আজ ৭ অক্টোবর, বিশ্ব শোভন কর্মদিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও) শোভনকাজের ধারণাটিকে ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে সর্বপ্রথম তাদের আলোচ্য বিষয়সূচিতে নিয়ে আসে। পরে জাতিসংঘ ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৮ নম্বর লক্ষ্যে নির্দিষ্টভাবে সবার জন্য শোভনকাজ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে। তাই এটি শ্রমিকের কল্যাণে সর্বজন স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড। জাতিসংঘের অনুমোদিত এসডিজির মূল সুর হলো বৈষম্য কমানো আর স্লোগান হলো কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএলওর মতে, শোভনকাজ হলো এমন উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কাজ, যে কাজে স্বাধীনতা, সমতা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার শর্তগুলো নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। শোভনকাজ বিষয়টি এমন কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা নিশ্চিত করবে উৎপাদনশীলতা, সুষ্ঠু আয়, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য সুব্যবস্থা ও সামাজিকীকরণ, বাক্স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়া এবং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সব নারী ও পুরুষের জন্য সমান সুযোগ ও চিকিৎসাসেবা।
শোভনকাজ নিশ্চিতকরণে এর চারটি স্তম্ভ বা ভিত্তি ও ১০টি আনুষঙ্গিক উপাদানের বাস্তবায়ন অপরিহার্য। শোভন কর্মক্ষেত্রের স্তম্ভগুলো হলো ১. শ্রমমান ও মৌলিক নীতি এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকারসমূহ, ২. কর্মসংস্থানের সুযোগ, ৩. সামাজিক নিরাপত্তা ও ৪. সামাজিক সংলাপ।
আনুষঙ্গিক উপাদানগুলো হলো ১. পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ, ২. ন্যায্য ও সম্মানজনক উপার্জন এবং উৎপাদনশীল কাজ, ৩. শোভন কর্মঘণ্টা, ৪. শিশুশ্রম নিরসন, ৫. কর্ম, পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয়, ৬. কাজের স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা, ৭. কর্মসংস্থানে সবার প্রতি সমান সুযোগ এবং আচরণ, ৮. নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ৯. সামাজিক নিরাপত্তা এবং ১০. সামাজিক সংলাপ, কর্মমালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব।
জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২, জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নীতিমালা ২০১৩, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫, বাংলাদেশ শ্রমবিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর সংশোধনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধানের উন্নয়ন করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে শিল্প স্বাস্থ্য ও সেইফটি কমিটি এবং কারখানা পর্যায়ে সেইফটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় গার্মেন্টশিল্পের নিরাপত্তা উন্নয়নকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে তৈরি পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, অন্যান্য সেক্টর ও কর্মক্ষেত্রের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণই থেকে গেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে দুর্ঘটনায় শ্রমিক আহত বা নিহত হচ্ছেন। আক্রান্ত হচ্ছেন জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তারক্ষায় অদ্যাবধি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি; প্রতিদিন দেশে আসছে অভিবাসী শ্রমিকের লাশ, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা আজ সর্বজনবিদিত। চাতাল, পাথর উত্তোলন, জাহাজভাঙা-শিল্প, ট্যানারি ও চামড়াশিল্প, সর্বত্র অবহেলা, অবজ্ঞা আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কথা বলাই বাহুল্য। অতি মুনাফালোভী করপোরেট লোভে বলি হচ্ছে শ্রমিক। বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে। আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতা স¤প্রসারিত হয়েছে। আবার এ-ও বলা হয়েছে, এখনো বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কোটির বেশি শ্রমিক কর্মসংস্থান নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছেন। আয়বৈষম্য বেড়ে গেছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ সাধারণত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে (ইনফরমাল সেক্টর) সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই বিশাল জনশক্তির অধিকাংশই প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া ওই খাতভিত্তিক কাজে নিয়োজিত হয়। এই খাতে চাকরি গ্রহণকারী এবং প্রদানকারী উভয়েরই আইন, নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর প্রতি আনুগত্য, শ্রম-অধিকার ও শোভনকাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে অসচেতন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শোভন কর্মপরিবেশের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রমশক্তির ৮৬ দশমিক ২ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যার একটি বড় অংশই (প্রায় ৯০ শতাংশ) তরুণ বা যুবক বয়সী শ্রমিক। মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত হওয়াতেই তারুণ্যনির্ভর এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা শোভন কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের জন্য আমাদের অঙ্গীকার, চলমান উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, ওপরে উল্লিখিত নীতিগুলোর বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে সবার জন্য নিরাপদ কাজ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও তাদের সংগঠন, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের গুরুত্তপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। দেশের গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, জনগণের প্রতিনিধিদের কাছেও রয়েছে আমাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি শ্রমিক, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনগুলোর ভ‚মিকা এবং অংশগ্রহণের অঙ্গীকার অনস্বীকার্য। আজকের বিশ্ব শোভন কর্মদিবস ২০১৯-এ শ্রমিকের অধিকার, শ্রম খাত ও জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে নিম্নোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়ন অতীব জরুরি
সব কর্মক্ষেত্রকে আইনের আওতায় আনা ও নিয়োজিত ব্যক্তিকে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা/অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন/বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন/অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্ম-খাতে শ্রম পরিদর্শকের পরিদর্শন ও আইনের প্রয়োগ বৃদ্ধি/শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন, দক্ষতার যোগ্যতা যাচাই, স্বীকৃতি সনদের ব্যবস্থা/অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র প্রদানের মাধ্যমে ডেটাবেইস উন্নতীকরণ/কর্মক্ষেত্রে সাহায্যসেবা নম্বর, অভিযোগ ও মতামত প্রদান বাক্স চালু করা/শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বিস্তৃত করা/শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা/শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ট্রেড ইউনিয়ন জোরদার করা।
বাংলাদেশ আইএলওর সদস্য রাষ্ট্রই শুধু নয়, আইএলওর ‘শোভনকাজ’ বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনের সক্রিয় সদস্যরাষ্ট্র। আইএলও কোর কনভেনশনসহ জাতিসংঘের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সনদের স্বাক্ষরদাতা দেশ বাংলাদেশ। এসব সনদের অন্যতম বাধ্যবাধকতা হচ্ছে সব নাগরিকের জন্য শোভন নিরাপদ কাজ নিশ্চিত করা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক আমাদের সংবিধান শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তি ও শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নীতি হিসেবে নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়নের একটি অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র । অতি শিগগিরই বাংলাদেশ যোগ দিচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে। এসব দলিল, এজেন্ডা, কর্মসূচির সব কটিতেই শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শোভনকাজ নিশ্চিত করা ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই আমরা ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ও সংবিধানের নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখতে চাই। বাস্তবায়ন চাই রাষ্ট্রের সব নীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের।
লেখক : উন্নয়নকর্মী, অ্যাকশনএইড-বাংলাদেশ
