পেঁয়াজের দাম কমাতে সরকার কী করছে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৭ পিএম

সম্প্রতি ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া এবং পরবর্তী ঘটনাক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও জেলা প্রশাসন কোনো ধরনের উদ্যোগ না নিয়ে নীরব থাকায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এক বক্তব্যে রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোসহ নানা অজুহাতে ব্যবসায়ীরা বারবার তাৎক্ষণিক দাম বাড়ালেও বিদেশে দাম কমলে তার প্রতিফলন দেশে হয় না, তখন উল্টো সুর বেশি দামে কেনা, লোকসান দিয়ে বিক্রি করব নাকি এসব কথা শুনে থাকি। যেকোনো পণ্যের দাম বাড়লে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন ওই খাতের ব্যবসায়ী ও ভোক্তা এবং প্রশাসনের লোকজনকে নিয়ে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ সভা করে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা, বাজার তদারকি জোরদার করে মজুদদারি ঠেকানো, টিসিবিকে দিয়ে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে অস্থিরতা দূরীকরণে উদ্যোগ নেওয়ার উদাহরণ থাকলেও ইদানীং ব্যবসায়ীদের ওপর সবকিছুর ছেড়ে দিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল লোকজন দিবাস্বপ্নে বিভোর। এ অবস্থায় জনগণের অবস্থা ত্রাহি, ত্রাণকর্তা হিসেবে একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া উপায় থাকছে না।

এর আগে ব্যবসায়ীরা বাজেটে শুল্ক আরোপসহ নানা অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ালে সরকার বেশ কিছু পণ্যের বিষয়ে শুল্ক ছাড় দিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে বাজারে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ অবস্থায় জরুরিভাবে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি, ক্যাব, গণমাধ্যম ও চেম্বার প্রতিনিধি সমন্বয়ে বাজার তদারকি জোরদার, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জরুরি সভা করে সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণ, বিকল্প উৎস থেকে এসব পণ্য আমদানি নিশ্চিত করা, বিকল্প বাজার হিসেবে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি জোরদার করার দাবি জানিয়েছে, দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠন।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের অজুহাতে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি প্রায় ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ভারতের রপ্তানি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বাজারে দাম বেড়ে গেছে। অথচ ভারতে দাম কমলে দেশের ভোক্তারা তার সুফল পান না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা কারণ দেখাচ্ছেন ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যে বন্যা হওয়ায় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আমদানি কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে হিলি বন্দরের পাইকাররা কারসাজি করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থায় যখনই কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হয়, পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান আর খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে জনগণের নাভিশ্বাস তৈরি করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের আওতাধীন টিসিবি স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয় করে ঢাকা শহরে ট্রাকে করে কিছু পেঁয়াজ বিক্রি করলেও নিজেরা আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পেঁয়াজ আনেনি। ফলে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া টিসিবি জনগণের সংকটকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের উদ্ধারকর্তা হতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত অফিস ও জনবল এবং বিশাল বহরের ডিলাররা বেকার বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। ক্যাব দীর্ঘদিন ধরে টিসিবিকে কার্যকর করা, বর্তমান প্রশাসনিক অবকাঠামোকে পুনর্গঠন করে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য দাবি জানালেও সরকার সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যার খেসারত সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে।

এদিকে সরকার টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি না করে কিছু বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির জন্য উদ্যোগ নেয়। ফলে ব্যবসায়ীরা আজ-কাল এভাবে কালক্ষেপণের কারণে সমস্যাটি আরও ঘনীভূত হতে লাগল। বৃহৎ শিল্প গ্রুপের পেঁয়াজ এখনো দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। বিষয়টিকে আবারও ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারের আত্মসমর্পণ বলে মন্তব্য করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কারণ সরকার যদি পেঁয়াজ আমদানি করত, তাহলে ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের এত নির্ভরশীলতা বাড়ত না। মানুষের দুর্ভোগ সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছাত না। বাজার ও ভোক্তা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ আমদানিকারক ও বড় ব্যবসায়ী কর্তৃক পণ্যের হাতবদল। কারণ যখনই হাতবদল হয় তখনই লাভের অঙ্ক বেড়ে যায়। বৃহৎ আমদানিকারক ও শিল্প গ্রুপ যখন আমদানি করবে তারা, নিজেরা সরাসরি এগুলো বিক্রি করবে না, বিভিন্নজনের কাছে পাইকারিতে বিক্রি করবে আর তাদের মাধ্যমে আরও হাতবদল হয়ে আবারও পেঁয়াজের বাজার অস্থির হতে থাকবে।

এ ছাড়া একটি শুভঙ্করের ফাঁকি আছে পেঁয়াজের উৎপাদন ও ব্যবহার  এবং পরিসংখ্যান নিয়ে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ লাখ টন আর দেশে উৎপাদিত হয় ১৮ লাখ টন। বাদবাকি আট লাখ টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু সিংহভাগ দেশে উৎপাদিত হলেও দেশীয় পেঁয়াজের দাম সব সময় বিদেশি পেঁয়াজের চেয়ে বেশি থাকে। দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে সব সময় সহজলভ্যও নয়। সে কারণে দেশীয় পেঁয়াজের চাহিদা ও উৎপাদনের বিষয়ে পরিসংখ্যানটি কতটুকু সত্যি, তা যাচাই করা দরকার। বাজার ও ভোক্তা খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভারতীয় গরু আমদানির নির্ভরতা কাটাতে দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলায় সাফল্যের দৃষ্টান্তটি মাথায় রেখে, পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়িয়ে এ সংকট নিরসনের চেষ্টা চালানো যেতে পারে। কিন্তু দেশের কৃষকরা যখন নতুন পেঁয়াজ ঘরে তুলবেন, তখন ভারতীয় ও অন্য উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়লে দেশীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই দেশীয় চাহিদা ও উৎপাদনের প্রকৃত পরিসংখ্যান সামনে আনা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকের হাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পৌঁছানো নিশ্চিত করতে ওই মৌসুমে বিদেশি পেঁয়াজ আমদানিতে উচ্চহারে কর আরোপ করতে হবে। এ ছাড়া প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনা হিসেবে স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকি প্রদান, কৃষকপর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য খাদ্যগুদাম, হিমাগার নির্মাণ করা যেতে পারে।

পেঁয়াজ সংকট চলাকালে জেলা প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বিত বাজার অভিযানকালে যে বিষয়টি বেশি করে দেখা গেছে, তা হলো আমদানিকারক আমদানি করে আড়তদারদের হাতে পণ্য পৌঁছানোর সময় তাদের হাতে কোনো রসিদ দেন না। অনেকের মতে, যে ট্রাকে করে আমদানিকারক পেঁয়াজ আড়তদারদের কাছে পাঠান, তারা তা বিক্রি করে ওই ট্রাকে করেই টাকা পাঠান। তারা জানেন না কে আমদানিকারক ও কত টাকা আমদানি মূল্য। আবার অনেকে আমদানিকারকদের কাছে টাকা পাঠান কিন্তু নাম, ঠিকানা জানেন না। বিষয়টি অনেকটাই অদৃশ্য ব্যবসার মতো। রসিদ, আমদানি মূল্য ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা ছাড়া যদি কেউ পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন, তাহলে এটা অদৃশ্য ব্যবসা ছাড়া কিছু হতে পারে না। তাই পেঁয়াজ আমদানিকারক, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায় এ ধরনের অদৃশ্য ব্যবসাকে একটি কাঠামোর মধ্যে না আনা হলে কৃত্রিম সংকটের এই সিন্ডিকেটপ্রথা ভাঙা সম্ভব হবে না। অবাক করা কাহিনী হলো, টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ৪২ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে সেটার মূল্য ৯০-১০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা তাদের গুমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে এ ধরনের পেপারলেস কারসাজিতে লিপ্ত।

সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ কমাতে কার্যকর ও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সমন্বিত বাজার তদারকি কার্যক্রমের একটি মডেল চলমান ছিল। যেখানে জেলা-উপজেলা প্রশাসন সফলভাবে নেতৃত্ব প্রদান করলেও বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের মতো অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে প্রশাসনের দৃষ্টি না থাকায় তারা সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ কমাতে উদ্যোগ নিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় দুর্ভোগের বিষয়টি যেন গৌণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকটাই দায়সারাভাবে দায়িত্বপালন করে দু-একটি জরিমানা করেই কাজ শেষ করতে চান অনেকে। আবার মোবাইল কোর্ট আইন বা অন্য আইনগুলোতেও বলা আছে ফলোআপ করার কথা। অর্থাৎ আজকে যে অপরাধের জন্য একজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হচ্ছে, তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা যে সে পরে কী করছে? ব্যবসায়ীরা অনেক সময় মোবাইল কোর্টে জরিমানা দিতে আগ্রহী, কারণ সে বিশ্বাস করে যদি আজকে জরিমানা প্রদান করা হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তার দোকানে আর এক মাস আসবেন না। ফলে সে আবার আরও বেপরোয়া হয়ে অপরাধ সংঘটনে লিপ্ত হতে পারবে। ফলে সমন্বিত বাজার তদারকির মতো সরকারের অনেক উদ্ভাবনী উদ্যোগের সুফল তৃণমূলপর্যায়ের মানুষের উপকারে আসছে না। অন্যদিকে যে যেভাবে পারে লুটপাট করছে, জনগণের পকেট কাটছে, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন সেখানে নীরব দর্শক। প্রশাসনের নীরবতায় সর্বত্রই চলছে অসাধু ব্যবসায়ীদের লুটপাটের রাজত্ব। বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের নানা সভার সিদ্ধান্ত শোনা গেলেও তার কার্যকারিতা কতটুকু, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

লেখক

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত