গুজরাটে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য, ক্ষুব্ধ কৃষকরা|110476|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ অক্টোবর, ২০১৮ ২০:১৫
গুজরাটে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য, ক্ষুব্ধ কৃষকরা
অনলাইন ডেস্ক

গুজরাটে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য, ক্ষুব্ধ কৃষকরা

গুজরাটে নির্মিত হচ্ছে বল্লভভাই প্যাটেলের ১৮২ মিটার উচ্চতার ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত

গুজরাটে আগামী ৩১ অক্টোবর বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য উন্মোচন করতে যাচ্ছে ভারত সরকার। ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটি ভারতের স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের। এই ভাস্কর্য নির্মাণে খরচ হয়েছে ৪৩ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২ হাজার ৯৯০ কোটি রুপি)। এই অর্থের অর্ধেকের বেশি দিয়েছে গুজরাট রাজ্য সরকার। বাকি অর্থ এসেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাণ্ডার বা জনগণের অনুদান থেকে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ গুজরাটের কৃষকরা। কারণ গুজরাটে পানির ভীষণ অভাব। এখনো মৌলিক সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাজ্যের কৃষকরা।

৩৯ বছর বয়সী কৃষক বিজেন্দ্র ত্রিবেদীর রয়েছে তিন একর জমি। এই জমিতে তিনি মরিচ, ভুট্টা ও বাদাম চাষ করেন। জমিতে সেচ দেওয়ার পানি জোগাড়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। অন্যদের মতো তিনিও অপেক্ষায় থাকেন বর্ষাকালের। আবার কখনো প্রয়োজন মেটান পাম্পের মাধ্যমে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজরাটের গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন কাজে পানির চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ হয় পাম্পের পানি দিয়ে। অনেক সময় মৌসুমি বৃষ্টিপাত সময়মতো হয় না। এতে পানির অভাবে ফসলের ক্ষতি হলে কমে যায় কৃষকদের আয়। তাই সেচ কাজে নির্ভর করতে হয় পাম্পের পানির উপর।

এমন পরিস্থিতিতে ভাস্কর্য নির্মাণে এত অর্থ ব্যয়কে ভালো চোখে দেখছেন না ত্রিবেদী। তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল ভাস্কর্যের পরিবর্তে জেলার কৃষকদের সুবিধার্থে এই অর্থ ব্যয় করা। ত্রিবেদী জানান, অর্থ সঙ্কটে পড়ে ২০১৫ সালে গাড়িচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৮২ মিটার উচ্চতার বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য নির্মাণ প্রকল্পে। ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শেষ। এখন তিনি গাড়িচালক হিসেবে অন্য প্রকল্পে কাজ পাচ্ছেন। তবে উপার্জন বাড়লেও সরকারের ‘উদারতায়’ মোহিত নন তিনি।

বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্যটি পরিচিতি পাবে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ নামে। গুজরাটেই জন্মেছিলেন প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস নেতা বল্লভভাই প্যাটেল। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল। নীতি ও আদর্শে ছিলেন অটল। এ কারণে ‘লৌহ মানব’ নামে অ্যাখ্যায়িত হয়েছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল।

ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মও গুজরাটে। ২০১০ সালে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিলেন তিনি।

বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্যটি যে স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সে জায়গা থেকে ত্রিবেদীর গ্রাম নানা পিপালিয়ার দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই গ্রাম নিয়ে। বলা হয়, নর্মদা জেলার নানা পিপালিয়া গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র। বেশিরভাগ পরিবারের নিত্যসঙ্গী ক্ষুধা। সরকারের বিশ্বাস, বল্লভভাইয়ের স্মারক ভাস্কর্যটি দেখতে আসবে বছরে প্রায় ২৫ লাখ পর্যটক, যা জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পে জড়িত জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার বলেন, এই ভাস্কর্য ঘিরে এলাকাটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে; স্থানীয়দের কর্মসংস্থানও হবে।

তবে এ নিয়ে সন্দিহান স্থানীয়রা। লাখান নামে তাদের একজন ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘কৃষকদের সহায়তায় সরকার কেন কোনো প্রকল্প নেয় না? সেচের পানি নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল আমাদের। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।’

নানা পিপালিয়া পরিচিত ‘কমান্ড এরিয়া’ হিসেবে। এর অবস্থান ড্যামের কাছে। এই গ্রামের জমিগুলোর সেচ প্রকল্পের পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিবেদী জানিয়েছেন, তিনিসহ অন্য কৃষকরা পানি থেকে এখনো বঞ্চিত।

২০১১ সালের আদমশুমারির প্রসঙ্গ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নর্মদা জেলার প্রায় ৮৫ শতাংশ লোক কৃষিকাজে জড়িত। এসব কৃষকের গড়ে ২-৩ একর করে জমি আছে। আর ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেক জড়িত কৃষিকাজে। কিন্তু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান মাত্র ১৫ শতাংশ। ভারতে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। হাজারে ১০ জন কৃষককে বেগ পেতে হচ্ছে ব্যাংক ও মহাজনদের ঋণ পরিশোধে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে প্রতিবেশী রাজ্য মহারাষ্ট্রের কৃষকরা ঋণ মওকুফ ও শস্যের দাম বাড়ানোর দাবি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আর প্যাটেলের ভাস্কর্য প্রকল্পের কারণে বাধ্য হয়ে পানি চুরি করছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, ড্যামের পানি একটি খাল দিয়ে তাদের জমির পাশ দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের জমিতে পানি নেই। তাই অবৈধ হলেও তারা পানি চুরি করতে বাধ্য হচ্ছেন।