আম্বানি ভাইদের গল্প|110453|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১৯:০৪
আম্বানি ভাইদের গল্প
অনলাইন ডেস্ক

আম্বানি ভাইদের গল্প

ভারতের অন্যতম ধনী পরিবার আম্বানি পরিবারের দুই ছেলে মুকেশ আর অনিলের নাম এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ধীরুভাই আম্বানির বড় ছেলে ৬১ বছর বয়সী মুকেশ সম্প্রতি চীনের শীর্ষ ধনী আলিবাবা গ্রুপের কর্ণধার জ্যাক মা-কে ছাড়িয়ে এশিয়ার শীর্ষ ধনী হয়েছেন। তার সম্পদের পাহাড় প্রতিনিয়ত ফুলেফেঁপে উঠলেও বছর দুয়েকের ছোটভাই অনিল আম্বানির তেমনটা হয়নি নানা কারণে। তারপরও তার সম্পদও নেহায়েত কম নয়।

অনিল একটু ম্লান হলেও বেশিরভাগ সময়ই ‘পেইজ থ্রি’র বড় অংশ জুড়ে থাকেন মুকেশ ও নীতা আম্বানি। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রধান মুকেশের জীবনসঙ্গী নীতা। এখন মুকেশ ও নীতা ভারতীয় মিডিয়ার স্পট লাইটে আছেন তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে। চলতি বছর বাগদান সম্পন্ন হয়েছে ছেলে আকাশ ও মেয়ে ইশার। তাদের বাগদান অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলিউডের বিভিন্ন তারকা ও ভারতের অভিজাত পরিবারের সদস্যরা। এখন সবার কৌতুহল বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে।

শুরুর কথা

শুরুটা করেছিলেন ধীরুভাই আম্বানি। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ইয়েমেনের একটি গ্যাস স্টেশনের ‘অ্যাটেনডেন্ট’ হিসেবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে যিনি একটা সময় গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়।

১৬ বছর আগে, ২০০২ সালে স্ট্রোকে মারা যান ধীরুভাই আম্বানি। তার আগে তিনি তার বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে কোনো উইল না করায় দুই ছেলের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়, যা দিন দিন প্রকাশ্য হতে শুরু করে। ধীরুভাই আম্বানির স্ত্রী কোকিলাবেন ২০০৫ সালে ছেলেদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করে দেন। মুকেশ পান তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিকেলস ইউনিট। আর অনিল পান বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আর্থিক সেবাদাতার মতো কিছু প্রতিষ্ঠান। টেলিকম ইউনিট নিয়ন্ত্রণের ভারও পান তিনি। সেসময় টেলিকম ইউনিট তরতরিয়ে এগিয়ে যায় মুকেশের নেতৃত্বে।

পরবর্তীতে দুই ভাইয়ের সম্পদ কীভাবে বেড়েছে সে বিষয়ে ১৯ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।

মুকেশ আম্বানি

ভারতের প্রথম সারির শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি। ২০১০ সালে মুকেশ কাজ শুরু করেন ফোরজি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক স্থাপনের। প্রকল্প শুরুর সাত বছরে আড়াই ট্রিলিয়নের বেশি রুপি বিনিয়োগ করেন তিনি। মাঝে তার হাত ধরে ২০১৬ সালে ভারতের বাজারে অভিষেক হয় মোবাইল ফোন কোম্পানি রিলায়েন্স জিও ইনফোকম লিমিটেডের। দেশটির টেলিযোগাযোগ খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে মুকেশের টেলিকম প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিও ইনফোকম। এই সুবাদেই তার পেট্রোকেমিক্যাল কনগ্লোমারেট রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ প্রবেশ করেছে ১০ হাজার কোটি ডলারের ক্লাবে।

ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর বেড়ে ঠেকে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ফলশ্রুতিতে আম্বানির সম্পদের পরিমাণ ছাড়ায় ৪ হাজার কোটি ডলার যা জ্যাক মা-এর সম্পদের চেয়ে বেশি এবং মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান স্টিভ বলমারের সমান।

‘দ্য বিলিয়নেয়ার রাজ’ বইয়ের লেখক ও সিঙ্গাপুরের জননীতি বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লি কুয়ান ইউ স্কুলের অধ্যাপক জেমস ক্রাবট্রির মতে, মুকেশের ওই নেটওয়ার্ক স্থাপনের পদক্ষেপ ছিল বড় ধরনের ‘বাজি’। বলা বাহুল্য, বাজিমাতও করেছেন মুকেশ।

২০১৬ সালে অভিষেকের পরপরই ভারতজুড়ে মোবাইল ফোন সেবায় হৈচৈ ফেলে দেয় জিও। সবচেয়ে সস্তায় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দুই বছরের কম সময়ে ২২ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক পায় মুকেশের এই কোম্পানি। সে সুবাদে জিও পরিণত হয় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে। তবে জ্বালানি খাতের বাইরে রিলায়েন্সের কৌশলগত বৈচিত্র্যই মুকেশের ব্যবসা সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ইন্ডিয়া ইনফোলাইন লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট সঞ্জীব ভাসিন। তার মতে, ১০ বছর পরের সময়টা সম্পর্কে আগেই ধারণা করেছিলেন মুকেশ। ফলে বিনিয়োগও করেন মোটা অঙ্কের অর্থ। আর তা আসে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া তেল ও পেট্রোকেমিকেল ব্যবসা থেকে, যার ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ করেন মুকেশ। বর্তমানে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মোট মুনাফার ৯০ শতাংশই আসে এ খাত থেকে।

অনিল আম্বানি

চলতি বছর খুবই বন্ধুর পথ পার করতে হচ্ছে অনিল আম্বানিকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে পড়েছেন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স বলছে, এরই মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার কমেছে অনিলের।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের শান্ত রাখতে বড় ভাইয়ের পথ অনুসরণ করে ব্যবসায় কোটি কোটি রুপি বিনিয়োগ করেন অনিল। কিন্তু তার কাছে মুকেশ আম্বানির মতো তেল পরিশোধন কেন্দ্রের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নেই। সার্বিক পরিস্থিতিতে তার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ছে ঋণের বোঝা। অধ্যাপক জেমস ক্রাবট্রি বলেন, ঋণে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুরে দাঁড়াতে বিকল্প থাকে শুধু সম্পদ বিক্রি ও নতুন বিনিয়োগ। চলতি বছরের এ পর্যন্ত অনিলের রিলায়েন্স নাভাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের শেয়ারদর কমেছে সবচেয়ে বেশি, ৭৬ শতাংশ। এই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও পড়েছে নানা জটিলতায়

অনিল আম্বানি নিয়ন্ত্রিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে নানা রকম পেমেন্ট পরিশোধে। মুম্বাইয়ের প্রথম মেট্রোলাইন নির্মাণ করেছে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। আগস্টে কোম্পানিটি বন্ড পেমেন্ট পরিশোধ করতে পারেনি। তবে আগামী বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে আগস্টে জানিয়েছেন অনিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স পাওয়ার লিমিটেডও অনিলের গ্রুপের অংশবিশেষ। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় রেকর্ড আইপিও বিক্রির পর থেকেই নিম্নমুখী এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর। গ্রুপের লাভজনক সেবাদাতা ফার্ম এখন রিলায়েন্স ক্যাপিটাল লিমিটেড। কোনোরকম নেতিবাচক বার্তা না থাকলেও এ কোম্পানির শেয়ারদর চলতি বছর পড়তির দিকে।

বর্তমানে অনিলের সাম্রাজ্যে বড় আকারের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে তারই অগ্রজ। জিও শুরুর পর ভারতের অন্য সব টেলিকম প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনিলের পোর্টফোলিওর গুরুত্বপূর্ণ অংশ রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্স লিমিটেডও (আরকম) সম্মুখীন হয় ‘মূল্যযুদ্ধের’। সেসময় জিও সস্তাদরে ফোরজি নেটওয়ার্ক সেবা দিতে শুরু করে। তখন গ্রাহকরা আসতে থাকেন জিওর নেটওয়ার্কেও আওতায়। এতে বিপাকে পড়ে সেবাদানকারী টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রাহক ধরে রাখতে তারা বাধ্য হয় সেবামূল্য কমাতে। এই মূল্যযুদ্ধ সামাল দিতে পারেনি আরকম। বাধ্য হয়ে গত মাসে আরকম ৩ হাজার কোটি রুপিতে বিক্রি করেছে ১ লাখ ৭৮ হাজার কিলোমিটারের ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক। ক্রেতা আর কেউ নয়, মুকেশের জিও। এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী পরিবারের এক নতুন অধ্যায়ের।

অনিলের অবস্থা টালমাটাল হলেও পুরোদমে এগিয়ে চলেছেন মুকেশ। নতুন নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর তিনি। গত জুলাইয়ে ই-কমার্স বিষয়ক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা দিয়েছেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একসঙ্গে কাজ করবে গ্রুপের টেলিকম ও রিটেইল ব্যবসা। মুকেশের এই ঘোষণা দাম বাড়তে সহায়তা করেছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদরের। নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ব্যবসার সাম্রাজ্য বাড়িয়ে চলেছেন মুকেশ। অনিলও চেষ্টায় ত্রুটি রাখছেন না।