জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৫ অক্টোবর। আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। সে হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আলমাহি সাদ এরশাদের জয় প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু ভিন্ন কিছু কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ নির্বাচনের কিছু প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম। ভোটাধিকার প্রয়োগে এ অনীহা অনেকের ভ্রকুঞ্চিত করেছে। ভোট পড়েছে মাত্র ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এটাই সবচেয়ে কম ভোট পড়ার ঘটনা। সংসদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এত কম ভোট পড়া খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাদ এরশাদ ৫৮ হাজার ৮৭৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির রিটা রহমান পেয়েছেন ১৬ হাজার ৯৪৭ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহারিয়ার পেয়েছেন ১৪ হাজার ৯৪৮ ভোট।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে শতকরা ৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। জাতীয় পার্টির এইচ এম এরশাদ ভোট পান ১ লাখ ৪২ হাজার। বিএনপির প্রার্থী রিটা রহমান পেয়েছিলেন ৫৩ হাজার ভোট। অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই কয়েক মাসের ব্যবধানে মানুষের অনাগ্রহে ৩১ শতাংশ ভোট কম পড়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত যেকোনো স্তরের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকারকে বাংলাদেশের নাগরিকরা অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন। ভোট এদেশের মানুষের কাছে ঐতিহ্যগতভাবে উৎসব বলে পরিগণিত। দারিদ্র্যপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত নাগরিকদের অনেকে মনে করেন, ভোটাধিকারই তার নাগরিক মর্যাদাবোধের শেষ সম্বল। সেই ভোটাধিকার প্রয়োগে নাগরিকদের এমন অনীহার কারণ কী?
রংপুর উপনির্বাচনে একাধিক কারণে নির্বাচন ভোটারদের কাছে আগ্রহ হারিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো, বিএনপির প্রার্থীকে নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনাগ্রহ, জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে নিয়ে দলে বিভক্তি এবং সর্বোপরি দুর্গাপূজার মধ্যে ভোট হওয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘোষণা দিয়ে ভোট দিতে না যাওয়া অন্যতম কয়েকটি কারণ।
যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, সেই নির্বাচনে এত কম ভোটারের উপস্থিতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এত কম ভোটে জনমতের সঠিক প্রতিফলন হয় না। এ কথা সত্য দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ভোটের উৎসবে আবশ্যিকভাবে পড়ে। তবে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বও কম নয়। তারা ভোটারদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। জনগণের আস্থা ফেরাতে পারেনি। রংপুর নগরীর ২৫টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১৭৫টি কেন্দ্রে এবার ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিনে বা ইভিএমে ভোট হওয়ার পরও অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। রংপুর উপনির্বাচনে যে নগণ্য সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি, তার দায় নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও বর্তায়। নানা কারণে তারা এই নির্বাচনে যথাযথ ভ‚মিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে বিগত কয়েক ধাপের উপজেলা নির্বাচনে নানা ধরনের ত্রæটি, বিচ্যুতি এবং অসংগতির অভিযোগ ছিল। এর রেশ রংপুর উপনির্বাচনেও পরিলক্ষিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সাম্প্রতিক অতীতের নির্বাচনগুলোর মতো এই নির্বাচনের নির্বাচনটিকেও প্রতিদ্দ্বতামূলক করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি তৈরি করতে না পারলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সবসময়েই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনগণের মধ্যে ভোটদানের আগ্রহ হ্রাস পেতে থাকবে।
ভোটাধিকার প্রয়োগে নাগরিকদের উৎসাহ কমে যাওয়া বা হারিয়ে ফেলা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য নেতিবাচক লক্ষণ। এর অর্থ জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের নীতি হুমকির মুখে পড়েছে। এই প্রবণতা এখনই
থামানো প্রয়োজন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং অবাধে প্রতিদ্দ্বতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শুধু ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।