জাদুঘরের সেরা সংগ্রাহক একজন ওলি মিয়া|112184|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
জাদুঘরের সেরা সংগ্রাহক একজন ওলি মিয়া
তালহা জুবায়ের

জাদুঘরের সেরা সংগ্রাহক একজন ওলি মিয়া

নাম ওলি মিয়া। চার ছেলে ও চার মেয়ের বিরাট সংসার। একজন সংগ্রাহক তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন ইতিহাসের সব দুর্লভ সাক্ষ্য। সুলতানি, মুঘল, ব্রিটিশ নানা আমলের সোনা-রুপার অলংকার। মুদ্রা। রুপার কাঠের সিংহাসন। কত কিছু তার সংগ্রহে। কষ্টে উপার্জিত আয় দিয়ে সংগ্রহ করা সে সবই তিনি তুলে দিয়েছেন জাতীয় জাদুঘরে। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে ঢুকলেই দর্শকদের চোখ আটকে যায় যে সব জিনিসপত্রে, এ সবই ওলি মিয়ার সংগ্রহ। সুলতানি, মুঘল, ব্রিটিশ আমলসহ বিভিন্ন আমলের নারীদের সোনা-রুপার তৈরি গলার হার, হাতের চুড়ি, নাকের নথ, কানের দুল, কোমরের বিছা, নূপুর, মাথার টিকলি, নাকের নোলক, নাকপাশা, কানপাশা, চুড়ি, আংটি। পাশেই মুগ্ধ নকশায় তৈরি মুঘল আমলের কাঠ-রুপার সিংহাসন। সুলতানি, খিলজি, মুঘলÑ কত আমলের, কত ধরনের মুদ্রা সেখানে। বাদ যায়নি জালালউদ্দিন মোহাম্মদ শাহ, হায়দরাবাদ, মহিশুরের শাসনকর্তা টিপু সুলতানের আমলের মুদ্রাও। এমনকি ১১৬৩ সালের ঘুরি বংশের শাসনকর্তা মোহাম্মদ বিন সামের মুদ্রা যেমন রয়েছে, তেমনি শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাও। এমন অন্তত ৫০ জনেরও বেশি রাজা-বাদশাদের আমলের সংগ্রহ করা মুদ্রা রয়েছে এই জাদুঘরে।

ওলি মিয়ার এই সংগ্রহ শুরু হয়েছিল ৩৮ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে। স্বাধীনতার আগ থেকে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কে কালীবাড়ি এলাকায় স্বর্ণের দোকান আছে তার। নাম ‘ওলি মিয়া স্বর্ণালয়’। ব্যবসার কাজে তখন নিয়মিত ঢাকায় আসতেন। একদিন তাঁতিবাজারে এক দোকানে বসে গল্প করছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ডিএমডি মো. সালাউদ্দিন ও পুরোনো জিনিসপত্র সংগ্রাহক রবি মিয়ার সঙ্গে। গল্পে গল্পে তারা তার পুরোনো জিনিসপত্র সংগ্রহ করার শখের কথা জানতে পারলেন। তারা তাকে এসব সংগ্রহ জাতীয় জাদুঘরে জমা দিতে বললেন।

উদ্দীপ্ত ওলি মিয়া প্রথম জমা দিলেন মুঘল সম্রাট আলমগীরের আমলে ব্যবহৃত একটি রুপার সিংহাসন। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই একদিন এক কাস্টমার দোকানে সেটি বিক্রি করতে এলে চার হাজার টাকায় কিনে নেন তিনি। পরে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকার বিনিময়ে দিয়ে দেন জাদুঘরকে। উৎসাহ পেয়ে সেই থেকে আরো বেশি সংগ্রহ শুরু হয় তার। আরো বেশি ঘোরাঘুরি। 

কোথায় যাননি ওলি মিয়া! চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, শেরপুর, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, খুলনা, পটুয়াখালী, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও ঢাকা অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন। স্বর্ণকারের দোকান ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সময়ে সোনা-রুপার তৈরি জিনিসপত্র ও রাজা-বাদশাদের সোনা-রুপার মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন। আবার শখের কথা শুনে অনেকেই নিজে থেকেই এসব মুদ্রা দিয়ে এসেছেন তার দোকানে। এভাবেই চলে সংগ্রাহক ওলি মিয়ার সংগ্রহের কাজ।

ওলি মিয়া জানান, টানা ৩০ বছর জাতীয় জাদুঘরে দুই থেকে তিন হাজার ভরি সোনা-রুপার অলংকার, চার থেকে পাঁচ হাজার ধাতব মুদ্রা দিয়েছেন তিনি। আশির দশকে সোনা-রুপার ভরি খুব কম ছিল। সোনার ভরি ছিল ১শ’ থেকে দেড়শ’, রুপার ভরি ৪ থেকে ৫ টাকা। রুপার মুদ্রা কিনতে গড়ে খরচ হতো ১শ’ থেকে ১২০ টাকা, সোনার মুদ্রা দেড়শ’ থেকে ২শ’ টাকা। মাত্র ১৫-২০ টাকা লাভে তুলে দিতেন জাদুঘরে।

স্ত্রী কোহিনুর বললেন সংগ্রহের সময়কার গল্প। জাদুঘরের সংগ্রহ বাড়াতে পরিবার-পরিজন ছেড়ে ওলি মিয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটিয়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। একবার সংগ্রহের কাজে ময়মনসিংহে গিয়েছিলেন। সেখানে পুরোনো অনেক মুদ্রা সংগ্রহ করে শেরপুর যান। সেখান থেকে রুপার তৈরি কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহ করে ঢাকায় আসেন। সিএনজিতে সদরঘাটের দিকে রওনা দেন। কিছু দূর যাওয়ার পর ডাকাতের কবলে পড়েন। ওরা সবকিছু কেড়ে নেয়।

‘আরেকবার চট্টগ্রামে পুরোনো জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় হোটেলে উঠলেন। কিন্তু যে তাকে সংগ্রহের খবর দিয়েছিলেন, তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না। হতাশ হয়ে গেলেন। অনেক খোঁজ করে তার বাড়ি গিয়ে দেখলেন তিনি খুব অসুস্থ। তাকে নগদ টাকা দিয়ে খিলজি আমলের বেশকিছু মুদ্রা কিনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার সব দুঃখ মুছে গেল’Ñ বললেন কোহিনুর বেগম।

এভাবে দেশের নানা প্রান্তে ঘোরার ফলে স্বামীকে কাছে পাননি কোহিনূর বেগম। তারপরও স্বামী দেশের ভালোর জন্য কাজ করছেন বলে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। পাশাপাশি জাদুঘরে জিনিসপত্র বিক্রি করে কিছু লাভও হতো বলে সংসার ভালো চলত। ফলে স্ত্রীই স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের কাজ সামলাতেন। দূর-দূরান্তে ছুটে যেতে হতো বলে ওলি মিয়া অনেক সময় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খোঁজখবরও নিতে পারতেন না।

সংগ্রহের কাজে স্বামীকে উৎসাহ দিতেন কোহিনূর বেগম। বলতেন, ‘তোমার সংগ্রহ করা জিনিসপত্র দেখে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে, অজানাকে জানবে।’

ওলি মিয়াও আনন্দ পান এসব সংগ্রহ জাদুঘরে দিতে। বললেন, পরবর্তী প্রজন্মকে এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। জাদুঘরে আমার সংগ্রহ করা জিনিসপত্র দেখে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আনন্দ লাভ করে, সেটি আমার কাছে খুব গর্ব মনে হয়।

পুরো সংগ্রাহক জীবনে বিনামূল্যে, সামান্য লাভে জাদুঘরকে প্রায় দশ হাজারের বেশি সংগ্রহের জিনিস দান করেছেন। সর্বশেষ ২০০৫ সালে ১শরও বেশি পুরোনো আমলের রুপার মুদ্রা দিয়েছেন জাদুঘরে। মুদ্রাগুলো কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এরপর নানা অসুখ বিসুখ, ছেলের মৃত্যু তাকে আর এগোতে দেয়নি। তাছাড়াও ২০১০ সালে বাবুরহাট বাজারে তার জুয়েলার্সে ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা তার দোকানের ভেতর থেকে ১৮৮ ভরি স্বর্ণালংকার (৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা) ও নগদ প্রায় ৪ লাখ টাকা নিয়ে যায়। তারপরও সংগ্রাহকের এই জীবন তার খুব ভালো লাগে।

ওলি মিয়া বললেন, ‘পুরোনো আমলের জিনিস খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ। এজন্য মনে জোর লাগে। অনেক সময় দেখা গেছে মূল্যবান জিনিস আছে বলে আমাকে খবর দিয়েছে, গিয়ে দেখি মিথ্যা বলেছে। অনেক সময় পকেটে ঢাকা যাওয়ার ভাড়াও থাকত না। ধারদেনা করে যাওয়া লাগত। দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ আর কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই এই কাজে সফল হওয়া যায়।’

জাদুঘরে ওলি মিয়ার নামে কোনো কর্নার নেই। বাবার পথে নামা ছোট ছেলে আকাশও মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। ওলি মিয়াও অসুস্থ। হাঁটতেও বড় কষ্ট।

ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে তার শরীর শ্রান্ত। জীবন সায়াহ্নে এসে অর্থাভাবে ভুগছেন। গত বছর তাকে সম্মাননা দেওয়ার সময় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফজলুল লতিফ চৌধুরী আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা বললেও দেওয়া হয়নি। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাকে সম্মাননা জানানো ছাড়া এখন আর কোনো সহযোগিতা করে না। কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি আর্থিক সহায়তা কামনা করে বলেন, আমার শরীর খুব খারাপ। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা পাই না। আর্থিকভাবে আমাকে সহায়তা করলে খুব উপকার হতো।’