পরিযায়ী পাখি নিয়ে সচেতনতা আসুক

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:১১ পিএম

শান্ত জলের বুকে লাল শাপলার গালিচা ও কচুরিপানার রক্তাভ নীল ফুলের মাঝে ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলছে পরিযায়ী পাখির দল। পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত পরিবেশ। বাহারি রঙের এসব পরিযায়ী পাখির খুনসুটি আর ছোটাছুটি যে কারও মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। শীতের মৌসুমে

প্রকৃতির অপরূপ অলংকার হয়ে ওঠা এ পরিযায়ী পাখির ঝঁাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা ছবি। প্রতি শীতে দূর-দূরান্ত থেকে শীতের পাখিরা আসে আমাদের দেশে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ পাখি দেখতে ভিড় করে বিভিন্ন জলাশয়ে। পাখিদের কলকাকলি যেন প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। গাছের সবুজ, জলের নীল আর পাখিদের নানা রং মনে যে বর্ণিল আবেশ তৈরি করে তার রেশ রয়ে যায় অনেক দিন।

আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে বাংলাদেশে পাখির সংখ্যা প্রায় ৬৫০ প্রজাতির। এর মধ্যে ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী। সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২৯০টি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে জলচর পাখির জন্য স্বীকৃত ২৮টি জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে। এগুলো হলো : বরিশাল বিভাগের চর বারি, চর বাঙ্গের, কালকিনির চর, চর শাহজালাল, টাগরার চর, ডবা চর, গাগোরিয়া চর, চর গাজীপুর, কালুপুর চর, চর মনপুরা, পাতার চর ও উড়ির চর; চট্টগ্রাম বিভাগের চর বারী, বাটা চর, গাউসিয়ার চর, মৌলভীর চর, মুহুরী ড্যাম, মুক্তারিয়া চর, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, পতেঙ্গা সৈকত, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ; সিলেট বিভাগের আইলার বিল, ছাতিধরা বিল, হাইল হাওর বাইক্কা, হাকালুকি হাওর, পানা বিল, রোয়া বিল, শনির বিল ও টাঙ্গুয়ার হাওর। শীত এলেই এসব জলাশয়সহ বিভিন্ন হাওর, বাঁওড়, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানান রংবেরঙের নাম জানা, অজানা পাখির। পরিযায়ী এই পাখিদের আমরা আদর করে ‘অতিখি’ পাখি বলে থাকি। অথচ বেআইনি ক্ষুদ্র আনন্দের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয় এই ‘অতিথি পাখিগুলোর’! পরিযায়ী এই পাখিগুলো আমাদের বন্ধু, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব। তাই এ পাখিগুলোকে অচেনা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাদের বন্ধুসুলভ আচরণ করা দরকার। এই পাখিগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

শিকারি পাখি, আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া প্রভৃতিই পরিযায়ী পাখির প্রধান সংকট।  আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, খাবারের অনুপযোগী কিংবা মানুষের বসতি হয়েছে। একশ্রেণির লোভী, ব্যাধের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। জালের ফাঁদ পেতে, বিষটোপ এবং ছররা গুলি দিয়ে নির্বিচারে ও নির্মমভাবে এসব পাখি শিকার চলছে প্রতিনিয়ত। কেউ শখের বশে আবার কেউ বাজারে বিক্রির জন্য পরিযায়ী পাখিদের দিকে বন্দুকের নল উঁচিয়ে নিষ্ঠুর হাতে ট্রিগার টিপে এবং ফাঁদ পেতে পরিযায়ী পাখিদের জীবন হরণ করে চলেছে। পরিযায়ী পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে

কৃত্রিম সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পরিযায়ী পাখিরা বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে মারা যাচ্ছে। উপকূলে চিংড়ি চাষের ফলেও পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, পরিযায়ী (অতিথি পাখি) পাখি হত্যার দায়ে একজন অপরাধীকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদ- অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রয়েছে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি যদি পরিযায়ী পাখির মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করেন, দখলে রাখেন কিংবা ক্রয়-বিক্রয় করেন বা পরিবহন করেন, সে ক্ষেত্রে তার সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হওয়ার আইন প্রচলিত রয়েছে। পরিযায়ী পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁক গলিয়ে এক শ্রেণির পেশাদার এবং শৌখিন শিকারি কাজগুলো করে চলেছে।

পরিযায়ী পাখির বড় আশ্রয়স্থল হচ্ছে চট্টগ্রামের সোনাদিয়াসহ সেখানকার চরাঞ্চল, ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চল আর বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল অঞ্চল। এছাড়া সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ আর মৌলভীবাজারের বিভিন্ন জলাশয় আর হাওর-বাঁওড় পরিযায়ী পাখিদের বড় আশ্রয়স্থল। বাসস্থান সংকট, বিষটোপ ব্যবহার করে খাদ্যসংকট ও জীবন বিপন্ন করা, শিকার, পাচার ইত্যাদি কারণে আশঙ্কাজনকহারে আমাদের দেশে শীতে পাখি আসার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ক্যামেরার ক্লিক বা নীরবতা ভঙ্গ করলেও পাখিরা বিরক্তবোধ করে এবং অন্যত্র চলে যায়। আমরা বাঙালিরা জাহাঙ্গীরনগব বিশ^বিদ্যালয়, বাইক্যা বিল বা অন্যত্র পরিযায়ী পাখি দেখতে গেলেই পাখির খুব কাছে যেতে চাই। প্রয়োজনের ছবি তুলতে বেশি বেশি ক্যামেরায় ক্লিক করি। একই কারণে ভারতের পাখির অভয়াশ্রম গজলডোবাসহ পশ্চিমবঙ্গের অনেক পাখির আবাসস্থলে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ক্যামেরা বা শব্দযন্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন ছাড়া একেবারেই কমিয়ে আনতে হবে।

আমরা পাখির নাচ গান আর ওড়াউড়ি দেখব এবং উপভোগ করব। তবে সীমার মধ্যে, সতর্ক থেকে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। তবে আমরা সচেতন না হলে আইনে খুব একটা সফল পাওয়া যাবে না। প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করতে হবে। বাঙালির তো মনে থাকার কথা প্রাতঃস্মরণীয় সেই কবিতার কথাÑ ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ পরিযায়ী পাখিদের জন্য পরিবেশ ও আবাসস্থল রক্ষায় নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি আমাদের কর্তব্য হবে নিজ নিজ পরিম-লে আশপাশের মানুষদেরও পরিযায়ী পাখিদের বিষয়ে সচেতন করে তোলা। সবাইকে জাগিয়ে তোলা।

লেখক :  প্রাবন্ধিক ও কলামনিস্ট

উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত