ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা কী চায়|111144|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২২:৩৬
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা কী চায়
অনলাইন ডেস্ক

ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা কী চায়

ছবি: ফেসবুক

ফ্রান্সে সম্প্রতি তোলপাড় তুলেছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ প্রতিবাদকারীরা। বেশ কয়েক দফার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশটির রাজধানী প্যারিস। কর আরোপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে নিম্ন ও মধ্যআয়ের জনগণ এই আন্দোলন শুরু করলেও, বর্তমানে এটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর মতে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর গত ১৮ মাসের মধ্যে মাখোঁর সরকারের বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে বড় ও ধারাবাহিক আন্দোলন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার জানিয়েছে, দেশজুড়ে ১৭০০ জনের বেশী বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা রায়ট পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বলে মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে। প্যারিস শহরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১২৬ জন বিক্ষোভকারী এবং তিনজন পুলিশ সহিংসতায় আহত হয়েছে।  
এএফপি জানায়, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমান করছে, মোট ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ এ পর্যন্ত বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

ক্ষোভকারীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক নয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ডাকা এ আন্দোলনে চিহ্নিত করার মতো নেতা নেই। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কেউ জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর দাবি করছেন, কেউ অন্যান্য আর্থিক বোঝা কমাতে বলছেন। কেউ মাখোঁর পদত্যাগ চাইছেন। কেউ পেনশন বাড়ানোর বা সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ানোর কথাও বলছেন।
পরিবেশের কথা চিন্তা করে নতুন বছরে জ্বালানি কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল মাখোঁর প্রশাসন৷ এছাড়া পুরনো গাড়ি থেকে বেশি ধোঁয়া বের হয় বলে সেগুলো ব্যবহারে জরিমানারও প্রস্তাব করা হয়েছিল৷ এর প্রতিবাদে গত অক্টোবর মাস থেকে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয়।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আয়োজিত প্রতিবাদ–বিক্ষোভে ট্যাক্সিচালকদের ব্যবহৃত হলুদ জ্যাকেট পরে প্রতিবাদকারীরা অংশ নেওয়ায় এই আন্দোলনের নাম দেওয়া হয় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। স্যোশাল নেটওয়ার্কে ডাকা কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে দেশজুড়ে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে৷

শুরুর দিকে জ্বালানি তেল ও পুরাতন গাড়ীর ওপর কর আরোপের প্রতিবাদে হলেও ক্রমে আন্দোলনটি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়। সর্বশেষ এই ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা ৪০টির বেশি দাবি নিয়ে মাখোঁবিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনেকে মাখোঁর বিরুদ্ধে ‘বড়লোকের প্রেসিডেন্ট’, ‘সাধারণ মানুষের চিন্তা নেই’ বলে বিক্ষোভ করছেন।

সর্বশেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ফ্রান্স জুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। রোববার দেশজুড়ে এক লাখ ছত্রিশ হাজার বিক্ষোভকারী ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে অংশ নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংস হয়ে ওঠা প্যারিস শহরে অংশ নেয় দশ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী।

বিক্ষোভকারীদের অনেককে দোকান ভাঙচুর, লুটপাট ও গাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করতে দেখা যায় বলে বিবিসি জানিয়েছে।
গত শনিবার আন্দোলনের মাত্রা চরমে পৌঁছে৷ প্যারিসে প্রায় ২০০টির মতো গাড়িতে আগুন দেয়া হয়৷ এছাড়া ‘আর্ক অফ ট্রায়াম্ফ' ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৷  এছাড়া ১৭ নভেম্বর পূরব সাভোয়ি এলাকায় আন্দোলন চলাকালে একজন আন্দোলনকারী মারা যান। বেশ কিছু পুলিশ অফিসারও সেদিন আহত হন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চ্যাম্পস-এলিসিস এলাকায় পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মাঝে বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যেখানে ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বিভিন্ন অভিজাত দোকানপাট লুটপাট হয় এবং ট্রাফিক লাইট উপড়ে ফেলা হয়।

এ পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী এডুয়া ফিলিপের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের আলোচনা হওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু বিক্ষোভকারীরা আলোচনায় বসতে রাজি হননি৷

বিক্ষোভ প্রশমন করতে মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে জ্বালানি করের প্রস্তাব ছয় মাস পিছিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ৷ তিনি কম মজুরির শ্রমিকদের বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দেন। সোমবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট মাখোঁ এই সিদ্ধান্ত নেন বলে ফ্রান্সের গণমাধ্যম জানিয়েছে৷ পুরনো গাড়ি ব্যবহারে যে জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটিও তিন মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার৷

১ জানুয়ারি থেকে জ্বালানির ওপর বর্ধিত কর কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ নভেম্বর গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতি শনিবার প্রতিবাদ করছে তারা। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এ ঘটনায় ২০০ গাড়ি পুড়েছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আন্দোলনকারীদের একদমই পছন্দ করতে পারছেন না। অতীতে তিনি ইউনিয়ন বিক্ষোভকারীদের ঠাট্টা করে "অলস" এবং "বিদ্রূপকারী" বলে মন্তব্য করেছিলেন। মাখোঁ এতদিন পর্যন্ত নিজেকে অনমনীয় ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী একজন অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন৷ কিন্তু, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের মুখোমুখি হয়ে অবশেষে তাকে নমনীয় হতে হলো।

মতামত জরিপে দেখা গেছে, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এ বিক্ষোভের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু এর কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকায় কার সঙ্গে কথা বললে আন্দোলন থামবে, তা খুঁজে পেতে দিশেহারা সরকার।

ফ্রান্সের পেট্রোলিয়াম ইন্ডাস্ট্রি ফেডারেশনের (ইউএফআইপি) তথ্য অনুসারে, এ বছর ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৬ শতাংশ। গত অক্টোবরে প্রতি লিটারে গড়ে ১ দশমিক ২৪ ইউরো (১ দশমিক ৪১ মার্কিন ডলার) থেকে ১ দশমিক ৪৮ ইউরো (১ দশমিক ৫৩ মার্কিন ডলার) দাম বেড়েছে।

এদিকে, গত ১ ডিসেম্বর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে প্রায় একই ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দাঙ্গা পুলিশ সেখানে জলকামান ব্যবহার করে পাথর নিক্ষেপকারী আন্দোলনকারীদের দমন করে। এর আগে তারা পুলিশের দুটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।