চার্লি চ্যাপলিনের আত্মজীবনীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে, তা হলো আমরা অনেক চিন্তা করি কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কতটা অনুভব করি। এই সঙ্গে যুক্ত করতে চাই তা কতটা কার্যকর করার চেষ্টা করি। চারটি মৌল আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। তার মধ্যে প্রায় সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমাদের চিন্তা থেকে উবে গেছে। আশির দশকে প্রথম সুযোগেই পুঁজিবাদ একেবারে উল্লম্ফনের পথ বেছে নেয়। নব্বই দশকে এসে সমাজতন্ত্র একেবারেই মুছে যায়। পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার জন্য রীতিমতো সংগ্রাম শুরু হয়। যে শক্তি ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করেছিল এবং পুরনো পাকিস্তানকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করেছিল তারাই রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়ে পড়ে। এই সময়গুলোতে নানাভাবে অদৃশ্য উপায়ে বহু লোকের কাছে পুঁজি জমতে থাকে। যেহেতু এ পুঁজি অবৈধ তাই গোপনে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এই পুঁজি কাজ করতে থাকে। কলকারখানায় পুঁজি বিনিয়োগ কোনো অন্যায় কিছু নয়, কিন্তু দৃশ্যমান আয় বহিভর্‚ত পুঁজি দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতি করে। এই পুঁজির একটা বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যায়, সেকেন্ড হোম গড়ে ওঠে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায়। সেকেন্ড হোম এককালীন পুঁজি বিনিয়োগ নয় প্রতি মাসে সেখানে অর্থ স্থানান্তর হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে কোনো রকম ভ‚মিকা রাখে না বরং জাতীয় অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করে। এই প্রক্রিয়া বহুদিন ধরে চলতে চলতে সম্প্রতি বিশালভাবে তা দৃশ্যমান হয়েছে। যতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে ঘটনার বাইরে। এই কোটি কোটি টাকা উপার্জনের উৎস কোথায়? একজন কাউন্সিলর এত সম্পদের মালিক হলেন কী করে?
রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পেশিশক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহুদিন ধরেই দেশের অবকাঠামো নির্মাণে ঠিকাদারদের টেন্ডার একটা বড় উৎস হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তার মানে কি এই পেশিশক্তি এবং ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ নেওয়ার পর সেই কাজ আর করতে হয় না অথবা করলেও তা কোনোমতে দায়সারাভাবে বুঝিয়ে দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একটা দুর্বল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। দেখা যাচ্ছে এসব স্থাপনা খুব দ্রতই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশেই নিজস্ব ঠিকাদাররা বড় বড় রাস্তাঘাট, দালানকোঠা নির্মাণের কাজ করে থাকে। আমাদের দেশে বড় কোনো নির্মাণকাজে হয়তো বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এটি দেশের উন্নয়ন ও নির্মাণ সংস্কৃতির বিরোধী। দেশের বিদ্যমান নির্মাণ আইন ঠিকাদাররা মানছে না এবং না মানার জন্য কারও শাস্তি হয়েছে তাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে আইনকে উপেক্ষা করার সংস্কৃতি চলে আসছে। সব কিছুর পেছনেই একটা রাজনৈতিক অপশক্তি কাজ করে যাচ্ছে অবিরাম। সাম্প্রতিককালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক কঠোর বার্তার কারণে চারদিকে একটা আওয়াজ উঠেছে। কিন্তু এ কঠোর বার্তা কতটুকু পৌঁছেছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের কাছে? ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে পদচ্যুত করার পর বুয়েট ছাত্রলীগ সারা দেশের ছাত্রলীগের কাছে কি বার্তা পৌঁছাল?
প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই কোনো পেশিশক্তির ব্যবহার দেখতে চান না। কিন্তু গতকালও মধুর ক্যান্টিনে পুরনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। এতো গেল ঢাকা শহরের বিষয় সারা দেশে বিষয়গুলো কি খুব পাল্টেছে? রাতারাতি পাল্টানোও সম্ভব নয় তাও আমরা জানি। কারণ এই শক্তির পেছনে মদদদাতারাও খুব সহজে হাল ছাড়বেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ক্ষমতাবান শিক্ষকরাও ছাত্রদের শক্তি নিয়ে রাজনীতিও করেন। সেই রাজনীতি আবার অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই যে সংস্কৃতি তাও কি রাতারাতি পাল্টে যাওয়া সম্ভব? তবুও যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জনগণ খুব আশান্বিত হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষের মধ্যে বিশেষ করে সৎ, নীতিবান মানুষ একটা ভয়ের মধ্যে বসবাস করে। ভয়টা জীবনের, অস্তিত্বের, কখনো চাকরি হারানোর, কখনো লাঞ্ছিত হওয়ার, কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশের মানুষ কী নির্ভীকতার সঙ্গে ষাটের দশকে আন্দোলন রচনা করেছিল, কারফিউ ভেঙেছে এবং পঁচিশে মার্চের সেই কালরাতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভাবনা করেছে। পুরো আশির দশক জুড়ে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে সংগ্রাম করেছে। এখনো কিছু পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সত্য উদঘাটন করে চলেছে।
সব গণমাধ্যমে অনেক বড় বড় ঘটনার উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু যে অপশক্তি এসব দুবর্ৃৃত্তায়নের কারণে তারা এখন বুদ্ধি এবং কৌশলের পথ বের করছে। নুসরাত হত্যাকে আত্মহত্যা প্রমাণ করা, রিফাতের হত্যাকাÐকে অন্য খাতে প্রবাহিত করা, আবরারকে শিবির চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চলছে। কিন্তু দেশের জনগণ সত্যটা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে। কাজেই কোনো নতুন মাত্রা খুঁজে বের করতে গেলে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই আইনকে কঠোরভাবেই এসব বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। যদিও আইন সবসময় জনমতকে অনুসরণ করে না, তবুও দিবালোকের মতো স্পষ্ট একটা বিষয় আছে। এবারে প্রধানমন্ত্রী যেসব ঘোষণা দিয়েছেন তাতে জনগণ স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তি ক্ষণকালের হয়ে দাঁড়াবে এবং বিশাল হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করবে, যদি অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে আবার তাদের স্বরূপ প্রকাশ করে। সারা পৃথিবীতেই খুব ক্ষুদ্র সংখ্যক লোক সত্যকে ধরে থাকে। আর ব্যাপক সংখ্যক লোক সত্যকে বুঝেও এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। আবার খুব দ্রত দুর্বৃত্তরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সত্যবাদী ও ন্যায়বাদী মানুষরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না। আধুনিক বিশ্বের তাই বিষয়গুলো খুব জটিল হয়ে গেছে। একটি রূঢ় সত্যকেও খুব সহজে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেওয়া সম্ভব। কারণ যেকোনো বিষয়ই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশের রাজনীতি চর্চায় এত বেশি বিতর্কের অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে যার মধ্যে কোনো ব্যক্তি, কোনো দল তার স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে পারেনি।
আমাদের সমাজে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ মানুষেরই একটা মৌলিক চিন্তা আছে। কিন্তু সেই মৌলিক চিন্তা করার যোগ্যতা তার আছে কি না এটা কেউ একেবারেই বিবেচনা করে না। একজন কলেজ ছাত্র, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক অথবা ট্রাকচালক রাষ্ট্রের যে কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে ফেলতে পারে। একবারও সে ভাববে না যে এই মন্তব্য যথেষ্ট চিন্তাপ্রসূত কি না অথবা তার যোগ্যতা আছে কি না। তাই এই সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি করা খুব কঠিন কিছু নয়। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে আমাদের জাতি খুবই বিস্মৃতিপরায়ণ। দ্রতই সে ভুলে যায় কী ঘটেছে কয়েকদিন আগে। দশ বছর ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জেনারেল এরশাদ সরকারের পতন ঘটানো হলো। কিন্তু তারপরেই পাঁচটি আসন থেকে জেনারেল এরশাদ এমপি নির্বাচিত হলেন। তিনি জেল খাটলেন আবার রাজনীতিতে ফিরে এলেন। বর্তমানে সংসদে তার দল বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়ে সমাসীন। এই যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, আমরা দেখতে পাব অল্প কিছুদিন পরেই আরও কিছু ঘটনা ঘটবে এবং বর্তমানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে। অথচ অতীতে আমরা দেখেছি যারা দুর্বৃত্ত তারা কোনোভাবে পার পেলেও জনগণের স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। তাই দুর্বৃত্ত জনগণ দ্বারা ঘৃণিত হতো আর সত্যবান সমাজে নায়ক হয়ে থাকত। বিশ্বাস করি বাংলাদেশের জনগণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্বোধ হলেও সত্যের পক্ষে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়িত করার জন্য একমাত্র উপায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সঙ্গী করে নেওয়া। এই জনগোষ্ঠী যখন কোনো ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেয় তখন তারা ভুল করে না। এ কথা সত্যি প্রধানমন্ত্রী নিজের ঘর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এই অভিযান প্রশংসিত হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু যদি কোনো নতুন উপাদান এসে বিভ্রম সৃষ্টি করে তাহলে বর্তমানে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাই বিলম্বে হলেও রুখে দাঁড়াবার এইতো সময়।
লেখক
নাট্যব্যক্তিত্ব