ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা ভয় পান|112339|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা ভয় পান
নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা ভয় পান

বিশ্ববাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী দিনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটুকু?

বাংলাদেশের সম্ভাবনা বা চ্যালেঞ্জের বিষয় কিছুটা জটিল। স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের আপাত কিছু সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে ক্রেতারা এখন চীন থেকে অর্ডারগুলো অন্যান্য দেশে শিফট করতে চাচ্ছে। আমার অনুমান, আমাদের এখানেও সে ধরনের কিছু অর্ডার আসছে। সে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানিতে কিছুটা উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই সম্ভাবনাটা ততক্ষণই থাকবে যতক্ষণ বৈশ্বিক চাহিদার প্রবৃদ্ধি থাকবে। ২০১৯ সালের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে একপ্রকার মন্দাবস্থা হয়, তাহলে আপাতত এই অর্ডারগুলোকে মন্দাবস্থার মধ্যেও কতখানি বাড়িয়ে নিতে পারব, সেদিকে নজর রাখা দরকার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের আবার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিনটা সম্পর্কের আলোকে বাংলাদেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো কোন ফর্মে গিয়ে দাঁড়াবে- তা এখনো পরিষ্কার না। ফলে সেসব বিবেচনায় আমাদের আরো কিছুকাল অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি কিছু কিছু সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। চীন তার অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে কিছু নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। সেটাকে সে বলছে নতুন বাস্তবতা। চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেকে উন্নত অবস্থানে দেখতে চায়। সে জন্য সে স্বল্প আয়ের শিল্প বা পরিবেশ দূষণকারী শিল্প অন্য দেশে স্থানান্তর করতে বলেছে। এর মধ্যে অল্প আয়ের শিল্প-গার্মেন্টস, লেদার গুডস, টেক্সটাইল শিল্পকে অন্য দেশে স্থানান্তর করতে বলেছে। এতে বাংলাদেশের একটা বড় সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এটা আমরা কতটা গ্রহণ করতে পারব তা নির্ভর করবে চীন যে ধরনের পণ্যগুলো অন্য দেশে স্থানান্তর করতে চায়, সে ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা অবকাঠামো সৃষ্টি করতে পারে। আবার অবকাঠামো থাকলেও ওই বিনিয়োগ নেওয়ার মতো সক্ষমতাও বাংলাদেশের অর্জন করতে হবে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোন কোন ধরনের বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া দরকার?

ভাবা হচ্ছে আগামী বেশ কিছুকালেও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। সে আলোকে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে তা বিশ্লেষণ করা এবং তার বিকল্প ব্যবস্থা নিতে আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। কোন দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি আগামী বছরগুলোতে কেমন হবে, সে প্রাক্কলন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। সেভাবে আমাদের কৌশল নিতে হবে। তাতে মূল বাজারের পরিবর্তে বিকল্প বাজারগুলোকে বড়ভাবে ফোকাস করতে হবে।

এই দেশগুলোর ভেতরে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল। এই ধরনের দেশগুলোতে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধির কী সুযোগ আছে সেগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। এসব দেশে অপ্রচলিত পণ্যেরও চাহিদা রয়েছে।

সরকার এক্ষেত্রে প্রণোদনা বাড়াতে পারে। চীনসহ যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসতে চায়, তাদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে রপ্তানিও বাড়বে। মিরেরসরাইয়ে যে ইকোনমিক জোন হচ্ছে, সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

পোশাক মালিকরা বলছেন, এ খাত দিয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। কারণ এ খাতে মূল্য সংযোজনের সুযোগ কম। ৪৭ বছরেও বাংলাদেশ তার রপ্তানিপণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারেনি। পণ্য বহুমুখীকরণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ কী কী হতে পারে?

গার্মেন্টের বাইরে অন্য খাত বিকশিত হয়নি। তবে গার্মেন্টের ভেতরে পরিবর্তন এসেছে। ওভেনেও হাইভ্যালু আইটেম হচ্ছে। নিটেও বহুমুখীকরণ হচ্ছে। কটন বেজ্ড পণ্যের পাশাপাশি নন-কটন বেজ্ড পণ্যের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেমন পলেস্টার সিনথেটিক ম্যাগনেট ফাইবার। এই পণ্যগুলোর বড় বাজার রয়েছে।

জাপান, রাশিয়া এগুলো আমদানি করে। চীনও আগামীতে আমদানি করবে। সে সুযোগ আমাদের রয়েছে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের এ ধরনের সুযোগ নেওয়ার আগ্রহ কম। তাই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দিতে হবে।

কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না কেন?
 
আমাদের এখানো কথাবার্তায় রয়েছে যে, বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত। বাস্তবে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক অবকাঠামো, সহায়ক নীতি কাঠামো এবং তাদের জন্য যৌথ উদ্যোগ কাজ করা প্রয়োজন। তাহলে গার্মেন্টের বৈচিত্র্যকরণে তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। এটা না হলে প্রবৃদ্ধি ধীরগতিতে হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের জন্য ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে হাইটেক মেশিনারিজ ব্যবহার দরকার।

আন্তঃবহুমুখীকরণের জন্য আমাদের উচিত হবে গার্মেন্টের মতো ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করতে পারবে এমন ৫-১০টি খাত চিহ্নিত করা। খাতগুলো হলো- চামড়া, আইসিটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিকস, প্লাস্টিক, এমনকি বিভিন্ন ধরনের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং। তবে প্রত্যেকটি সম্ভাবনাময় খাতের চ্যালেঞ্জগুলো ভিন্ন।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে তাদের জায়গাও ভিন্ন ভিন্ন। উদাহরণ হলো চামড়া খাত। বাংলাদেশে উন্নত পরিবেশে মানসম্মত চামড়া প্রস্তুত করা হয়। এই ম্যাসেজ বহির্বিশ্বে পৌঁছালে এটা বড় সম্ভাবনা হবে।

সাত ট্রিলিয়ন ডলারের ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্যবাজারে প্রবেশ করতে হলে আগামী দিনে সরকারের কোন ধরনের নীতি সহায়তা দরকার?

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যে ব্র্যান্ড ইমেজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ কমদামি পণ্য করতে পারে, গার্মেন্ট করতে পারে। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের দেশ, সে ইমেজ নেই। এটা ধীরে ধীরে তৈরি করা। এ জন্য দেশীয় উদ্যোক্তারা সীমিত পরিসরে যা উৎপাদন করছেন, তা বিশ্ববাজারে তুলে ধরা। এ সমস্ত পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে যাদের সুনাম রয়েছে তাদের পর্যাপ্ত প্রণোদনা দিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। তাদের কাছ থেকে শিখে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাও এগিয়ে যেতে পারবেন। যেহেতু এই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তা বেশি চিন্তা করেন, তাই বাংলাদেশের উচিত হবে কোয়ালিটি, ব্র্যান্ড, স্পেসিফিকেশন এবং স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করা।

আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটা দেখছি। হোন্ডা বাংলাদেশে ইঞ্জিন প্ল্যান করতে যাচ্ছে। এসব ব্র্যান্ডগুলো আসা শুরু হলে অন্যরাও এ সুযোগ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ উৎসাহ দেখায়। সুতরাং এখানে বিডা, বেপজা, বেজার উচিত হবে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

ব্যবসায় খরচ ও সময় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ কার্যকর করতে কী করণীয়?

বিনিয়োগের প্রক্রিয়াগুলো সহজ করার উদ্যোগ বিডা নিয়েছে। কিন্তু কাজগুলো দেখা বিডার দায়িত্ব নয়, দেখার কাজ পিডিবি, তিতাস, পেট্রোবাংলার। এদের সঙ্গে বিডার সমন্বয়হীনতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিডার কার্যকর সহযোগিতার সম্পর্ক দরকার। সম্প্রতি বিডা এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করার চুক্তি করেছে।

মোট কথা বিডার আইনি কাঠামোটা যেন শুধু বিডারই পালনের বাধ্যবাধকতা না থাকে, এ সার্ভিসগুলো দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও যেন সমপরিমাণ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে তাও দেখতে হবে। তাহলেই বিডার উদ্যোগগুলো সফল হবে।

শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র স্থাপনে শিক্ষাব্যবস্থায় কোন ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার?

প্রচুর ¯œাতকধারী বের হচ্ছে। শিক্ষিত বেকারও বাড়ছে। সরকারি তথ্যমতেই শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বের হার বাড়ে। অর্থাৎ যে কম পড়ে, তাদের মধ্যে বেকার কম। উচ্চশিক্ষিতরা বেশি বেকার। আবার এটাও শোনা যায় বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক বিদেশি কাজ করে।

বাংলাদেশে গুণগত শিক্ষার অভাবে অনেকে চাকরি পাচ্ছে না, আবার বিদেশ থেকে কারখানাগুলোতে লোক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যে শিক্ষা দরকার, বাংলাদেশে তা নেই। খুবই দুঃখজনক যে, এখানে প্রচুব বিবিএ, এমবিএ তৈরি হচ্ছে যাদের শিল্পে কোনো প্রয়োজন নেই। এই জ্ঞানের এবং এই মানের ডিগ্রিধারীর শিল্পে প্রয়োজন নেই। শিল্পের জন্য কোন ধরনের শিক্ষিত লোক দরকার, তা জানতে হবে। সেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাকাডেমিক কারিকুলাম সাজাতে হবে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে চিন্তা করলে একজন উদ্যোক্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাধীন পরিচালক বা অন্য কোনো পদে রেখে তার মতামতের ভিত্তিতে কারিকুলাম সাজানো যেতে পারে। প্রাথমিক স্তরেও অঙ্ক, ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় জোর দিতে হবে।

বংলাদেশে বিদ্যমান ব্যবসা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৫ সালের বাংলাদেশ কেমন হবে? তার চেয়েও শিল্পোন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে আপনার পরামর্শ কী?

আমরা অর্থনৈতিক বা সার্ভিস সেক্টরে যে প্রবৃদ্ধি দেখছি, এতে কতিপয় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজ ডোমিনেটিং ক্যারেকটার প্লে করছে। এই যে বড় বড় কোম্পানিগুলো এগিয়ে যাচ্ছে, এটা ততক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক, যতক্ষণ তারা ক্ষুদ্র বা মাঝারি কোম্পানি বিকাশের পথে অন্তরায় না হবে।

আমরা আশঙ্কা করছি এই বড় গ্রুপগুলো ছোট ছোট গ্রুপের বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। তাই বাংলাদেশে এমন এক ধরনের ইনক্লুসিভ মডেল দরকার, যেখানে বড় উদ্যোক্তা মূল পণ্য উৎপাদন করে বিপণন করবেন আর কাঁচামাল উৎপাদন করবেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। আমাদের দেশে সবই বড় উদ্যোক্তারা করে। এটা মার্কেট প্রিন্সিপালের বিপরীত ধারা। প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ছোট-বড় এবং দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা কীভাবে যৌথভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সমভাবে কাজের সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এটি করা গেলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে অনেক বেশি উদ্যোক্তা, অনেক ডাইভারসিফায়েড ইন্ট্রারপ্রিনিয়র দেখতে পাব।

বিনিয়োগ বৃদ্ধির স্বার্থে নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

যার বিজনেস লাইসেন্স পাওয়ার কথা, যার গ্যাস, পানি বা বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা- তিনি যেন বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য মৌলিক বিষয়গুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে সমভাবে বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ইকোনমিক জোনগুলোকে পণ্যভিত্তিক ক্লাস্টার করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে কম সুদে ঋণ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে।