আবার উচ্চারিত হোক অমিতায়ু ‘জয় বাংলা’|112199|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
আবার উচ্চারিত হোক অমিতায়ু ‘জয় বাংলা’
আলী যাকের

আবার উচ্চারিত হোক অমিতায়ু ‘জয় বাংলা’

জয়, সত্যের জয়। জয়, দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ মানুষের জয়। “কী এক মধুর শব্দবন্ধ আমার অধরোষ্ঠে ধরিয়ে দিয়েছিলে তুমি। আমি প্রায় ভূতে পাওয়া মানুষের মতো সেই ’৬৯-এর কাক ভোরে কারফিউ, কামান উপেক্ষা করে আরো হাজারো কণ্ঠের সঙ্গে সমস্বরে গগনভেদী চিৎকারে বলে উঠেছিলাম জয় বাংলা!”

এই কথাগুলো নিয়ে একটা কবিতা লেখার বাসনা হয়েছিল। কিন্তু কাব্য রচনার সঙ্গে আমার লেখার অহিনকুল সম্পর্ক। অতএব, সুকান্তের ভাষায়, ‘কবিতা তোমায় আজ দিলাম ছুটি।’ ফিরে যাই গদ্যেই। পদ্যকে ছেড়ে। আমার ওপরের লেখা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, জয় বাংলা স্লোগানটি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল, আমাদের জানা মতে, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে। ঠিক কবে থেকে, স্মরণ নেই। তবে, যতদিন ধরে এই ভূখ-ের রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছি আমি, ওই শব্দনিচয় আমাকে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করেছে।

আজ ওই স্লোগানটি, আমার অতি প্রিয় হৃদয়লগ্ন স্লোগানটি, যাকে নির্বাসিত করার চেষ্টা করেছিল ’৭৫-এর পরে রাষ্ট্রদ্রোহী শক্তিগুলো, সেই স্লোগানটি পূর্ণ কণ্ঠে দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। বারবারই শুধু সেই কবিতার চরণটি মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘আসিতেছে শুভ দিন/দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ. . ’। সেই ঋণ শোধের যাত্রা শুরু করা আমাদের প্রজন্মের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমাদের এই দায়ভার গ্রহণ করেছে পরবর্তী প্রজন্ম। আমার সন্তানরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যেসব অমানুষ অবলীলায় আমার মানুষকে হত্যা করেছিল, আমার নারীদের সম্ভ্রমহানি করেছিল, আমাদের সমগ্র দেশকে ছারখার করে দিয়েছিল আগুনের লেলিহান শিখায়, তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়েছে এবং একে একে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।

এ কোনো নতুন বিষয় নয়। বিশ্বের যেখানেই এই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, যেমন ইউরোপ, কম্বোডিয়া কিংবা জাপান-সব দেশেই বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একে একে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। অ্যাডল্ফ আইকম্যানের কথা আমরা ভুলিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরীহ মানুষদের ত্রিশের দশকের শেষ এবং চল্লিশ দশকের শুরুতে নাৎসি কনসেনট্র্রেশন ক্যাম্পে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পেছনে যারা ছিল, তাদের মধ্যে আইকম্যান ছিল প্রধান। ১৯৬২-তে ইসরাইল সরকার তার বিচার করে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয় এবং অচিরেই তা কার্যকর করা হয়।

আমাদের মানুষের আশা ছিল যে, যাদের প্রিয়জনরা, নিকটজনরা নিহত হয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধের সময়, তাদেরও একই পরিণতি হবে। কিন্তু ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের গণমানুষকে সুবিচারের প্রক্রিয়া থেকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছিল ক্ষমতা দখলকারী দুর্বৃত্তরা। যা কিছু ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, তাকেই সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত করা হয়েছিল আমার পরমপ্রিয় এই দেশ থেকে। ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল আমাদের জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’, মুক্তির আদর্শ এবং চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল মূল্যবোধ। যখনই এসব কথা বলতে শুরু করতো মানুষ, তখনই অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হতো তাদের দৃষ্টি। প্রশ্ন তোলা হতো এই মৌল বিষয়গুলোর তুলনায় অনেক নগণ্য সব বিষয় নিয়ে।

আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্র যে স্লোগান, সেটার কথাই ধরা যাক। কে যেন সেদিন বলছিল যে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়, টেন্ডারবাজি করা হয়, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদেরকে হয়রানি করা হয় ইত্যাদি, প্রভৃতি। হতেই পারে। জয় বাংলার পক্ষের শক্তি যখন ক্ষমতায়, তখন সেই সুযোগ গ্রহণ করে দুর্বৃত্তরা অনেক অপকর্ম করতেই পারে। তাদেরকে প্রতিহত করার দায়িত্ব গণমানুষের এবং সরকারের।

একই সঙ্গে এ কথা ভুললে চলবে না যে, জয় বাংলার বিকল্প যে স্লোগান ‘জিন্দাবাদ’-এই স্লোগান দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল জাতির পিতাকে এবং তার পরিবারের সকল সদস্যকে, ঢাকার সর্বত্র তার ঘনিষ্ঠজনদের। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হত্যা করা হয়েছিল, ওই জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত চার মহান নেতাকে। হত্যা করা হয়েছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের। বস্তুতপক্ষে ঐ জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়েই বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আমূল পরিবর্তন করার চক্রান্ত করা হয়েছিল, যেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ পরিণত হয় এক মিনি পাকিস্তানে।

অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছিল এই দুরভিসন্ধিকারীরা। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, হয়তো তাদের চক্রান্তই শেষ পর্যন্ত সফল হবে। আমাদের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা রূপ পরিগ্রহ করবে এক ধর্মান্ধ, অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের। একসময় এই আশাবাদী আমিই ভেবেছিলাম হয়তো আমাদের তরুণ প্রজন্ম আপাতরম্যে বিসর্জন দেবে তাদের আদর্শ। তাদের কাছে গৌণ হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনা। কিন্তু বড় সুখ লাগছে এই ভেবে যে, আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

আমি যা আশা করেছি আমার সন্তানের কাছে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি পেয়েছি তার কাছ থেকে। আমি নিশ্চিত যে, এই প্রজন্ম আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী, জনগণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের পথে। তারা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে আমার সকল আশা।

তরুণ-প্রবীণ সকলে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে এই দেশকে সকল কালিমামুক্ত করার জন্য। সেখানেও কাজ করবে ওই মুক্তিযুদ্ধেরই চেতনা। যা কিছু সুকৃতি, তা-ই আমাদের মুক্তি যুদ্ধের চেতনা এবং তাতেই রয়েছে আমাদের উত্তরাধিকার। যা কিছু দুষ্কৃতি, তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে এদেশের মানুষ।

আবার গ্রাম-গঞ্জ-জনপদ উত্তাল হয়ে উঠবে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে। এগিয়ে যাবে এক আদর্শ বাংলাদেশ সৃষ্টির অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। আমাদের গণমানুষের নির্বাচিত সরকার জনসাধারণের সঙ্গেই কণ্ঠ মিলিয়ে বজ্রনির্ঘোষে স্লোগান দেবেন ‘জয় বাংলা’। বাংলার সবদিকে ছড়িয়ে পড়বে ওই স্লোগানের প্রতিধ্বনি। আমাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা পরপার থেকে অতি নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রামগ্ন হবেন আবার। মুখে তাদের বিজয়ের স্মিত হাসি।