‘যৌন নিপীড়নের’ শিকার ভারোত্তোলক মানসিক হাসপাতালে|110770|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ নভেম্বর, ২০১৮ ১৪:২১
‘যৌন নিপীড়নের’ শিকার ভারোত্তোলক মানসিক হাসপাতালে
সুদীপ্ত আনন্দ

‘যৌন নিপীড়নের’ শিকার ভারোত্তোলক মানসিক হাসপাতালে

মাত্র দুই বছর বয়সে বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বলতে গেলে পরগাছার মতোই বেড়ে ওঠা। সেই মেয়েটি ভাগ্যের খোঁজে বনে যান ভারোত্তোলক। বছর তিনেক আগে ঢাকায় পা রেখেছিলেন ১৪ বছরের এই কিশোরী। ২০১৫ সালে দশম জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে প্রতিভার স্বাক্ষরও রেখেছিলেন।

এই সাফল্যে সরকারি চাকরির স্বপ্নও বুনেছিলেন মনে মনে। কিন্তু সব স্বপ্ন চুরমার এক অপ্রত্যাশিত সকালে। যে সকালটা তার জীবনে এনে দিয়েছে অমানিশার অন্ধকার। মিথ্যা প্রলোভনে তাকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। মানসিক ভারসাম্য হারানো সম্ভাবনাময় এই ভারোত্তোলকের ঠিকানা এখন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বেড।

এই স্বপ্নবাজ মেয়েটির গল্পটা অন্যরকমও হতে পারতো। মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণিতে জাতীয় পর্যায়ে সেরা সাফল্য হয়তো তাকে দেখিয়েছিল দেশসেরা ভারোত্তোলক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মুখে আগুন দিয়েছেন বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনের স্টাফ সোহাগ আলী। মেয়েটির পরিবারের অভিযোগ, সোহাগের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে তাদের মেয়ে হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম্য। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কী ঘটেছিল মেয়েটির সঙ্গে তার আদ্যোপান্ত।

মেয়েটির মা গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুলে বললেন সব। ঘটনাটি ১৩ সেপ্টেম্বরের। সরকারি চাকরির স্বপ্নটা মেয়ের হয়ে মাও দেখতে শুরু করেছিলেন। তাইতো নিজের সংসার ছেড়ে শুধু মেয়েকে সঙ্গ দিতে কুমিল্লা থেকে ঢাকা চলে আসেন তিনি, “বর্তমান সংসারেও আমার তিনটা মেয়ে। আমার এই মেয়েটাকে দেখার কেউ নেই। তাই অনেক কষ্টে বর্তমান স্বামীকে রাজি করিয়ে চলে আসি ঢাকায় মেয়ের কাছে। ও আমারে সবসময় বলতো- এই খেলাটা খেললে ওর সরকারি চাকরি হবে। আমিও ভাবতাম- এটা হলে ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।”

“১৩ তারিখ ছিল তাদের ট্রায়াল। ভোর বেলা ঘুম থেকে ওঠে প্রতিদিনের মতো ও চলে যায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমে। এমনিতে এক-দেড় ঘণ্টা জিম করেই বাসায় ফিরতো ও। কিন্তু সেদিন ফিরতে ফিরতে ৩টা বেজে গেল। এসে কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়েছিল। আমি জিজ্ঞাস করতেই বলে- কিছু হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যায় আমারে বলে- মা, আমাকে ওষুধ এনে দাও, আমার হাত-পা ব্যথা করে: জ্বর, জ্বর লাগে।”

সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় নির্যাতিতার মা আরো বলেন, “ও আমার কাছে তখনো কিছুই বলেনি। শুধু বলছে, ও আর জিমে যাবে না। এই খেলা খেলবে না। আমি আর ওকে জোর করিনি। ভেবেছি- মেয়ে যেটা ভাল বুঝবে, সেটা করবে। কিন্তু ওই দিনের পর থেকেই ও চুপচাপ থাকে। কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না। খাবার রান্না করে পরের বাড়িতে কাজ করতে যাই। কিন্তু এসে দেখি কিছুই খায় না।”

তিনি বলেন, গেল মাসের শুরু থেকে তার মধ্যে পাগলামি দেখা দিতে শুরু করে। মেয়ে জানিয়েছিল, কথা না বললে সোহাগ নাকি ক্রীড়া পরিষদের ১৬তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল। উন্নতি ও মালেক নামে সোহাগের দুজন সহযোগীর কথাও মাকে বলেছিলেন।

সেই প্রসঙ্গ টেনে মা বলেন, “দুজন ওরে ভুলিয়ে ভালিয়ে ১৬ তলায় নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে ওরে জুস খাওয়ায় উন্নতি। এরপর মেয়ে আর কিছু গুছিয়ে বলতে পারে না। মেয়ে আমার ‘সোহাগ, সোহাগ’ বলতে থাকে। আর বলে, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাকে গুলিস্তান নিয়ে যাও। সোহাগ আমাকে বিয়া করার কথা বলছে। সাত লাখ টাকা চাইছে। আমার সব শেষ। এই বলে মেয়েটি কেমন উল্টাপাল্টা করতে থাকে।”

ওই ঘটনার ভয়াবহতা এরপর টের পেতে শুরু করে মেয়েটির পরিবার। মায়ের কথায়, “পরদিন আমি বাজারে যাই। এসে দেখি আমার ঘরের দরজার সামনে হাজার হাজার মানুষ। রাতের বেলা মেয়ে আমাকে যা বলেছে, তা আমি কারও কাছে বলিনি। কারে কী বলবো বুঝে উঠতে পারিনি। যাই হোক ঘরের পেছনে গিয়ে দেখি আমার মেয়ে খালি গায়ে ৭০ হাত পানিতে ঝাপ দিয়েছে। কেউ বাঁচাতে গেলে তাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও চেষ্টা করলাম, দেখি ও আমাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”

“তখন উপস্থিত কিছু পুরুষ মানুষের সহায়তায় ওকে জোর করে উঠিয়ে ঘরে আনি। এরপর থেকে মেয়ে আর শরীরে কাপড় রাখে না। কান্নাকাটি করে, সবাইরে খামচাতে যায়। এই অবস্থায় আমরা ওরে কুমিল্লা নিয়ে যাই। সেখানে ওঝা, কবিরাজের পেছনে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করেও কোনো লাভ হয়নি। পরে এক হুজুর আমাদের বলে ওকে ঢাকায় মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করতে।”

গত ২৩ অক্টোবর থেকে এই ভারোত্তলক ঢাকার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি। বৃহস্পতিবার তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তবে রোববার ফোনে খুব অসংলগ্ন কণ্ঠে নির্যাতিতা যা বললেন সেটা দাঁড়ায়- “হিন্দু একটা মাইয়া উন্নতি (ভারোত্তোলক) আর মালেক (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পিয়ন) আমারে সোহাগের কাছে নিয়া গেছিল সেদিন।”

আসলে কী ঘটেছে- রোববার ফেডারেশন গিয়ে দেখা মেলে অভিযুক্ত সোহাগ আলীর। মেয়েটির নাম বলতেই তাকে চেনেন না বলে অস্বীকার করে বসেন, “আমি এই নামে কোনো ভারোত্তোলককে চিনি না। এখানে কাজ করছি তিন বছর ধরে। এরকম কাউরে দেখি নাই।”

সোহাগ আরো বলেন, “কারো সঙ্গে আমি এরকম কিছু করিনি। আমার বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করছে।”

সোহাগ দাবি করেন তিনি তিন বছর ধরে ফেডারেশনে চাকরি করেন অফিস সহকারী হিসেবে। যদিও ফেডারেশনের সহ-সভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, কয়েক বছর আগে ভারোত্তোলক হতে এসে সংস্থায় অফিস সহকারীর কাজ পান সোহাগ। আর তার বিরুদ্ধে এরকম কোনো অভিযোগ কখনোই পাওয়া যায়নি।

আগে না পেলেও এদিনই যে অভিযোগটা আনুষ্ঠানিকভাবে ফেডারেশনে এসেছে তাও জানান মহিউদ্দিন, “মেয়ের মা ও মামা আজ (রোববার) ফেডারেশনে এসেছিল। তাদের কথা শুনেছি; এটা মনগড়া গল্প মনে হয়েছে। এর কোনো প্রমাণ কিন্তু এখনো পাইনি।”

“তাদের কথা অনুযায়ী ঘটনা আগের, তাহলে এতদিন পর আসছে কেন? যাই হোক, মেয়েটি আগে সুস্থ হয়ে উঠুক, চিকিৎসার জন্য ফেডারেশন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে” যোগ করেন তিনি।

এদিকে এদিনই বিষয়টি নজরে এসেছে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কর্নেল নজরুল ইসলামের। জানিয়েছেন বিষয়টি তারা গুরুত্ব সহকারে দেখছেন, “আমি মেয়েটির কথা শুনেছি। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আমরা একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি সহ-সভাপতি উইং কমান্ডার মহিউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে। কমিটিতে সূচীসহ (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ভারোত্তোলন কোচ শাহরিয়া সুলতানা সূচী) আরো একজন সদস্য থাকবেন। তারা পুরো ব্যাপারটা তদন্ত করবেন, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় আমরা তার ব্যবস্থা নেব। দেশের প্রচলিত আইনেও শাস্তি হতে পারে। তদন্তকালীন সময়ে সোহাগের চাকরি স্থগিত থাকবে।”