ষড়যন্ত্র, রাজনীতি ও অতি-রাজনীতি

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ১০:১৪ পিএম

রাজনীতির এ কোন মুখ দেখছি আমরা? কোনো সমস্যার প্রতিকার নেই, নিদান নেই, আন্তরিক উদ্যোগ নেই, এমনকি কোনো ‘বিরুদ্ধস্বর’ শোনারও মানসিকতা নেই! একটি সমস্যা সামনে আসে, আর ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয় : সরকারকে বিব্রত করার জন্য একটি মহল এই কাজ করছে। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। পেঁয়াজ-চালের মূল্যবৃদ্ধি, বুয়েটশিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন, ট্রেন দুর্ঘটনা, সব ব্যাপারেই ক্ষমতাসীনদের একই বক্তব্যÑ একই প্রতিক্রিয়া। ক্ষমতাসীনদের এই বক্তব্যের সমর্থনে একশ্রেণির ‘ধামাধরা’ লেখক, কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মীও বীরবিক্রমে মাঠে নেমে পড়েন। তারাও ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যকে অভ্রান্ত প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কারা বিব্রতকারী বা ষড়যন্ত্রকারী, সেটা স্পষ্ট হয় না। ফলে অদৃশ্য বিব্রতকারী-ষড়যন্ত্রকারীরা এই সর্বনাশা কার্যক্রমে ইন্ধন জুগিয়েই চলে!

বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা, কোনো রকম বিরোধিতা ও সমালোচনাকে সহ্য না করা। সমালোচনা শুনলেই ক্ষমতাসীনরা কেমন যেন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। বিরোধী কণ্ঠস্বর দেখলেই তীব্র হিংসার প্রয়োগে স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়।  আমাদের রাজনীতিতে এ অসুখটা দিন দিন যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে। অসহিষ্ণুতা তীব্রতর হচ্ছে।  বাড়ছে হিংসার দাপট।

শাসনপ্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যত রকমভাবে অসুস্থ করে তোলা সম্ভব, তত রকমভাবেই চেষ্টা হচ্ছে যেন। এমনিতেই আমাদের দেশে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রয়েছে ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও অনাস্থা। সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা ছিল ক্ষমতাসীনরা তাদের কাজ দিয়ে, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা দিয়ে, কল্যাণমুখী বিভিন্ন উদ্যোগ দিয়ে সেই ক্ষত সারিয়ে তুলবেন। ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে সব প্রশ্ন ও অসন্তোষ ভুলিয়ে দেবেন। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সেই পথ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছেন। কল্যাণমূলক উদ্যোগ তো দূরের কথা, শাসনপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দেশবাসী নিত্যনতুন সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধান তো করতে পারছেনই না, এমনকি সংবেদনশীল ভূমিকাও পালন করতে পারছেন না। আর এতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বিরক্তি বাড়ছে।

 

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা রাজনীতিকে ‘খেলো’ বানিয়ে ফেলেছেন। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। যুদ্ধ ও রাজনীতি কোনো নিয়ম মেনে চলে না। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা, শিষ্টাচার, নীতিবোধের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো দিনই রাজনীতি বা নির্বাচন সম্পন্ন  হয়নি। এসব আপ্তবাক্য বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। আর এসব বুলির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের অধিকার। দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি। অসুস্থ বিকৃত রাজনীতিই জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের ওপর চেপে বসছে। অথচ একটা সময় বাঙালির গর্ব করার বিষয় ছিল তার রাজনৈতিক বোধ। আমরা রাজনীতি সচেতন, সাম্প্রদায়িক নই, অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার। অর্থাৎ আদর্শ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য যা যা অপরিহার্য, সেগুলো আমাদের ছিল। ছোটবেলায় মনে প্রশ্ন আসত, মানুষ রাজনীতি করে কেন? বড় হতে হতে আস্তে আস্তে জানতে পারলাম, জীবনের প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে রাজনীতি। তা সে হোক দেশশাসন বা কোনো সংস্থা পরিচালনা, অথবা অর্থনীতির কোনো বিষয়। কিংবা শিক্ষার বা খেলার জগৎ। রাজনীতি ছাড়া জীবন অচল।

 

আমাদের দেশে রাজনীতিবিদরা রাজনীতিকে যেমন ‘খেলো’ নীতিহীন এক বাটপারির বিদ্যায় পরিণত করেছেন, আমরাও সেই দলীয় রাজনীতির জামা গায়ে পরে দিব্যি চাপা পিটিয়ে যাচ্ছি। আমাদের আড্ডায়-গল্পে সাবলীলভাবে ঢুকে পড়ে রাজনীতির আলোচনা। আমরা গলা ফাটিয়ে নিজের দলের পক্ষে এবং প্রতিপক্ষ দলের বিপক্ষে কথা বলি, চায়ের কাপে ঝড় তুলি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের সব রাজনৈতিক বিবেচনা ও আবেগ রাজনৈতিক সমর্থনতাড়িত। আমরাও দলান্ধ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। আমরা যে দলকে সমর্থন করি সেই দল খারাপ কিছু করলেও আমাদের সমর্থন দলের পক্ষেই থাকে। ফলে খারাপ কাজ করলেও দলের সমর্থন খুব একটা কমে না। পাঠক বা শ্রোতারাও এখন দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট। কেউই বস্তুমুখী সৎ খবর পছন্দ করেন না। মনমতো খবর তাদের কাছে পৌঁছলেই তারা খুশি। তারা এমন খবর খোঁজেন যা মনকে তৃপ্তি দেবে। আজকের পাঠক নিজের পছন্দের কাগজ থেকে নিজ মতাদর্শ সমর্থনের পাথেয় জোগাড় করে নেন। সংবাদপত্র গোষ্ঠীর ‘টার্গেট মার্কেটিং’ মডেলটা বেশ খাপ খায় এর সঙ্গে। এলাকার রাস্তা কেন খারাপ? উত্তর, নিশ্চয়ই বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র অথবা ক্ষমতাসীনদের অপদার্থতা, যিনি যেটা শুনতে চান। বিরোধীরা সব সময় সরকারের দোষ দেখেন, আর ক্ষমতাসীনরা সব কিছুতে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র খুঁজে চলেন। অথচ রাস্তা খারাপ থাকার প্রকৃত কারণ হয়তো অন্য।

আশ্চর্যের বিষয়, আপাদমস্তক পক্ষপাতদুষ্ট সাধারণ মানুষের সংখ্যাটাই সমাজে অনেক বিশাল। এই বিশাল সংখ্যা নেহাত উপেক্ষার বস্তু নয়। এটা কি কাম্য? তাই কি এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ধর্ষণ বা খুনের তদন্তে শেষ অবধি ন্যায়বিচার জোটে না, কেবল পক্ষপাতদুষ্ট পারস্পরিক দোষারোপ চলতে থাকে, এবং শেষ পর্যন্ত উপসংহার যে কী হবে, সেটা প্রায় পূর্বনির্ধারিতই বলা চলে!

কোনো রাজনৈতিক দলের তাই আজ আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। বাস্তব যেহেতু অস্পষ্ট, নীতি বস্তুটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো, আদর্শ কাকে বলে তাও কেউ ঠিকমতো জানে না, তাই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে এসবের ব্যাখ্যা দিয়ে যায়, আর মানুষ পক্ষপাতদুষ্ট মনে কোনো রকম অগ্রপশ্চাৎ বিচার না করেই সেসব গ্রহণ করে। অপছন্দের তথ্যকে সন্দেহ করে, তাকে গুরুত্ব দেয় না, গ্রহণ করে না। আর পছন্দের মিথ্যাকে বিশ্বাস করে, ওপরে তুলে ধরে। এই অতি-রাজনীতির জেরে সমাজের অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাকে কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক বলা চলে? ভালো যদি সমর্থিত না হয়, খারাপ যদি ধিকৃত না হয়, তবে তা কি সমাজের জন্য ভালো হতে পারে?

সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের জন্য পক্ষপাতশূন্য স্বচ্ছ চিন্তার যুক্তিবাদী মন প্রয়োজন। কিন্তু আগে থেকেই যারা রাজনীতি, আর তার পছন্দমতো রাস্তা নিয়ে বসে আছেন, তাদের পক্ষে তো সমস্যাগুলোও ঠিক করে বোঝা সম্ভব হয় না, সমাধান তো দূর অস্ত।

বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতির অভিধানে ‘মিথ্যা কথা’র পরিবর্তে প্রবেশ করতে পারে একটি নতুন শব্দ : ‘রাজনৈতিক কথা’। অর্থাৎ ডাহা মিথ্যা কথাও রাজনৈতিক হলে এখানে চলে যায়, চালানো যায়। রাজনীতিই যখন মুখ্য, সেখানে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার দরকার কী। বরং সেই ফাঁকে স্বার্থ গুছিয়ে নেওয়াই বুদ্ধির কাজ। সত্য বা সততা এখন বোকামির লক্ষণ। যে যত বুদ্ধিমান, সে তত মিথ্যা ও ভুলের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে স্বার্থের সিদ্ধি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নেয়। আমরা সবাই জানি এবং মানি যে, কাল দুই পা এগোনোর জন্য আজ এক পা পেছানোই ঠিক কাজ।

 

কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, সে সবই প্রেক্ষিতনির্ভর। সুতরাং এ ‘পাপ’ কারও একার নয়, এ ‘পাপ’ আমাদের সবার। অথচ যে কোনো সমাজের মতো বাঙালি সমাজেও বেশ কিছু মানুষ কাজ করতে ভালোবাসেন, কাজ করে তৃপ্তি পান। তাদের অনেকেরই জীবনবোধ বা রাজনীতিবোধ হয়তো তত স্পষ্ট নয়, কিন্তু তারা সকলেই জানেন, কাজের জন্য, জীবিকার জন্য প্রয়োজনে কিছু ছাড়তে হয়। এই মানুষগুলোকে রাজনীতি তার নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছে। শাসনের প্রতি স্তরে, সরকারি পদের নিয়োগে স্বজন-পোষণ চালু করে এই রাজনীতি কাজের মানুষদেরও রাজনীতির মানুষ বানিয়ে নিয়েছে। কাজের স্বার্থে ও ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজের মানুষও ক্রমে ক্রমে শাসকের অনুগত হন। জীবনের স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধেগুলো পাওয়ার জন্যও শাসক দলের রাজনীতির আনুগত্য প্রকাশ করতে তারা ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে যান। এভাবে সাধারণ মানুষও রাজনৈতিক হয়ে পড়েন, হয়ে পড়ছেন।

রাজনীতি এখন রোজ সঙ্কীর্ণ থেকে সঙ্কীর্ণতর হচ্ছে। চরম অবক্ষয়গ্রস্ত হচ্ছে। সমস্যাকে স্বীকার না করে, কেবলই অন্যের ওপর, অদৃশ্য ষড়যন্ত্রকারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেরা ভালো থাকা মোটেও সুস্থতার পরিচায়ক নয়।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা জরুরি। যে ওষুধে রোগ নিরাময় হয়, তারই অতিরিক্ত সেবনে আবার হিতে বিপরীত হয়। প্রাচীন সমাজতত্ত্ববিদ চাণক্য বলেছিলেন, ‘যা কিছু মাত্রাতিরিক্ত তা-ই বিষ।’ এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা রাজনীতি বিষয়েও প্রাসঙ্গিক। সমগ্র জাতি যদি চব্বিশ ঘণ্টা ধর্মাচরণে ব্যস্ত থাকেন, তা হলে কিছু মানুষ হয়তো তৃপ্তি পাবেন, কিন্তু সার্বিকভাবে তা দেশের পক্ষে কোনোভাবেই শুভ হতে পারে না। দেশের সব মানুষ হিমালয় বা সাগর-অভিযানে মেতে উঠে বেরিয়ে পড়লে সেটাও দেশের পক্ষে সুখকর হবে না। একই কথা প্রযোজ্য রাজনীতির প্রসঙ্গেও। সবাই রাজনীতিবিদ হলে, সবখানে রাজনীতি টেনে আনলে, সব কিছু রাজনীতিবিদদের স্টাইলে এড়াতে চাইলে শেষ পর্যন্ত সমাজেরই বিপদ।  বিপদ রাজনীতিবিদদেরও! লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত