প্রশ্নটি ছিল স্বাধীনতার, স্বায়ত্তশাসনের নয়

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৩৭ পিএম

আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে ছয় দফা এবং এগারো দফা অত্যন্ত গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছিল। ছয় দফার প্রণেতারা সর্বোচ্চ পরিমাণে স্বায়ত্তশাসনই চেয়েছিলেন। কিন্তু এই দলিলটির ভেতরেই সিরাজুল আলমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের প্রতিশ্রæতি দেখতে পান। তারা এর বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করেছেন, স্বাধীনতার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেছেন। বলাই বাহুল্য যে ছয় দফার প্রণেতা বলে কথিত আমলাতন্ত্রের উচ্চপদস্থ ওই তিন সদস্যের কেউই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, তাদের অনুভ‚তি ছিল পুরোপুরি জাতীয়তাবাদী। তারা আঞ্চলিক বৈষম্য দেখেছেন, এবং তার নিরসনের জন্য উদগ্রীব ছিলেন। সেনাবাহিনীর যে বাঙালিরা বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, নিয়ে যারা কথিত আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত হন, তারাও আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারাই তাড়িত ছিলেন। এরা সবাই বাইরের বড় ছবিটা দেখেছেন, ভেতরের পুঁজিবাদী নিপীড়নটার কথা বিবেচনার অবকাশটা পাননি। সেটা পাননি তরুণ সিরাজুল আলমরাও। সিরাজুল আলম খান আওয়ামী লীগের ওপর ভরসা না করে ছাত্রলীগের বড় অংশকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিএলএফ ও জয়বাংলা বাহিনী গঠনের দিকে। আওয়ামী লীগের কোনো শ্রমিক ফ্রন্ট ছিল না, শ্রমিকদের মধ্যে যেটুকু কাজ তা বামপন্থিরা ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারাই করতেন। সিরাজুল আলম শ্রমিক ফ্রন্ট সংগঠিত করেন। কৃষক ফ্রন্ট খোলারও উদ্যোগ নেন। সবকিছুই ছিল ‘জাতীয়’ স্বাধীনতার স্বার্থে। তাদের দৃষ্টিতে পরাধীন পূর্ববঙ্গে জাতিগত নিপীড়নই ছিল প্রধান সত্য।

তবে কেবল স্বাধীনতা যে যথেষ্ট নয় মুক্তিরও যে প্রয়োজন সে-উপলব্ধিও ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু তার সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাতে স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং মুক্তির সংগ্রাম দুটির কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ কোনটির কথা আগে বলবেন, স্বাধীনতার নাকি মুক্তির সে নিয়ে মতদ্বৈধতা ছিল। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের মত ছিল প্রথমে বলতে হবে ‘স্বাধীনতার’ কথা, তার পরে ‘মুক্তি’র। বিএলএফ চাইছিল মুক্তি’র উল্লেখটা আগে, স্বাধীনতার উল্লেখ তার পরে। স্বাধীনতার কথা দিয়েই বক্তৃতা শেষ হোক। তখনকার পরিস্থিতিতে এই মতটি ছিল সঠিক। স্বাধীনতাই ছিল আশু প্রয়োজন। মুক্তি আসবে কী করে স্বাধীনতা না এলে? বিএলএফ’র মতটাই গৃহীত হয়েছিল। (আমি সিরাজুল আলম খান, একটি রাজনৈতিক জীবনাল্লেখ্য, পৃ ১৩৯)

ব্যাপারটা ছোট মনে হলেও আসলে কিন্তু অত ছোট ছিল না। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের স্বাধীনতার দাবি শুনলে যত ভয় পেত বাঙালিদের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে তত ভয় পেত না; কারণ মুক্তির সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে চলবে, স্বাধীনতার সংগ্রামটা একেবারে আজ-কাল-পরশুর ব্যাপার। স্বাধীনতার কথা শাসিত বাঙালিদের উদ্দীপ্ত করেছিল, এবং সে-উদ্দীপনা শাসক পাঞ্জাবিদের জন্য কারণ হয়েছিল দুশ্চিন্তার। এটাও অবশ্য তাৎপর্যপূর্ণ যে বাংলাদেশের সংবিধানে প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’-এর কথা লিখিত হয়েছিল, যেটা ছিল স্বাভাবিক; পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কথাটাকে বদলে লেখা হয়েছিল ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধে’র কথা। নতুন সামরিক শাসকরা কট্টর জাতীয়তাবাদী ছিলেন, শেখ সাহেবের তুলনাতেও অধিক-জাতীয়তাবাদী। তারা জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে প্রাধান্য দিতে চাননি, কথিত জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে দৃশ্যমান থাকতে চেয়েছেন। তারা ভেবেছেন স্বাধীনতা তো এসে গেছে, এখন মুক্তির আগ্রহ যতটা কম উচ্চারিত হয় ততই ভালো।

সত্তরের নির্বাচনের পরে স্বায়ত্তশাসনকে পেছনে রেখে স্বাধীনতার লক্ষ্যটাই স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। প্রশ্ন দাঁড়াল কোন পথে আসবে স্বাধীনতা। আওয়ামী লীগের মূলধারা বিশ্বাস করত শান্তিপূর্ণ উপায়ে, দরকষাকষির মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব হবে। বিএলএফ সেই পথে আস্থা হারিয়েছিল। এমনকি গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়েও স্বাধীনতা আসবে বলেও তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাদের ধারণা হয়েছিল লড়াইটা হবে সশস্ত্র। সেই রকমের সচেতনতা থেকে তারা জয়বাংলা বাহিনী গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছেন, আওয়াজ দিয়েছেন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। ডামি রাইফেল নিয়ে তারা কুচকাওয়াজ করেছেন, আশা করেছেন অস্ত্র পাওয়া যাবে পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে, ট্রেনিংয়ের বন্দোবস্তও ভারতের সাহায্যেই করা সম্ভব হবে। সমস্তটার ভেতরেই একটা রোমান্টিকতা, কিছুটা ছেলেমানুষিও ছিল। যুদ্ধ যে কী ভয়ংকর জিনিস সেটা তাদের কল্পনার ভেতরেও ছিল না। যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের বিদ্রোহ, ইপিআর ও পুলিশের সশস্ত্র অংশগ্রহণ যে অত্যাবশ্যক ছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহ‚র্তেই তা টের পাওয়া গেছে। এইসব বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার এবং তাদের রাজনৈতিক নির্দেশনা দেওয়ার কাজটা করা হয়নি। পহেলা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যার প্রস্তুতি সমানে চালিয়ে যাচ্ছিল, সৈন্যসামন্ত অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদের মজুদ বাড়িয়ে হানা দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছিল সেটা মোটেই গোপন ছিল না, কিন্তু তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক জনসমর্থন সংগ্রহের ব্যাপারে কোনো প্রকার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হচ্ছে এমন ধারণা সবাইকে দেওয়া হচ্ছিল।

ফলে দেখা গেল অপ্রস্তুত অবস্থাতে আওয়ামী লীগের নেতারা তো বটেই, যুদ্ধ করবে-বলে-উচ্চকণ্ঠে প্রতিশ্রæতি দিচ্ছিল যে বিএলএফ তারাও কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি। যুবনেতারা প্রাণভয়ে দেশত্যাগ করেছেন। অপ্রস্তুত, অরক্ষিত ও নেতৃত্ববঞ্চিত দেশবাসী নিজেদের মতো করে যুদ্ধ করল, প্রাণ দিল এবং হানাদারদের বিতাড়িত করল। কিন্তু জীবন ও সম্পদের যে ক্ষয়ক্ষতি হলো তা অকল্পনীয়।

সিরাজুল আলমের ভ‚মিকার সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগের বছরগুলোতে মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের ভ‚মিকার তুলনাটা নিতান্ত অগ্রাহ্য নয়। উভয়েরই সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিগত আকর্ষণ ক্ষমতা ছিল অসামান্য; এবং উভয়েই তরুণদের স্বাধীনতার জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং অনেক তরুণকে কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে তফাৎ আছে। পাকিস্তান আন্দোলনে লড়কে লেঙ্গে ছিল ঠিকই, কিন্তু আন্দোলনরতদের দিক থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো লড়াই ছিল না, তাদের তাই প্রাণ দিতে হয়নি। সিরাজুল আলমরাও তাদের সময়ের তরুণদের স্বাধীনতার জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নিয়ে এসেছিলেন, তরুণদের ‘রক্ষা’ করেছিলেন কমিউনিস্ট হয়ে-যাওয়া থেকে; কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের সশস্ত্র গণহত্যার মুখে এবার অস্ত্র ধরবে বলে আওয়াজ-দেওয়া বীর বাঙালিকে প্রাণও দিতে হয়েছে, হাজারে হাজারে। ত্রিশ লক্ষের কথা বলছি আমরা। নেতারা কিন্তু কেউই প্রাণ দেননি, কারণ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষেত্র থেকে তারা বেশ দূরেই ছিলেন। আবুল হাশিম বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ছিলেন না; তিনি ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। জাতীয় সমাজতন্ত্রের মতোই ইসলামি সমাজতন্ত্রও একটি অবাস্তব জিনিস। সিরাজুল আলম ভাবতেন আওয়ামী লীগকে ব্রিটিশ লেবার পার্টির আদলে গড়ে তোলা চাই, এবং লেবার পার্টির মতোই দলের লক্ষ্যও হবে একটি ওয়েলফেয়ার স্টেট কায়েম করা। ভেবেছেন সেটাই সমাজতন্ত্র। খেয়াল করেননি যে, ওয়েলফেয়ার স্টেট সমাজতান্ত্রিক তো নয়ই, বরং সমাজতন্ত্রকে প্রতিহত করার পথে একটি কৌশলী পদক্ষেপ বটে। ওয়েলফেয়ার সমাজতন্ত্র আনে না, কিছু কিছু ছাড় দিয়ে বঞ্চিতদের সন্তুষ্ট রাখতে চায়, যাতে তারা সমাজতন্ত্রের পক্ষে না দাঁড়ায়।

লেখক

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত