জাবিতে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য সমাধান কাম্য

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৬ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একাধিকবার ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। এ ছাড়াও হয়েছে বিশেষ বিশেষ কারণে। এবারের ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে। বিক্ষোভকারী ছাত্র-শিক্ষকদের দাবি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে উপাচার্যের পদত্যাগ। আর এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান অটল। সমস্যা এখানে

তদুপরি গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো নতুন উপসর্গ বিক্ষোভে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করতে স্থানীয় ছাত্রলীগ বাহিনীর হামলা বিক্ষোভকারীদের ওপর। তাতে শিক্ষকসহ ৩০-৩৫ জন ছাত্র আহতস এমন খবরই প্রকাশিত হয়েছে সংবাদপত্রে। ঘটনা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক, সন্দেহ নেই। শিক্ষায়তনের সর্বোচ্চ স্তরে এ ধরনের নৈরাজ্য যুক্তিবাদী মানুষমাত্রেরই আকাক্সিক্ষত নয়, বাঞ্ছিতও নয়। এর সুষ্ঠু সঠিক যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান দরকার। দরকার এ কারণেও যে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ হয়নি।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত শক্তিমান ছাত্রলীগ বাহিনীর হামলার পরও বিক্ষোভ-আন্দোলন বন্ধ হয়নি। বরং তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ-শিরোনাম : ‘দিনে বিক্ষোভ, রাতে উপাচার্যের বাসভবনের কাছে প্রতিবাদী গান।’ সমাবেশ বন্ধ হচ্ছে না।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘আন্দোলন দমাতে সব পদক্ষেপই নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু উপাচার্যকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী।’ চলছে বিক্ষোভ-সমাবেশ-মিছিল। মনে হয় না শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ-সমাবেশ সহজে বন্ধ হবে। এ অবস্থায় অবাঞ্ছিত ঘটনার অবসান ঘটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এগিয়ে আসা উচিত। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। দোষ করাটা ঠিক হবে না।

ইতিমধ্যে দুটো বিপরীতধর্মী ঘটনা ছাত্রসমাজকে চঞ্চল করে তোলে। প্রথমত, বুয়েটে সম্ভবত ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় পুলিশের বিশেষ বিভাগ তৎপর হয়ে ঘটনার পরদিনই আবরার হত্যায় সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করে এবং দ্রুতই তদন্ত শেষ করে। আলামতের অবশ্য অভাব ছিল না হত্যাকারীদের সীমাহীন আত্মবিশ্বাসের কারণে।

অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ৫ নভেম্বরে পুলিশ ‘২৪ জনকে আসামি করে চার্জশিট প্রস্তুত’ করে। সংবাদ শিরোনাম কালের কণ্ঠ পত্রিকায়। প্রথম পৃষ্ঠায় আসামিদের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ। পুলিশের ভাষ্য মতে এরা সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তাদের বক্তব্ ‘দু-এক দিনের মধ্যেই চার্জশিট আদালতে পেশ করা হবে।’

কিন্তু দুর্বোধ্য বিষয়টি হলো বুয়েটে ব্যাপক ও তীব্র ছাত্র আন্দোলন সত্ত্বেও সেখানকার উপাচার্য পদত্যাগ করেননি এবং সেখানে ছাত্র আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত, সম্ভবত পূর্বোক্ত পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ঘটনা একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশবিদ্যালয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করতে সেখানকার শক্তিশালী ছাত্রলীগ বাহিনী (৫.১১.২০১৯) মাঠে নামে

ইতিমধ্যে জাবি উপাচার্য ছাত্র আন্দোলন বন্ধ করার চিরাচরিত নিয়ম ও ঐতিহ্যানুসারী হয়ে বিশ^বিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন এবং ছাত্রছাত্রীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেন। যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে। একুশের ভাষা আন্দোলন দমন করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম লীগ সরকারের পরোক্ষ নির্দেশে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং ছাত্রদের হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। সে নির্দেশ অবশ্য পালিত হয়েছিল। আর সে কারণে ঢাকা শহরে একুশের ভাষা আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ স্তব্ধ হয়ে যায়।স

কিন্তু সময়টা ১৯৫২ নয়। প্রায় সাত দশকের ব্যবধানে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে শিক্ষায়তনগুলোতে এবং ছাত্রসমাজে; ঘটনার ভিন্নতায় এবং মানসিকতা ও তৎপরতার চরিত্র বৈশিষ্ট্যে। ছাত্রছাত্রীরা মানেননি উপাচার্যের তথা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশ। বিক্ষোভ আন্দোলন অব্যাহত থেকেছে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে। অচল অটল উপাচার্য। তাই অবরুদ্ধ উপাচার্য।

এবার কিছু পরস্পরবিরোধী ঘটনা। বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধÑ বুয়েটসহ সবার এই দাবি স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও দেখা গেল কার্যত তার বিপরীতটাই সত্য হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের। আগেই বলেছি, এখানকার শক্তিমান ছাত্রলীগ নেতৃত্ব কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। এখানকারই এক ছাত্রনেতা একদা চরম অনৈতিকতার সেঞ্চুরি উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরিণামে শুধু বহিষ্কার।

এখানকারই এক ছাত্রনেতা আবরার হত্যাকে দেশপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, এই ছোট খবরটি একটিমাত্র কাগজে দেখেছিলাম। আবরার হত্যা ঘটনার ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার দাবির প্রতি মনে হয় প্রধানমন্ত্রীরও পরোক্ষ সমর্থন ছিল। যাতে অবাঞ্ছিত ঘটনা আর না ঘটতে পারে।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগ সেদিন ভিন্ন ধরনের হলেও অবাঞ্ছিত ঘটনাই ঘটাল। হামলা চালিয়েছে আন্দোলনকারীদের ওপর। দৈনিকগুলোতে মোটা হরফে শিরোনাম : ‘উত্তাল জাবি বন্ধ’ শিক্ষক সমিতির চার নেতার পদত্যাগ’। অন্য একটি শিরোনাম : ‘ছাত্রলীগের হামলার পর উত্তাল ক্যাম্পাস’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ’। অন্য একটি দৈনিকে খবর : ‘বন্ধ ঘোষণা সত্ত্বেও উত্তাল জাবি’ ইত্যাদি।

ছাত্রলীগ অবশ্য দাবি করতে পারে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করতে এই হামলা। কিন্তু সহিংসতার পক্ষে কি কোনো যুক্তি ধোপে টেকে? বিশেষ করে যে উপাচার্যের ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপে চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে এত কথা হলো, এত লেখালেখি হলো কাগজে! অন্তত এমন একটি অনৈতিক ঘটনার সত্যাসত্য প্রমাণের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন হওয়া তো উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তাই এত সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি পদত্যাগ করেননি। বিক্ষোভ, আন্দোলনের মধ্যে তাই পরিত্রাতার ভূমিকায় সহিংস ছাত্রলীগ। একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘মুক্ত ভিসি কৃতজ্ঞতা জানালেন ছাত্রলীগকে’। মুক্ত ভিসি কি বুঝেশুনে এই ঘোষণাটি দিয়েছেন? এর তাৎপর্য হলো, এরপর তাকে ছাত্রলীগের ইচ্ছায় চলতে হবে সুবিধা, অনৈতিকতা, প্রশ্রয়, দুর্নীতি সবকিছুতেই। এ সত্যটি সাধারণ বুদ্ধির মানুষও বোঝে। উপাচার্য মহোদয়া সম্ভবত মুক্তির আবেগে-আনন্দে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভাবনাচিন্তা না করেই।

একটি পত্রিকা লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী জাবির ঘটনাবলির ওপর নজর রাখছেন। তিনি কি লক্ষ করেছেন যে, ছাত্রলীগের সহিংস হামলায়, একটি সংবাদ ভাষ্য মতে, ‘শিক্ষক-ছাত্রসহ আহত ৩০’। আবরার নির্যাতন ও হত্যার আগে তিনি ছাত্রলীগের ক্রিয়াকলাপে রশি টানার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। যুবলীগের বিরুদ্ধে অভিযান, আওয়ামী লীগেও শুদ্ধি অভিযান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের যেসব নির্দেশ তিনি দিয়েছেন সেই নীতির পরিপ্রেক্ষিতেই কি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতার ঘটনা বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত নয়?

অশান্ত বুয়েটকে শান্ত করতে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল যার ফলে হত্যাকারীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার এবং সম্প্রতি ২৫ জন আসামির বিরুদ্ধে পুলিশের চার্জশিট তৈরি, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সহিংস হামলার বিষয়টিও বিবেচিত হওয়া দরকার। কারণ জাবিও এখন ‘উত্তাল’। সর্বশেষ সংবাদ, ছাত্রীরাও নাকি হল থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছেন, ছাত্ররা তো বটেই।

অশান্ত, উত্তাল জাবি ক্যাম্পাস শান্ত করতে অসুবিধা কোথায়Ñ বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কায় দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন প্রয়োজন থাকলেও তাতে সমস্যার সমাধান নেই। জাবির অবাঞ্ছিত ঘটনাবলির নিয়ন্ত্রণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিকট অতীতে বিচক্ষণ পদক্ষেপের পরিচয় দিতে পারেনি। কাজেই ক্যাম্পাসে শান্তি ও শিক্ষার যথার্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সিদ্ধান্তই কাম্য। বাঞ্ছনীয় ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত।

লেখক

ভাষা সংগ্রামী, লেখক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত