সড়ক পরিবহন আইনের শিথিল প্রয়োগ করা হবে–এই আশ্বাসে আপাত স্বস্তি ফিরে এসেছে। ১ নভেম্বর সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ শুরু হতে না হতেই দেশের নানা স্থানে পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু হয়েছিল। সারা দেশের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে রাজধানীর গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আইন প্রয়োগের প্রথম দিনে ৮৮টি মামলা ও কয়েক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করার খবর প্রচারিত হওয়ায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। বিআরটিএ আইনের যে ধারাগুলোতে শাস্তির বিধান আছে, সেগুলোকে আলাদা করে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে শাস্তির ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বেশ ভালোভাবেই। ফলে সড়কে স্বস্তি কীভাবে স্থায়ী হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। কোনো দেশের অর্থনীতির গতিপ্রবাহ, সড়কপথে নিরাপদ ভ্রমণ, পণ্য পরিবহন ও পরিবহন শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন এক সূত্রে গাঁথা। পরিবহন ব্যবস্থা অনেকটা শরীরের রক্তপ্রবাহের মতো। রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলে যেমন শরীরের কোনো অঙ্গই সচল থাকতে পারে না, তেমনি পরিবহন ব্যবস্থা অচল হলে দেশের কৃষি-শিল্পসেবা–সব খাত অচল হয়ে যেতে বাধ্য। যদিও পরিবহন খাত বলতে নৌ, রেল, সড়ক, বিমান–সব খাতকেই বোঝায় কিন্তু বর্তমানে আমাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক পরিবহন খাত। প্রতিদিন কমপক্ষে তিন কোটি যাত্রী, খাদ্যসহ (ধান, চাল, সবজি, ফল, চিনি, তেল, চা, মাছ, গরু-ছাগল, মুরগি, ডিম ইত্যাদি) জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, রড, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি মিলে বার্ষিক ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য পরিবহন, ৩৫ লাখের বেশি যানবাহন আর ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক নিয়ে বিশাল এই পরিবহন জগৎ। হাজার হাজার কোটি টাকা যানবাহন কিনতে বিনিয়োগ, প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভাড়া বাবদ আয় আর সরকারের বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের খাত এই পরিবহন সেক্টর। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ১০ লাখের মতো মোটর মেকানিক, মোটর পার্টস ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বহু খাতের মানুষ। নিরুপায় যাত্রী, স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক, শক্তিশালী মালিক এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি নিয়ে এই খাত সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। সড়কে দুর্ঘটনা আতঙ্কিত করে তুলছে সবাইকেই। কিন্তু দুর্ঘটনার শাস্তি নিয়ে যতটা সরব, দুর্ঘটনার কারণ দূর করার প্রচেষ্টা ততটা দৃশ্যমান হয়ে উঠে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো লাখ লাখ পরিবহন শ্রমিকের অধিকার এবং সমস্যার কথা আলোচিত না হওয়া।
দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক দোষারোপের সাময়িক অবসান ঘটিয়ে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর হতে শুরু করেছে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ৪৭ নম্বর আইন হিসেবে সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস করার পর ৮ অক্টোবর ২০১৮ তা রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। সড়ক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকার ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে এই আইন কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করে। সড়কে শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ৫৪টি সংজ্ঞা এবং ১২৬টি ধারাকে ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা জানি যেকোনো আইনকে প্রয়োগ করতে হলে বিধিমালা প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখনো বিধিমালা প্রবর্তন করা হয়নি। ফলে আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে তা স্পষ্ট না হলেও ১ নভেম্বর থেকেই আইনটি কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেওয়ার কারণে তার কিছু প্রয়োগ শুরু হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহন আইন আমরা চাই, যা সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীর নিরাপত্তাই শুধু নয়, শ্রমিকদেরও আইনি সুরক্ষা দেবে। যে আইনে বিআরটিএসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, পুলিশি হয়রানি, মালিকদের বেআইনি কার্যকলাপ ও শ্রম আইন না মানা, পথচারী ও যাত্রীদের আইন না মানা এবং শ্রমিকদের দায়িত্ব পালন–সবকিছুকেই বিবেচনার আওতায় আনা হবে। সড়কে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, সময়ের অপচয় প্রভ…তি বিষয় নিয়ে সবাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য কোনো না কোনো যানবাহন ব্যবহার করেন। দেশের কৃষি, শিল্প, সেবা খাতের পণ্য, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন প্রভ…তি কাজে ছোট, হালকা, মাঝারি, বড়, ভারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহৃত হয় প্রতিদিন। ফলে সড়কে নিরাপত্তা সবারই মনোযোগ ও বিবেচনার দাবি রাখে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু এবং ৫০ জন মানুষ আহত হয়ে থাকেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এসব কারণেই সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গণতান্ত্রিক সড়ক পরিবহন নীতিমালা খুবই প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক-মহাসড়ক ব্যবহারের নীতিমালা, বিজ্ঞানসম্মত সড়ক নির্মাণ, দুর্নীতিমুক্ত বিআরটিএ প্রতিষ্ঠা, চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ, পরিবহন শ্রমিকদের শ্রমঘণ্টা, বিশ্রাম, নিয়োগপত্র পরিচয়পত্র, মজুরি, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা হয়ে আসছে। আমরা তাই আগ্রহের সঙ্গেই অপেক্ষা করছিলাম একটি গণতান্ত্রিক পরিবহন আইনপ্রণয়নের। কিন্তু যে আইনটি ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে শুরু করেছে, তা স্বস্তির পরিবর্তে পরিবহন শ্রমিকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। আমরা সবাই জানি, যেকোনো আইনের প্রধান লক্ষ্য থাকে সর্বাধিক মানুষের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে আর যাই হোক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না। তাই যদি হতো তাহলে এত জেলখানা, কঠিন শাস্তি ও কারাদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমে না কেন? সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ প্রদান, অপরাধ সংশোধনের উদ্যোগ এবং শাস্তি প্রদান–এর সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু অন্যসব উদ্যোগ সম্পন্ন না করেই শাস্তির লক্ষ্যে আইনপ্রণয়ন করলে তা কখনোই সড়কে শৃঙ্খলা আনবে না। তাই আইন যেন আতঙ্কের কারণ না হয়, সে ব্যাপারে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। সড়ক পরিবহন এমন একটি সমন্বিত খাত, যেখানে সরকার, মালিক, শ্রমিক, যাত্রী–সবার অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব পালন প্রয়োজন। ট্রাফিক ও বিআরটিএর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং মালিকদের মুনাফার লোভে চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোর শাস্তির ব্যবস্থা না করে শ্রমিকদের জন্য জেল, জরিমানা পয়েন্ট কাটা এবং সব দায় পরিবহন শ্রমিকদের ওপর চাপানোর মানসিকতা থেকে আইনপ্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ করতে গেলে তা সড়কের শৃঙ্খলা কতটুকু প্রতিষ্ঠা করবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা যখন আমরা বলি, তখন এ কথা প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া হয়, এটি একটি দুর্ঘটনা। কী কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা যদি বিশেস্নষণ করা হয়, তাহলেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তির বিধান বা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়ানোর পথ বের করা সম্ভব হবে। দুর্ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শাস্তির লক্ষ্যে আইনপ্রণয়ন করা হলে তাতে সড়কে স্বস্তি বা শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না। অপরাধীরা যেকোনো অপরাধ করতে হলে পরিকল্পনামাফিক করে কিন্তু দুর্ঘটনার কি কোনো পরিকল্পনা থাকে? তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শাস্তির বিধান করতে আইন যা করা হলো তাতে দুর্ঘটনাকে আসলে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সে কারণেই দেখা যাচ্ছে, ১২৬ ধারা-সংবলিত সড়ক পরিবহন আইনে ৫১টি ধারা প্রবর্তন করা হয়েছে, যেখানে শাস্তর বিধান আছে। একাদশ অধ্যায়ে আছে অপরাধ, বিচার ও দণ্ড। এ অধ্যায়ে ৪১টি ধারা আছে আর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে অপরাধ, পুলিশের ক্ষমতা এখানে ধারা আছে ১০ টি। অর্থাৎ ৫১টি ধারা সরাসরি শাস্তি সম্পর্কিত। এর বাইরেও আরও কিছু ধারা আছে, যা দিয়ে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। এ কথা মনে রাখা দরকার, আইন এবং ফাইন করে যেমন শৃঙ্খলা আনা যায় না, তেমনি শাস্তির ভয় দেখিয়ে স্বস্তি আনা যায় না। ৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিককে প্রতিপক্ষ বানিয়ে বা তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে সেবা পাওয়া কি সম্ভব? মালিকের চাপ, যাত্রীর উপেক্ষা আর পুলিশের হয়রানির ভয় নিয়ে কি সুস্থভাবে গাড়ি চালানো সম্ভব? একটি গাড়ি যখন ৬০ কিলোমিটার বেগে চলে, তখন প্রতি সেকেন্ডে ৫০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে। ফলে মুহূর্তের অসতর্কতা ভয়ংকর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। গাড়ি চালনা এমন একটি বিষয়, যেখানে সব ইন্দ্রিয় প্রতি মুহূর্তে সজাগ রাখতে হয়। চালকদের ড়্গেত্রে সেই সহযোগিতার মনোভাব না থাকলে নিরাপদ যাত্রা সম্ভব হবে কি?
শ্রমিকদের অবদান ও তাদের অসহায়ত্ব যেন বিবেচনায় রাখা হয়। জীবিকার দায়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় আসা শ্রমিকদের ওপর এমন কোনো শাস্তির বিধান যেন করা না হয়, যার ভার বহন করা শ্রমিকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কীভাবে একজন তরুণ ধীরে ধীরে পরিবহন শ্রমিক হয়ে ওঠে, তা আমরা জানি। সেই পরিবহন শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা যেন ভুলে না যাই। তারা দিনে কত ঘণ্টা কাজ করে, তাদের কর্মপরিবেশ কী, তাদের বিশ্রাম ও ছুটির ব্যবস্থা কী আছে, শ্রম আইনের সুরক্ষা কতটুকু তাদের জন্য প্রযোজ্য, কোন সামাজিক পরিবেশ থেকে তারা উঠে এসেছে, তাদের মজুরি কেমন, তারা কী খায়, কোথায় ঘুমায়, বৃদ্ধ বয়সে তাদের পরিণতি কী হয়, দুর্ঘটনায় পঙ্গু শ্রমিক তার পরিবার নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকে, দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটলে পরিবারের কী দুর্দশা হয়–এই বিষয়গুলো যেন বিবেচনা করা হয়। আইন যেন তাদের কাছে আতঙ্ক হয়ে না দাঁড়ায়। লাখ লাখ অসহায় শ্রমিককে পুলিশি হয়রানির মধ্যে ঠেলে দিয়ে যেন সড়কের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত না করা হয়। সড়ক পরিবহন আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পরিবহন শ্রমিকদের আস্থা অর্জন করার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে শাস্তির বিধান শক্তিশালী করলেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে না। প্রতি বছর পাঁচ হাজার মৃত্যু, হাজার হাজার আহত, শত শত কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এর কারণ যথাযথভাবে উদ্ঘাটন ও দূর করার ড়্গেত্রে যেন সড়ক পরিবহন আইন সহায়ক হয়। পেটের দায়ে কাজ করতে আসা পরিবহন জগতের লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ, ক্লান্ত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন শ্রমিক যেন আতঙ্কিত হয়ে গাড়ি না চালায়, তারা যেন জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা পায়, সড়ক পরিবহন আইন যেন সে নিশ্চয়তা বিধান করে। ভাবতে হবে পরিবহন শ্রমিক এবং যাত্রী পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। তাই শাস্তির খড়গের নিচে শ্রমিকদের রেখে সড়কে শৃঙ্খলা, যাত্রীর নিরাপত্তা আর শ্রমিকের সুরক্ষা কি সম্ভব হবে?
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট