ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার বিকৃতি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১০:০৭ পিএম

বর্তমান সময়ে কি আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটবিহীন জীবনের কথা ভাবা যায়? উত্তরটি নিশ্চয়ই ‘না’। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই আমরা আন্তর্জালে আবদ্ধ। ঘর, অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটের ব্যবহার। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রমের ফলে সবার কাছে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফেইসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। বলা যায়, জীবনের আনন্দ, বেদনা আর প্রতিবাদের ভাষাগুলো এখন আন্তর্জালেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

সারা পৃথিবীতে এখন প্রযুক্তির জয়গান চলছে। আর সে পথে চলতে গিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের ধরনও। প্রতিদিন অগণিত মানুষ ইন্টারনেট বা আন্তর্জালের সংস্পর্শে আসছে, যা অদ্ভুত এক মায়াজালে বেঁধে রেখেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষকে। এই মায়াজালে আছে নানা বিষয়ের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট। আছে নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক, টুইটার, হাইফাইভ, ইউটিউব, ইনস্ট্রাগ্রাম প্রভৃতি। এই সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো তৈরি করছে এক ‘ভার্চ্যুয়াল’ সামাজিক বাস্তবতা। যার প্রভাবে মানবীয় সম্পর্কগুলোতেও আসছে নতুন মাত্রা। ‘ভার্চ্যুয়াল’ যুগে এই যে পরিবর্তন, তার অন্যতম বড় প্রভাবক হচ্ছে ভাষা। ইন্টারনেট বা আন্তর্জালের সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলা ভাষা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ফেইসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত হয় এমন কিছু শব্দ বা বাক্য মাইন্ড খাইস না, সেইরাম ব্যাপুক বিনুদুন, কাইলকা পরীক্ষা, কিছুই পড়িনাইক্যা, আমারে তুইল্যা নাও, নয়তো উপ্রে থেইক্যা দড়ি ফেলাও, তুমি আবার ভাব মারাস, বেসম্ভব, নাইচ, কিন্যা, গেসে, দ্যাশ, ভাল্যাগসে, মুঞ্চায়, মাইরালা প্রভৃতি। এই বাংলা শব্দ ও বাক্যগুলোকে মজার ছলে বা নিজের অজান্তেই ব্যবহার করছেন অনেকেই। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলা ভাষার এমন বিকৃত রূপ প্রায় নিয়মে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু বাড়ছেই না। বরং নতুন নতুন ঢঙে বিকৃত হচ্ছে মৌলিক বাংলা শব্দগুলো। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে লাইক, কমেন্ট, স্ট্যাটাস শব্দগুলোর এত বিপুল ব্যবহার ছিল না। কিন্তু এখন এগুলো হরহামেশাই উচ্চারিত হচ্ছে একেবারেই বাংলা ভাষার মতোই।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝির কথা। বেসরকারি টেলিভিশন এবং রেডিওগুলো নিজেদের মতো অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। ফলে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের ভাষারীতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে মিশ্র ভাষারীতির ব্যবহার এবং বিকৃত উচ্চারণে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। এরপর কিছু নাটকের মাধ্যমে বিকৃত উচ্চারণ ও বাংলা শব্দ সস্তা বিনোদন তৈরি করলেও তা তরুণ প্রজন্মকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। সে থেকেই এটি অবিরতভাবেই চলতে থাকে। মূলত এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে বাংলা ভাষার মিশ্র ও বিকৃত রূপটি। এ ছাড়া প্রথম দিকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ নানা যন্ত্র থেকে ইন্টারনেটে বাংলা লেখার জটিলতা ছিল। ফলে ইংরেজিতে বাংলা উচ্চারণ লেখার প্রবণতা তৈরি হয়, যা বাংলা ভাষার উচ্চারণকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯৮৮ সালে বিজয় কি-বোর্ডের ব্যবহারের ফলে বাংলা ভাষাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে ৪৫৪টি সিসার হরফ ছিল, সেখান থেকে গুছিয়ে বাংলাকে কি-বোর্ডের ২৫টি বোতামে আনে এই বিজয় লে-আউট। যাতে ৪৫৪টি অক্ষর স্থান পায়। এখন সবখানে আছে এ বিজয় লে-আউটের ব্যবহার। ইউনিকোডে বাংলা ভাষাও স্থান পায়। বাংলাদেশ সরকারও ইউনিকোড অনুমোদন করে। পরে ইন্টারনেটে বাংলা লেখালেখিতে নতুন দিনের সূচনা করে ‘অভ্র কি-বোর্ড’। উইন্ডোজে ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা লেখার জন্য ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ অভ্র কি-বোর্ড সফটওয়্যারটি উন্মোচিত হয়। এর সাহায্যে বাংলালিপি ব্যবহার করে এমন সব ভাষাতেই টাইপ করা যায়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী (বর্তমানে ডাক্তার) মেহদী হাসান খান অভ্র কি-বোর্ড তৈরির কাজ শুরু করেন। ২০০৭ সালে ‘অভ্র কি-বোর্ড পোর্টেবল এডিশন’ সবার জন্য বিনামূল্যে উন্মোচিত হয়। অভ্র কি-বোর্ডে ফোনেটিক পদ্ধতিতে বাংলা লেখা যায়। কি-বোর্ড সফটওয়্যারে বাংলা ইউনিকোড লেখা চালু হলেও তার আগেই ইংরেজিতে বাংলা উচ্চারণ লেখার নিয়মটি অনেকেরই মজ্জাগত হয়ে পড়ে, যা এখনো চলছে পুরোদমে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে কেউ কেউ উল্লিখিতভাবে যে ভাষা লিখছে, তা যেমন প্রমিত বাংলা নয়, তেমনি আঞ্চলিক বাংলাও নয়। আবার এই মিশ্র ভাষারীতি কেবল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইন্টারনেট বা আন্তর্জালে ব্যবহৃত বাংলা শব্দগুচ্ছ বা ভাষা আমাদের বাস্তব জীবনের ভাষা ব্যবহারকেও ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে এটি দ্রæত ছড়িয়ে পড়ছে এ প্রজন্মের তরুণদের মুখে মুখে। বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার এই পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে বাংলা ভাষা। আবির্ভাব ঘটছে এক মিশ্র প্রকৃতির বিকৃত ভাষারীতি। তাই ইন্টারনেটে ভাষা ব্যবহারে এখনই সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুদ্ধ বানানে বা উচ্চারণে বাংলা লেখার প্রবণতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি বানানে বাংলা উচ্চারণ লেখার প্রবণতাও বাদ দিতে হবে। বাংলা ইউনিকোডের মাধ্যমে সহজে বাংলা লেখার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে সবাইকেই।

ইন্টারনেট বা আন্তর্জালের প্রভাবে ভাষার পরিবর্তন হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষতিকর হলো দুই বা ততোধিক ভাষার মিশ্রণে কথা বলা বা লেখা। এ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেছেন ঠিক এভাব ‘আন্তর্জালে বাংলা ভাষার যে মিশ্রণ, তা ভয়াবহ। প্রমিত বাংলার সঙ্গে আঞ্চলিক, ইংরেজির সঙ্গে হিন্দি, বাংলালিপির সঙ্গে রোমানলিপি। এভাবে মিশ্রণের ফলে যে জগাখিচুড়ি ভাষা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে, তা দুঃখজনক।’

ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক, জনমত তৈরি, দাবি আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভ‚মিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়া। এ ছাড়া ফেইসবুক পেজ, গ্রুপে ও ব্লগে চলছে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চাও। যা সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। তাই আন্তর্জালে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমাদের সবারই সচেতন হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

পরিবর্তনশীল ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভাষা নিয়ে গবেষণা বিশেষ প্রয়োজন। বিশ্বের নামকরা ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে প্রায় সব ভাষাতেই বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। একসময় টেলিগ্রামের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ভাষা ডেভেলপ করেছিল। ইন্টারনেটও দ্রুত পরিবর্তনশীল। এর প্রভাবে ভাষাতে নতুন নতুন শব্দ আসাটা স্বাভাবিক। তাই ইন্টারনেটে ভাষার ব্যবহার নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। এ নিয়ে পাশ্চাত্যে গবেষণা শুরু হলেও এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। এ ছাড়া এ দেশেই আন্তর্জালে বাংলা ভাষার ব্যবহার বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। এ নিয়ে কাজ করতে পারে বাংলা একাডেমি ও ভাষা ইনস্টিটিউটও। ডিজিটাল পরিবর্তনের স্রোতে আন্তর্জালে আমাদের মৌলিক ভাষাটি যেন হারিয়ে না যায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে সরকারকেই।

ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া জাতি আমরা। জীবন দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আমাদের পূর্বসূরিরা। তাই সেই ভাষাকে সারা বিশ্বে সঠিকভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদেরই। ইন্টারনেট ও আন্তর্জালে বাংলা ভাষার বিকৃতি বন্ধ হোক। বাংলা ভাষার ব্যবহার হোক শুদ্ধ বানানে ও শুদ্ধ উচ্চারণে। প্রাণের ভাষা বাংলার প্রভাবে আলোকিত হোক আন্তর্জাল দুনিয়া।

লেখক : লেখক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত