ঘরে-বাইরে সর্বত্র শিশুর মায়ের দুধপানের গুরুত্বের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জনসমাগমস্থলে ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, হাসপাতাল, শপিংমল ও বিমানবন্দরের মতো জনসমাবেশস্থলে ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’-এর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। স্থানগুলোতে এ ধরনের কর্নার স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না এবং কর্নার স্থাপনের একটি প্রস্তাব তৈরির জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। দেশের উচ্চ আদালতে কোনো শিশুর পক্ষে এটাই প্রথম রিট। জনস্বার্থে ৯ মাস বয়সী শিশু উমাইর বিন সাদী ও তার মা আইনজীবী ইসরাত জাহান একটি রিট করেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত জাহান তার বাচ্চাকে নিয়ে কক্সবাজার যান। সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার সময় ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ধরতে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তার শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর জন্য বিমানবন্দরে কোনো ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার খুঁজে না পাওয়ায় শিশুকে নিয়ে তাকে ভীষণ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়
মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের শুরু মাতৃগর্ভ থেকে। ভ‚মিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত গর্ভে থাকাকালীন মায়ের শরীর থেকে সন্তান পানাহার করে থাকে। ভ‚মিষ্ঠ হওয়ার পরও মায়ের দুধ দিয়ে পৃথিবীতে নবজাতকের প্রথম খাদ্যগ্রহণ শুরু হয়। মায়ের স্তনে জমাকৃত প্রথম শালদুধ শিশুর জন্য রোগ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিশুর উচ্চতা ও ওজন হ্রাস পায়। এমনকি শিশু খর্বাকৃতি হয়ে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমলেও জন্মের পর শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের দুধ না পাওয়ার কারণে
কৃশকায় ও খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো নানা জটিল রোগের শিকার হয়ে অকাল মৃত্যুতে পতিত হতে পারে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে, জন্মের পর থেকে শিশুর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান করানোকে (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। এতে মায়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে এবং স্তন ক্যানসারের মতো মারণব্যাধি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, বাংলাদেশে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ পায় ৫১ শতাংশ শিশু। আর জন্মের পর ৬ মাস পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ শিশু মায়ের দুধ পান করতে সক্ষম হয়। অথচ আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে এ হার বেশি। আজকাল কর্মজীবী মায়েরা চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, অনেকক্ষেত্রে গৃহকর্মীর ওপর সন্তানের দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়। কখনো তাদের সদ্যোজাত সন্তানকে শিশুপালন কেন্দ্রে পাঠাতে বাধ্য হন। বাংলাদেশেও কিছু কিছু স্থানে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে উঠলেও অনেক ডে-কেয়ার সেন্টারে ব্রেস্ট ফিডিংয়ের সুযোগ নেই। ফলে সন্তানকে সারা দিন মাতৃদুগ্ধ পান করা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। বাংলাদেশে যেসব স্থানে ডে-কেয়ার সেন্টার নেই সেসব স্থানের কর্মজীবী নারীদের পড়তে হয় আরও বিপাকে। শুধু কৌটাজাত দুধ পান করে শিশুরা বড় হয়ে থাকে। গার্মেন্টস কর্মীর মতো নিম্নবিত্তের কর্মজীবী নারীদের অবস্থা আরও করুণ। তাদের সন্তানকে অন্যের কাছে রেখে কাজে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে বেশির ভাগ শিশুই জন্মের পর থেকে মায়ের দুধপানে ব্যর্থ হয়ে নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বেড়ে ওঠে এবং অপুষ্টি ও রোগভোগের শিকার হয়। আমাদের দেশে আজও জন্মের পর এক ঘণ্টার মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশু মায়ের শালদুধ পান করতে না পারার অনেক কারণ রয়েছে। শিশুর জন্মের পর ছয় মাস বুকের শালদুধ পান করানো যে কত জরুরি সেই বিষয়ে শহরাঞ্চলের শিক্ষিত ও বিত্তশীল পরিবারের মায়েদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের মায়েরা তো এখনো শালদুধ পান করানো নিয়ে কুসংস্কারে ভুগছেন। এমনকি দেশের কিছু বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে মায়ের বুকের দুধের বদলে কৌটাজাত দুধ খাওয়ানো নিয়ে একরকম বাণিজ্যও রয়েছে।
শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব বিষয়ে ব্যাপক প্রচারের জন্য সারা বিশ্বের নারীদের উৎসাহিত করতেই ১ থেকে ৭ আগস্ট ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালন করা হয়। ১৯৮১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউট’ অনুমোদন লাভ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালার আলোকে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ অধ্যাদেশ জারি করে। এ অধ্যাদেশে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর পুষ্টি ও দেহের জন্য মায়ের দুধ একমাত্র উৎকৃষ্ট খাদ্য, এর কোনো বিকল্প নেই- এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপিত হয়। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৫৪তম বিশ^ স্বাস্থ্য সম্মেলনে শিশুকে জন্মের প্রথম ৬ মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর প্রস্তার গৃহীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০০৩ সালের ৩১ মার্চ শিশুর জন্ম-পরবর্তী ৬ মাস শুধু মায়ের দুধ এবং এর পর থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি সহায়ক খাদ্য খাওয়ানোর আদেশ জারি করা হয়। সব মা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন তার অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টি করাই মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালনের প্রধান উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনধারণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুন্দর, সুস্থ ও সবলভাবে শিশুকে গড়ে তুলতে এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সরকারি, বেসরকারি প্রতিটি কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার ও মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ স্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। এরপর ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। জনসমাগমস্থলে স্মোকিং জোন থাকলেও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও বেবি কেয়ার জোন চালু হয়নি। এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং-এর আওতায় সব মায়েদের আনার জন্য সরকারি, বেসরকারি দপ্তরসহ হাসপাতাল, টার্মিনাল, স্টেশন, সব পাবলিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও তা বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়নি। কিছু কর্নার চালু হলেও তা ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের এ ব্যাপারে উৎসাহের অভাব রয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ।স
শিশুর জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই। জন্মের পর শিশুর বেঁচে থাকা এবং স্বাভাবিকভাবে সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের বুকের দুধের ভ‚মিকা অপরিসীম। শিশুকে মায়ের দুধ পান করিয়ে সার্বিক যত্ন নিতে বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মায়েরা ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেন। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় মায়েদের এতদিন ছুটি দেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটির সমতা আনা জরুরি। পাশাপাশি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনসহ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করা প্রয়োজন। মায়ের দুধ পান করা শিশুর জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, সেটা তার জন্মগত অধিকার। শিশুর সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক শুধু দেহের নয়, এ সম্পর্ক আত্মিক, স্বর্গীয়। দশ মাস মাতৃগর্ভে যে শিশু বেড়ে ওঠে, সেই নাড়িছেঁড়া ধন জন্মলাভের পর মায়ের বুকের দুধপান থেকে বঞ্চিত হবে, এটা একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ কল্পনা। মাতৃদুগ্ধ পানের মাধ্যমেই মায়ের সঙ্গে শিশুর যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা থাকে আমৃত্যু। এ সম্পর্ককে অবহেলা করে শিশুকে মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত করা অমানবিক। কর্মক্ষেত্রে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে যেন একজন কর্মজীবী মা সমর্থ হন সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, শপিংমল, কল-কারখানার নিজস্ব উদ্যোগে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করতে হবে। এ লক্ষ্যে পেশাজীবী সংগঠন. ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে
লেখক
প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক