হলোদ্দীপক বিষয় হলো, যেসব দুর্নীতি আমলাতন্ত্রের উচ্চ অংশের সমর্থন ও যোগাযোগ ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব না

অথবা যেসব দুর্নীতির সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের সত্যিকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত আছেন, সেসব দুর্নীতি বিষয়ে ড. মইনুল ইসলামের সর্বশেষ রচনায় আদৌ কোনো শব্দ ব্যয় হয়নি। যেমন লেখাটাতে ব্যাংক থেকে টাকা মেরে দেওয়ার দুর্নীতি বিষয়ে কোনো শব্দ নেই, নেই শেয়ারবাজারে ভয়াবহ সব কেলেঙ্কারির মাধ্যমে মানুষকে সর্বস্বান্ত করা লোকদের কথা, নেই বিদ্যুৎ খাতে বিপুল দুর্নীতির কথা, অবকাঠামো খাতে দুর্নীতির কথা। অথচ এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ড. মাইনুল ইসলাম অজস্র লিখেছেন নানা সময়ে।

এবং পাঠকরাও দেখতেই পাচ্ছেন, চলমান ‘শুদ্ধি অভিযান’ও এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে না। এই শুদ্ধি অভিযানের আর্থ-রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো কারবারটা বিপুল টাকার হলেও এর সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা, কিংবা আশীর্বাদপুষ্ট লোকজন। অর্থাৎ, হয় রাজনৈতিকভাবে এই মেঠো লোকজনের প্রয়োজন শাসক দল আর আগের মতো অনুভব করছে না অথবা রাষ্ট্রযন্ত্র এদের সহ্য করছে না। এটা হয়ে থাকলে অচিরেই আমরা দেখব এমনকি রাস্তাঘাট থেকে চাঁদা তোলা মধ্যস্তরের রাজনৈতিক কর্মীরাও বিদায় নেবেন মাঠ থেকে।

অথবা পুরো বিষয়টার ব্যাখ্যা হতে পারে অর্থনৈতিক অনামা এই মেঠো লোকগুলোকে কেন জুয়ার বাজারের এই বিপুল অর্থনীতিটার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে দেওয়া হবে? সে ক্ষেত্রে অভিযান শেষে পরিস্থিতি আবারও শান্ত হলে সত্যিকারের ক্ষমতাধররা এই বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবেন। তবে শুধু এই লাভজনক ব্যবসার হাতবদল অভিযানের প্রধান কারণ হয়ে থাকলে রাস্তাঘাটের চাঁদাবাজি রাজনৈতিক কর্মীদের হাতেই থাকবে। কারণ এই চাঁদাবাজি এবং নানা ঠিকাদারিই মাঠপর্যায়ে সংগঠনের তহবিলটা জোগায়।

এই সবগুলো ব্যাখ্যাই বাতিল হয়ে যাবে বিষয়টা শাসক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে একপক্ষের হাতে আরেক পক্ষের শায়েস্তা হওয়ার বিষয় হয়ে থাকলে। সে ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক মাঠকর্মীদের বদলে শাসনব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের হাত শক্তিশালীতর হতে থাকবে।

৪. কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অভিযানকে নিয়ে কতিপয় বিশিষ্টজনের এই আশাবাদ অত্যন্ত ইতিহাসবিরুদ্ধ, শুরুতে বলা অধ্যাপক রাজ্জাকের সরল-সিধা মানুষের আশাবাদের মতন। তবে। একটি বার্তা সংস্থাকে দেওয়া মন্তব্যে কার্যকর একটি কথা বলেছেন সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী : ‘প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী কাজের জন্য অনেক সমর্থন বেড়ে গেছে। আমার মনে হয় না বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের সফল প্রধানমন্ত্রী আমরা কখনো পেয়েছি। তার জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে এইটা, মানুষের আকাক্সক্ষা। কারণ এত দিন এই লোকগুলো নির্বিঘ্নে চুরি করে গেছে, হঠাৎ করে তাদের ধরার ফলে-মানুষও সাইকোলজি বুঝতে পারছে না, ব্যাপারটা কী হচ্ছে’ (সময় টেলিভিশন)।

জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা এই পুরো ঘটনার একটা ব্যাখ্যা হলেও হতে পারে। হয়তো গণমানুষ এই জুয়াকাণ্ডের হোতাদের গ্রেপ্তারে আসলেই খুশি। কিন্তু নির্বিঘ্নে চুরি করা সত্যিকারের কোনো চোরকে ধরা হয়েছে, সেটা আমাদের বোধবুদ্ধিতে আসলেই আসেনি। জুয়াড়ি আর চোর কবে থেকে সমার্থক হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে

জাতির এই মুরব্বিরা কি শেকড়ে কুঠারাঘাত চলছে এমন একটা গাছের পাতায় শুঁয়োপোকা মারার ওষুধ ছিটানো দেখে আপ্লুত? ইতিহাসের সর্বকালে দুর্নীতির যা একমাত্র উৎস, মাথা থেকে পা পর্যন্ত সর্বস্তরে সর্বব্যাপী জবাবদিহিহীন শাসন, সেই বিষয়ে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে দুর্নীতি দমন বিষয়ে যদি আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়, ১৯৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় তাহলে আমরা কী শিখলাম!

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

subarnadin@gmail. Com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত