ভারত-মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে|110659|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ১৭:৫৭
ভারত-মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে
অনলাইন ডেস্ক

ভারত-মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে

ভারত স্পষ্টই মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশটি হিসাব-নিকেশ করছে আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতায়। ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা শক্তি দেশগুলো মিয়ানমারকে রীতিমত একঘরে করে ফেলেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে, শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপও করেছে। অন্যদিকে ভারত স্পষ্টই মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশটি হিসাব-নিকেশ করছে আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতায়। এশিয়া টাইমস জানাচ্ছে, ভারত-মিয়ানমারের সম্পর্ক এখন খুবই ঘনিষ্ঠ।

এটা স্পষ্ট যে, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের অমানবিক আচরণ ও মিডিয়া প্রপাগান্ডা পশ্চিমা বিশ্বে যে উদ্বেগের কারণ হয়েছে সেটি ভারতের কাছে অতটা গুরুত্ব পায়নি। বরঞ্চ সুদূরপ্রসারী নীতি নিয়েই এগোচ্ছে নয়াদিল্লি।

ভারতের এমন কৌশলের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশটির ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির বাস্তবায়নে অতিঅবশ্যকীয়ভাবে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী মিয়ানমারের পক্ষ থেকে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান বাজারে আধিপত্য বিস্তার করার পাশাপাশি নিজেকে আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে চীনের কৌশলগত প্রভাব খর্ব করাই হচ্ছে এই নীতির উদ্দেশ্য। এর জন্য মিয়ানমারকে পাশে লাগবে ভারতের।

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে নব্বই দশকের শুরুতে ‘লুক ইস্ট’ নামে এ নীতি গ্রহণ করেছিল ভারত। পরবর্তীতে নরসিমা রাও, অটল বিহারি বাজপেয়ি, মনমোহন সিং সরকারের হাত ধরেও এটি অব্যাহত থাকে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার একে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’-এ রূপ দিয়ে আরও গতিশীল করে।

ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিপুল পরিমাণ জ্বালানির চাহিদা দেখা দিয়েছে। এর জন্য মিয়ানমারের দিকে দৃষ্টি তাদের। ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য দৃঢ় আগ্রহ দেখিয়েছে মোদি সরকার। সেইসাথে আরও দ্রুত বাণিজ্য যোগাযোগ সৃষ্টিতে সীমান্তে সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

মে মাসে দ্বিপাক্ষিক একটি চুক্তি অনুসারে ইতোমধ্যে ভারতের মোরেহ ও মিয়ানমার তামু এলাকায় ‘এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্ট’ প্রস্তুত হয়ে গেছে। মিজোরাম ও চিন প্রদেশের মধ্যকার রিখাভদার-জোখাওতার সীমান্তেও একই ঘটনা ঘটেছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক কৌশলগত অবস্থান থেকে বিনিয়োগ অর্থনীতিতে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপে যেভাবে চীন প্রভাব বিস্তার করেছে, ভারত চায় না মিয়ানমারেও এটি ঘটুক। নেপিদাওকে পুরোপুরি বেইজিংয়ের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায় নয়াদিল্লি।

এর মধ্যে যুক্ত রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে নিরাপত্তা কৌশল। উত্তর-পূর্ব প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় আসাম, নাগা ও মনিপুরী জাতিগোষ্ঠীর বিচ্ছন্নতাবাদী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিরাপদ আস্তানাসমূহ ধ্বংস করতে মিয়ানমারের সহযোগিতা তাদের লাগবেই। এসব আস্তানা থেকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে আবার মিয়ানমারেই ঢুকে পড়ে এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যার কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে তাদেরকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না।

২০১৫ সালের জুনে বিদ্রোহীদের দমনে মিয়ানমারের ভেতরে কমান্ডো বাহিনী পাঠায় ভারত। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ঘটনায় অস্বীকৃতি জানায় এবং বরাবরের মতো এখনও বলে আসছে তাদের সীমানায় ভারতীয় বিদ্রোহীদের অবস্থান নেই।

সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যু নতুন করে ভারতীয় মিডিয়ার শিরোনামে ওঠে এসেছে। অক্টোবরে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং থু নয়াদিল্লিতে এক সফরে দেশটির স্বরাষ্ট্র সচিব রাজিব গাওবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই প্রতিবেশী দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনায় বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়।

আলোচনায় অনেক বিষয় থাকলেও ভারতীয় মিডিয়া শিরোনাম করে, উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে ভারত ও মিয়ানমার যৌথ অভিযান চালাবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, নিজেদের সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দমনে ভারত ও মিয়ানমার সম্মত হয়েছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম লাইভমিন্ট জানাচ্ছে, ভারত ও মিয়ানমার বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

জাতিগত বিদ্রোহীগোষ্ঠীগুলো নয়াদিল্লীর বশ্যতা অস্বীকার করে ১৯৬০ সাল থেকেই মিয়ানমারের ভেতর আশ্রয় নিচ্ছে। ভারতও দীর্ঘ দিন চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিদ্রোহীদের দমনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে যুক্ত করতে। দুই দেশের নেতৃত্বের আলোচনা যেভাবে সংবাদমাধ্যমে ওঠে এসেছে তাতে বুঝা যাচ্ছে, অবশেষে ভারতের সে চেষ্টা সফল হতে যাচ্ছে।

এর বাইরে মাদক ও প্রাণী পাচার রোধে ‘কমন বর্ডারে’ নিরাপত্তা বাড়ানো ও সহযোগিতার জন্য উভয় দেশ সম্মত হয়। তবে এটি নতুন কিছু নয়।

কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে দুই দেশের যৌথ অভিযানে মিয়ানমারের সংবিধানে বাধা রয়েছে। ২০০৮ সালের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কোন বিদেশি সেনা অভিযান চালাতে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি পাবে না।

ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের দূর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর পক্ষে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমান্ত থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে সিংকগালিং হাকামাতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি। যার কারণে তাদেরকে সহজে ধরা সম্ভব হয় না। দূর্গম পাহাড়ি এসব এলাকায় ট্র্যাকিং করে পৌঁছতেও অন্তত এক সপ্তাহ লেগে যায়। যার কারণে দুই দেশের সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানের বিষয়টি গুরুত্ব পেল অক্টোবরের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায়।

নাগা বিদ্রোহী নেতারা স্বর্ণখনিতে বিনিয়োগসহ মিয়ানমারের মূলভূমিতে বড় ধরনের কিছু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অর্থের যোগান বড় অংশ এখান থেকেই আসে বলা যায়। আসামি আর মনিপুরি বিদ্রোহীরা উত্তর মিয়ানমারের নিজেদের ঘাঁটি থেকে চীনের দক্ষিণ ইউনান প্রদেশের রুইলি পর্যন্ত বেশ মুক্তভাবেই কম-বেশি চলাফেরা করে।

এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুরোপুরি মনোযোগ এখন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমন ও নিয়ন্ত্রণে। রোহিঙ্গা ইস্যুর পর কাচিন ও শান প্রদেশের বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনের অভিযানেও সমালোচিত হয়েছে তারা। তবে স্থানীয় অর্থনীতিতে ভারতীয় বিদ্রোহীগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণের কারণে চিন্তিত নয় মিয়ানমার।

মিয়ানমারের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চীন থেকে এখনও বেশ পিছিয়ে ভারত। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চীন-মিয়ানমারের মধ্যকার বাণিজ্য ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের। পরের অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার।

ইতোমধ্যে ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিঙ্গের সাথে রুইলিসহ মিয়ানমার সীমান্তের অন্যান্য শহরের যোগাযোগের জন্য সড়ক নির্মাণ করেছে চীন। একইভাবে মুসে থেকে মান্দালয় পর্যন্ত দীর্ঘ রেলপথ নির্মাণে সম্মত হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা এ রেলপথের মাধ্যমে মূলত বঙ্গোপসাগরের সাথে মিয়ানমারের বন্দরনগরী কিউকপিউয়ের সাথে যোগাযোগ শক্তিশালী হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন কৌশলগতভাবে ভারত মহাসাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চায়।

চীনের আগ্রাসী বাণিজ্যে মিয়ানমারের সাথে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকাও রেহাই পাচ্ছে না বলা চলে। চীনের ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, পোশাক, ব্যাগ, গৃহস্থালি পণ্য এমনকি কম্পিউটার চিপ সামগ্রী পর্যন্ত মিয়ানমার ছেড়ে ভারতের সীমান্ত এলাকার বাজার দখল করে ফেলছে।

এ সবের তুলনায় মিয়ানমারের সাথে ভারতের বাণিজ্য মাত্র দুই বিলিয়ন ডলারের। বলা যায়, অপ্রতূল সড়ক যোগাযোগের কারণে ভারত পিছিয়ে। সেদিক দিয়ে ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে এগিয়ে আছে বেইজিং।

কিন্তু এ অবস্থার পরিবর্তন চান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমার সফর করেন তিনি। রাখাইনে মিয়ানমারের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই মোদির এ সফর আলোচিত হয় বেশ।

একই বছরের জুলাইয়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লেইংকে আট দিনের এক সফরে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয় ভারত। জেনারেল মিন অংয়ের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, চীনকে কৌশলগতভাবে পিছিয়ে ফেলতে মিয়ানমারের সাথে অস্ত্র বাণিজ্যের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অস্ত্র সরবরাহে এগিয়ে আছে চীন, সেই জায়গাটা দখল করাটাও ভারতের অন্যতম লক্ষ্য।

মোদির আমন্ত্রণে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি জানুয়ারিতে ভারতে ফিরতি সফর করেন। পশ্চিমা শক্তিকে এড়িয়ে চলতে একইভাবে চীন, জাপান ও আশিয়ানের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়ান তিনি। চীনের সাথে সু চির নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা ভারতের জন্য প্রতিবন্ধকতাই বলা যায়। এরপরও কৌশলগত গুরুত্বকে বিবেচনা রেখে মিয়ানমারের নেতৃত্বের সাথে কিভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মিয়ানমার সীমান্তে বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনে যৌথ অভিযান ভারতের দীর্ঘদিনের স্বপ্নই বলা চলে। সেই সঙ্গে সিনো-মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত দ্রুত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্দেশ্য অনেকটা স্পষ্ট।

রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার চেয়েও দেশটিতে চীনের আধিপত্য বিস্তার নিয়েই ভারত চিন্তিত অনেক। এই দৃশ্যপট প্রকাশ্যে আসায় সহজে বুঝা যায় যে, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে অধিক মনোযোগী ভারত।