ঐক্যফ্রন্টের ৩৫ দফা ইশতেহার জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার|111761|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
ঐক্যফ্রন্টের ৩৫ দফা ইশতেহার জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঐক্যফ্রন্টের ৩৫ দফা ইশতেহার
জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা 
ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের কোনো বয়সসীমা না রাখা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে যাওয়া ও তদন্ত করে দুর্নীতির বিচার করার প্রতিশ্রুতি রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গতকাল সোমবার ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেনের উপস্থিতিতে ৩৫ দফা প্রতিশ্রুতি রেখে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।

বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে দুই মাস আগে গঠিত এই জোট বলছে, ২০১৪ সালে প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানা হারিয়েছিল। সেই মালিকানা ৩০ ডিসেম্বর ভোটে জিতে আবার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ইশতেহার ঘোষণার সময় কামাল হোসেন তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে এই প্রহসনটি হয়েছিল, সেটি সংবিধান-বর্ণিত জনগণের প্রত্যেকের ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই

নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এই রাষ্ট্রের মালিকানা হারিয়েছিল।’

গত ১০ বছর সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে দলটির সাবেক নেতা কামাল বলেন, ‘জনগণ যখন মালিক থাকে না, তখন রাষ্ট্রের মালিক হয়ে পড়ে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী, দেশি-বিদেশি নানা গোষ্ঠী। এর মাশুল দিতে হয়েছে এই দেশের মানুষকে। এটা আপনারাও হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেনের ডান দিকে ছিলেন বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বাঁ দিকে ছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না।

কামাল হোসেনের প্রারম্ভিক বক্তৃতার পর মান্না ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার পড়ে শোনান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন ফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

৩৫ দফায় যা আছে

# ‘সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন’ কমিশন : ‘মিথ্যা’ মামলা, গুম, খুন, ঘুষ-বাণিজ্য ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সমাধানে ‘সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন কমিশন’ গঠন করা হবে। ‘খোলা মনে’ আলোচনা করে ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সেখানে ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের’ অতীতের হয়রানিমূলক মামলার সুরাহা করা হবে।

# নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা : বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম বন্ধ করবে ঐক্যফ্রন্ট। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করবে। রিমান্ডের নামে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার বন্ধ করবে, ‘মিথ্যা’ মামলায় অভিযুক্তদের ক্ষতিপূরণ দেবে। মিথ্যা মামলায় ‘সহায়তাকারী’ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাবে, যৌতুক পুরোপুরি বন্ধ করবে।

# সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় : ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের ওপর যেকোনো হামলার বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে।

# যুদ্ধাপরাধের বিচার : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখবে ঐক্যফ্রন্ট।

# ক্ষমতার ভারসাম্য : সংসদে একটি উচ্চ কক্ষ সৃষ্টি করা হবে। সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে (ফ্লোর ক্রসিং) পরিবর্তন আনবে ঐক্যফ্রন্ট।

# প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ‘ভারসাম্য’ আনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকার সুযোগ তারা বন্ধ করবে। সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত করার সুযোগ তৈরি করবে।

# প্রাদেশিক সরকার : প্রাদেশিক সরকার প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা পরীক্ষার জন্য একটি সর্বদলীয় জাতীয় কমিশন গঠন করা হবে।

# বিচারপতি নিয়োগ কমিশন : বিচারপতিসহ সব নিয়োগের ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় সাংসদ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে স্বাধীন কমিশন গঠন করবে ঐক্যফ্রন্ট। সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে ‘উল্লেখযোগ্য’ সংখ্যক নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে।

# সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নারী : সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করতে চায় ঐক্যফ্রন্ট। তার বদলে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম ২০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হবে।

# দুর্নীতির তদন্ত : বর্তমান সরকারের সময়ে দুর্নীতির তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে এবং সংবিধান নির্দেশিত সব দায়িত্ব পালনে ন্যায়পালকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে।

# আর্থিক খাতে দুর্নীতির তদন্ত : আর্থিক খাতে ‘লুটপাটে’ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে ঐক্যফ্রন্ট। ব্যাংকগুলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ‘সর্বময় ক্ষমতা’ দেবে তারা।

# সরকারি চাকরির বয়সসীমা : পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে বয়সের কোনো সময়সীমা রাখবে না ঐক্যফ্রন্ট। অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ছাড়া সরকারি চাকরিতে আর কারও জন্য কোটা থাকবে না।

# বেকার ভাতা চালু : ৩০ বছরের বেশি বয়সি শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা চালু করতে একটি কমিশন গঠন করা হবে ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে।

ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডির আ স ম আবদুর রব, শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু, রেজা কিবরিয়া, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন।

এ ছাড়া বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক মোস্তাহিদুর রহমান, মোস্তফা জামান আব্বাসী, অধ্যাপক সদরুল আমিন, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, আবদুল হাই শিকদার উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুল আউয়াল মিন্টু, অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক সাহিদা রফিক, অধ্যাপক তাজমেরী এ ইসলাম, অধ্যাপক সুকোমল বড়–য়া, রুহুল আলম চৌধুরী, শাহজাদা মিয়া, এনামুল হক চৌধুরী, গণফোরামের জগলুল হায়দার আফ্রিক, আ ও ম শফিক উল্লাহ, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, জাহেদ উর রহমান, গণদলের গোলাম মওলা চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।