মমতাজময় দ্বিতীয় রজনী|110660|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ১৮:১৭
লোকসংগীত উৎসব ২০১৮
মমতাজময় দ্বিতীয় রজনী
মাসিদ রণ

মমতাজময় দ্বিতীয় রজনী

লোকসংগীত উৎসবের দ্বিতীয় দিনে শেষ শিল্পী ছিলেন মমতাজ বেগম। ছবি: নূর

আসরের প্রথমদিন সেভাবে জমে না উঠলেও ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব ২০১৮’ এর দ্বিতীয় দিনে দর্শক উপস্থিতি মন্দ ছিল না। দেশি-বিদেশি পাঁচটি দল সংগীত পরিবেশন করেন। এরমধ্যে বেশিরভাগ পরিবেশনাই হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

প্রথম পরিবেশনা ছিল রাজশাহীর ব্যন্ডদল ‘স্বরব্যাঞ্জো’র। দলটি বেশিদিনের নয়। তবে এরই মধ্যে স্বকীয় সংগীতভাবনা দিয়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে- গান আর ব্যবসা একসঙ্গে হয় না। দলটির প্রধান ভোকালিস্টের সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমরা লোকসংগীত গাইতে জানি না, কারণ সেভাবে বেড়ে উঠিনি। তবে লোকসংগীত আমাদের মায়ের মতো। তার কিছু সুর ও বাণী আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। মা বলেই হয়ত লোকসংগীত সবাইকে ক্ষমা করে। আমরা ভুলভালই গাই। সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’

দলটি একে একে শোনায় সত্যজিৎ রায়ের লেখা ও সুরে অনুপ ঘোষালের গাওয়া ‘মহারাজা তোমারে সালাম, মোরা বাংলাদেশের থেকে এলাম’, কবিয়াল বিজয় সরকারের ‘জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটা কি’, সত্যজিৎ রায়ের লেখা ও সুরে অমর পালের গাওয়া ‘দেখ ভালো জনে রইল ভাঙা ঘরে, মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে’, মাদল ব্যান্ডের প্রতিবাদী গান ‘পাখির স্বভাব পাখির মতো উড়বে বলে’, ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালার গান ‘কইন্যা জুড়িল কান্দন’ ও দেলোয়ার আরজুদা সরফের লেখা ও প্লাবন কোরায়েশীর সুরে ফজলুর রহমান বাবুর জনপ্রিয় গান ‘ইন্দুবালা গো’। ভোকালের কণ্ঠের ধার ও সংগীতায়োজনের আধুনিকতা তরুণ দর্শকের প্রীতি লাভ করে।

এরপর মঞ্চে আসে বাহরাইনের ‘মাজাজ’। পাঁচ সদস্যের এই পুরুষ দলটির এক ঘণ্টার পরিবেশনায় সিংহভাগই ছিল যন্ত্রসংগীত। শুরুটা চমকপ্রদ হলেও পরে দর্শক একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হন। তবে দক্ষিণ ভারতের দল ‘দি রঘু দীক্ষিত প্রোজেক্ট’ শ্রোতাদের মেজাজ চাঙ্গা করে। তারা হিন্দি ও কর্ণাটক ভাষায় বেশকিছু গান শোনান। অসাধারণ ভোকাল কোয়ালিটি ও মিউজিকের রিদম পরিবেশনাকে অনবদ্য করে তোলে। দর্শককে কর্ণাটক ভাষা দেখানোর চেষ্টা বেশ উপভোগ্য ছিল। তবে পরিবেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক- বাংলাদেশের শ্রোতারা দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের অন্যরকম মহিমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলেন।

পরের পরিবেশনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডজয়ী দল ‘লস টেক্সমানিয়াক্স’। তিন প্রবীণের সঙ্গে এক তরুণ শিল্পীর মেলবন্ধনে দলটি খুবই শক্তিশালী। তারা যেন গিটারে ঝড় তোলেন। একনাগাড়ে ফোক গানের স্বাদ পাওয়া দর্শক এই প্রথম রক ও জ্যাজের স্বাদ পান। তারা যন্ত্রসংগীত ও গানের মাধ্যমে সময়টিকে উপভোগ্য করে তোলেন।

অনেকক্ষণ বিদেশি গান শুনতে শুনতে দর্শক যেন দেশি গানের জন্য মরিয়া হয়ে পড়েন। আর বাংলাদেশের মমতাজ বেগম ছিলেন দ্বিতীয় দিনের সর্বশেষ আকর্ষণ। মঞ্চে আসেন ঠিক রাত ১১টায়। তার কণ্ঠে বরাবরের মতোই খুঁজে পাওয়া গেল বাংলাদেশের শেকড় সংগীতের স্বাদ। গানের কথা, মাটির গন্ধমাখা গায়কী আর ফাঁকে ফাঁকে গানের তরজমা তার পরিবেশনাকে অনন্য করে তোলে। গেয়ে শোনান আত্মজৈবনিক গান ‘আমি জন্ম নিয়েই দেখতে পেলাম ঘরের কোণে একতারা, শিশুকালেই দেখতে পেলাম বাবার হাতে দোতরা’, কুটি মনসুরের লেখা ও সুরে মুর্শিদি গান ‘ওরে ও সোনার মুর্শিদ রে, কী দিয়ে ভজিব তোমারে’, সত্তা ছবির জনপ্রিয় গান ‘না জানি কোন অপরাধে দিলা এমন জীবন’, বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে ‘আমার সোনা বন্ধু রইল বৈদেশে দারুণ শীতে’ এবং সবশেষে দর্শক চাহিদায় ‘লোকাল বাস’ ও ‘পাঙ্খা পাঙ্খা’ গান দুটি। চোখের পলকেই যেন এক ঘন্টা পার হয়ে যায়। অসংখ্য অনুরোধের গান রেখেই তাকে মঞ্চ ছাড়তে হয় সময় স্বল্পতার জন্য। কথা দিয়ে যান সামনের বছর আবার এভাবেই মাতাবেন দর্শক হৃদয়।