নগর দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন ভাবনা

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪৮ পিএম

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়েই আলোচিত হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা। ২০১৩ সালেই সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। তবু দেশে গরিবের সংখ্যা এখনো সাড়ে তিন কোটি। যা কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। তবে যে ধারায় দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দরিদ্র বা গরির মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না, বলে বলা হচ্ছে। তারপরও কথা থেকে যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্যের হার কমে আসছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে যে হারে দারিদ্র্য কমছে সে হারে নগরাঞ্চলে দারিদ্র্য কমছে না। সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে শহরাঞ্চল উপেক্ষিত থাকছে। দেখা গেছে গ্রামাঞ্চলে শতকরা ৩৫ দশমিক ৭৭ ভাগ দরিদ্র মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি সহায়তা পেয়ে থাকে। কিন্তু নগরে বসবাসকারী দরিদ্রদের মাত্র শতকরা ১৭ দশমিক ৮৪ ভাগ এই সুবিধা ভোগ করে থাকে।

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর কাজ হলো রাস্তায় বাতির ব্যবস্থা করা, আবর্জনা সংগ্রহ ও অপসারণ, শহরের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পানি সরবরাহ, পৌরকর আদায় ইত্যাদি। এছাড়া কয়েকটি নির্দিষ্ট শহরের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সহায়তায় ইউনিসেফ, ইউএনডিপি এবং এডিবির অর্থায়নে বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করে। নগরের স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলো নগর দরিদ্র্য গোষ্ঠীর পক্ষে তেমন বেশি কর্মসূচি পালন করে না। রাজধানী ঢাকাতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও অন্য পৌরসভাগুলোতে তা দেখা যায় না। শহরাঞ্চলে বেসরকারি সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ঋণের মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারপরিকল্পনা বিষয়ে নগরবাসীকে সচেতন করে তোলা। কিছু কিছু বেসরকারি সংস্থা সামাজিক ও পরিবেশগত সচেতনতা সৃষ্টি এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে।

কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা না থাকার কারণে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে অভিবাসী হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ; ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের জন্যও গ্রামের মানুষ তাদের চিরপরিচিত বাপ-দাদার ভিটা ত্যাগ করে শহরে ভিড় জমায়। সেখানে বেঁচে থাকার মতো কাজ জোগাড় করতে পারলেও জীবনের নানা মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। এসব মানুষের একাংশকে বাসস্থান সংকটের কারণে আশ্রয় নিতে হয় বস্তিতে। যারা বস্তিতে থাকার মতো বন্দোবস্তও করতে পারে না, তাদের আশ্রয় নিতে হয় বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও ফুটপাতের মতো স্থানে। সমাজে তাদের আমরা অনেকেই ‘ভাসমান মানুষ’ বলে ডেকে থাকি।

চলতি অর্থবছরে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ। সার্বিক বিবেচনায় এই বরাদ্দকে হয়তো কম বলা যাবে না। কিন্তু নগর ও গ্রামাঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দের ক্ষেত্রে বড় রকমের বৈষম্য রয়েছে।  বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে শহরের দারিদ্র্য ২১ দশমিক ৩ থেকে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু অতিদারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শহরাঞ্চলে গত ৭ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে মাত্র শতকরা ২ভাগ। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য কমেছে শতকরা ৮ দশমিক ৫ ভাগ। বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, সরকারের ভুল নীতির কারণে শহরাঞ্চলে  অতিদরিদ্রের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।  গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের বরাদ্দ যেমন বেশি, তেমনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও অনেক বেশি সক্রিয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকার শহরকে অগ্রাধিকার  দিলেও অতিদারিদ্র্য হ্রাসের ব্যাপারে তেমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি।

বিশ্বব্যাংক স্বীকার করেছে যে, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফলতা অর্জন করেছে। ২০১০ সালে যেখানে দরিদ্রের হার ৩০ শতাংশের ওপর ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশ। মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য বিমোচনের এই সফলতা সত্যই অভিনন্দনযোগ্য ও প্রশংসার দাবিদার। এই সফলতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি। বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, প্রতিবন্ধীভাতা, ভিজিএফ, ভিজিডির মাধ্যমে চাল বিতরণের মতো কর্মসূচি। সরকারের  ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচিও পল্লীর দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সহায়তা করেছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে মাছ চাষ, গবাদি পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, শাকসবজি ও ফলচাষ, নার্সারি স্থাপনসহ বিভিন্ন কৃষি উন্নয়নমূলক কর্মকা- দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে গ্রামে গড়ে উঠেছে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কুটির শিল্প। কৃষিতে অভাবনীয় উন্নয়ন, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় দেশের দারিদ্র্য বিমোচনকে করেছে ত্বরান্বিত।

শহর ও গ্রামের দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। এমন বৈষম্য শুধু গ্রাম ও শহরের দরিদ্রদের মধ্যেই নেই, অঞ্চল ভেদেও এটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। উত্তরাঞ্চলে এখন মঙ্গা না থাকলেও দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে সরকারকে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর ওপরও জোর দিতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মুখে সুষম উন্নয়নের কথা শোনা গেলেও সরকারের গৃহীত কর্মসূচিতে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়কালে দারিদ্র্য বিমোচনের ৯০ শতাংশই হয়েছে গ্রামে। গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাস পাক সেটা সকলেরই কাম্য। কিন্তু শহরাঞ্চলে দারিদ্র্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে কিংবা অতিদরিদ্রের সংখ্যা বাড়লে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফল হবে না। বাংলাদেশে শহরবাসীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে ৬৫ শতাংশ ও শহরে ৩৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। ভবিষ্যতে নগরবাসীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। ২০৩০ সালে নগরবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮ কোটির ওপর। ২০৫০ সালে দেশে গ্রাম বলে কিছু থাকবে না। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে ‘গ্রাম হবে শহর’। এ অবস্থায় সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন নীতির অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন আনতে হবে। শহরের দারিদ্র্য কমাতে হলে অবিলম্বে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তাদেরও সেকেলে চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশে নগরীয় কৃষির মাধ্যমে নগরের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। নগর দারিদ্র্য দূরীকরণে আমাদের দেশের শহরগুলোতেও পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের অধীনে গ্রামীণ কৃষির পাশাপাশি নগরীয় কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে নগরবাসীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং নগরবাসীরাও পরিবেশ দূষণের অভিশাপ থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ, নাটোর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত