সবুজ স্থাপত্য সম্মেলনের কথা|112541|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
সবুজ স্থাপত্য সম্মেলনের কথা
সজল চৌধুরী

সবুজ স্থাপত্য সম্মেলনের কথা

মনে পড়ে, ২০০৯ সালের অক্টোবর মাস। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে জন্ম হয় ‘সবুজ স্থাপত্য’ নামের একটি গবেষণা সেলের। যেখানে স্থপতি এবং শিক্ষক শামীম আরা হাসান মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলেন। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ থেকে সদ্য পাস করার পরপরই আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ‘গ্রিন আর্কিটেকচার সেল’-এ প্রথম গবেষক স্থপতি হিসেবে যোগ দেওয়ার এবং সেই সঙ্গে প্রথিতযশা স্থপতি এবং গবেষক ড. সাব্বির আহমেদ এবং ড. জেবুননেসা আহমেদের তত্ত্বাবধানে সবুজ স্থাপত্য নিয়ে কাজ করার।

অল্প দিনের মধ্যেই আমরা বাংলাদেশের জন্য সবুজ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিবেশগত নকশা কেমন হবে সেটির একটি নীতিমালা প্রাথমিকভাবে প্রণয়ন করি। তাছাড়া বাংলাদেশ সবুজ কারখানা তৈরির নীতিমালা কী হবে সেটির একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়। চলতে থাকে সবুজ স্থাপত্যের ওপর গবেষণা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ গার্মেন্টস কর্র্তৃপক্ষ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং জার্মান টেকনিক্যাল অথরিটি (জিআইজেড) বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছিল বিভিন্ন সময় ধরে। জানা মতে তখন এটিই ছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের সবুজ স্থাপত্যের প্রথম সূতিকাগার।

ছোট্ট একটি কক্ষ অথচ হাজারো স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ ও আমাদের প্রয়াস। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নতুন একটি গাঠনিক রূপ পায় ‘গ্রিন আর্কিটেকচার সেল’ ড. আশিক জোয়ার্দারের হাত ধরেÑ যা এখনো চলমান। প্রতি মাসে শুরু হয় সবুজ স্থাপত্যের ওপর কর্মশালা যেখানে প্রাথমিকভাবে সবুজ স্থাপত্যের অপরিহার্য বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য সবুজ স্থাপত্যে কিছু সংখ্যক ‘প্রফেসনাল বডি’ তৈরি করাÑ যারা দেশ গঠনে কম শক্তি ব্যবহারসম্পন্ন স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারবেন। অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘গ্রিন আর্কিটেকচার ২০১৭ ’। বাড়তে থাকে কর্মকা- আর সেই সঙ্গে তারুণ্যের জোয়ার ও উৎসাহ। অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন নতুন প্রচেষ্টায়।

বর্তমানে দেশে অনেক ক্ষেত্রেই স্থাপনার নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় সবুজ নীতিমালাকে। এর প্রায় এক বছর পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের ‘গ্রিন আর্কিটেকচার সেল’-এর আয়োজনে আবারো অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কনফারেন্স অন গ্রিন আর্কিটেকচার ২০১৮, যা ছিল টেকসই উন্নয়নে সবুজ স্থাপত্যের ভূমিকার ওপর। ১৩-১৪ জুলাই ঢাকায় অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন দেশি-বিদেশি স্থপতিরা, প্রকৌশলী এবং গবেষক। প্রদর্শন করা হয়েছে স্থাপনা তৈরির টেকসই বিভিন্ন উপকরণের। সবুজ স্থাপত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা আর পর্যালোচনার মাধ্যমে শেষ হয় এই কনফারেন্স। যেখানে পেরুর স্থপতি লুইস লংগি ট্রাভারসো, বাংলাদেশের স্বনামধন্য স্থপতি সামসুল ওয়ারেস, স্কটল্যান্ডের স্থপতি এবং গবেষক ড. ক্রিসচিয়ান সুয়াও এবং ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান টাই লি সিয়াং প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে তারা তাদের উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের টেকসই স্থাপত্যের ভূমিকা এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিশ্বের স্থাপত্যের রূপরেখা নিয়ে আশার কথা বলেন। দেশি-বিদেশি সব মিলিয়ে প্রায় বত্রিশটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। আশার কথা এই যে, বেশির ভাগ গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তরুণ গবেষক, যারা বর্তমানে তথাকথিত স্থাপত্যকে পরিহার করে নতুন এক সবুজ স্থাপত্যের কথা ভাবছেন আগামীর বাংলাদেশের জন্য। গবেষণার মধ্যে স্থান পেয়েছে কম শক্তিসম্পন্ন আবাসন এবং কলকারখানার নকশা প্রণয়ন, কীভাবে আমাদের পরে থাকা অব্যবহৃত জায়গাগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহার করা যায়, সবুজ নগর পরিকল্পনার আনুষঙ্গিক বিষয়াদি, দিনের আলোর পর্যাপ্ত ব্যবহার, আবাসনের      অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়াদি।

প্রকৃতিকে ব্যবহার করে যে স্থাপত্য সেটিই হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, এটিই যেন বারেবারে বলা হচ্ছিল। সবুজ স্থাপত্য সম্পর্কে আমাদের মধ্যে প্রায়শই অনেক ভুল ধারণা থাকে, ধোঁয়াশা থাকে। স্থাপনাতে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে যে কোনো উপায়ে, কিংবা সবুজ দেখাতে হবে এমনকি রং করে হলেও, তাহলেই সেটি ‘সবুজ স্থাপনা’। এমনটি চলে আসছে বহুদিন ধরে। আর এসব ধারণাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মোটা টাকার ব্যবসা করে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

এক্ষেত্রে একটি সবুজ স্থাপনার প্রকৃত স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত সেটি নির্ধারণে এ ধরনের সম্মেলন অবশ্যই বিশেষ ভূমিকা পালন করবে আমাদের দেশের নির্মাণ জগতে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কর্র্তৃপক্ষ সঠিক ভাবে শুনছে কি? তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তাই বা কী? কারণ সবুজ স্থাপত্য নিশ্চিতকল্পে চাই দেশের স্থাপনা নির্মাণের জন্য বিশেষ নীতিমালা বিশেষ করে আমাদের বড় বড় শহরগুলোতে। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন স্থাপনার জন্য সেই নীতিমালাকে অবশ্যই সময়োপযোগী হতে হবে এবং সেটি হতে হবে প্রকৃত গবেষণার ভিত্তিতে শুধুমাত্র আমাদের জলবায়ুর কথা চিন্তা করে, কোনো বিদেশি অনুকরণে নয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নীতিমালা হলেও এক ধরনের অস্বচ্ছতা থেকে যায় নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। কিংবা সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষজন নেই, যে যার মতো সুযোগ ও ক্ষমতা বুঝে কিছু একটা করে যাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য বিশেষ নিয়মনীতি মানেই সেখানে সাধারণ মানুষকে আরো ভোগান্তির স্বীকার হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তবে আশার কথা, যদি বর্তমান সরকার ব্যবস্থা সবুজ একটি বাংলাদেশের লক্ষ্যে সঠিক জায়গায় সঠিক দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে তাহলে অচিরেই এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় আমাদের নির্মাণ সেক্টরে।

এক্ষেত্রে দেশের প্রথিতযশা প্রকৌশলী, স্থপতি এবং পরিকল্পনাবিদ এগিয়ে এলে সুফল খুব দ্রুত পাওয়া সম্ভব। কারণ বর্তমানে এই দেশে সবুজ স্থাপনা নির্মাণে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন অনেকেই আছেন, যাদের কাজে লাগাতে হবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এবং এক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ-সিটি করপোরেশনকে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে। নইলে, সবুজ স্থাপত্যের এই সম্মেলন থেকে সত্যিই আমাদের প্রাপ্তির কোনো কিছুই থাকবে না, সম্মেলনগুলো হয়ে থাকবে শুধুই কাগজে কলমে।