কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ|112761|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
চীনের সঙ্গে এফটিএ
কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ
রায়ান বণিক

কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ

২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ই এফটিএ সইয়ের জন্য দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয় -সংগৃহীত

একদিকে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের ক্ষতির আশঙ্কা। সঙ্গে রয়েছে আমদানি পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ভয়। এসব সম্ভাবনা ও আতঙ্ক মাথায় নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির সস্তা পণ্যের ঢলে বাংলাদেশি শিল্প খাত রক্ষার চিন্তা ভাবিয়ে তুলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।

এ অবস্থায় চীনের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এগুচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, এফটিএ স্বাক্ষর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

চীনের কর্মকর্তারা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করে বাংলাদেশকে পাঠাবে। আর বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে চীনকে দেবে। উভয় প্রতিবেদন দুই দেশ পর্যালোচনা করে সম্মতি দেওয়ার পরই এ চুক্তি সই হবে।

বাংলাদেশ অংশের দায়িত্ব বা কাজ শুরু করতে কমিটির সদস্যদের নিয়ে গতকাল বৈঠক করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) মো. শফিকুল ইসলাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তকে বলেন, চীনের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের জন্য যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বাংলাদেশ অংশের কাজ সম্পাদনের জন্য বৈঠক করা হয়েছে। আগামী এপ্রিল-মে মাসে ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী বৈঠকে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।

চীনের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, চীন থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। যা থেকে বিপুল পরিমাণ শুল্ককর পায় সরকার। এফটিএ হলে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার, চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের দাম অনেক কম হওয়ায় বাংলাদেশে ওই ধরনের পণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যদিকে সম্ভাবনার হাতছানিও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। কারণ, চীনে উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দেশটি অন্য দেশে বিনিয়োগ ও কারখানা স্থাপন করছে।

বাংলাদেশের চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ সম্ভাবনা আছে। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে উৎপাদিত পণ্য চীনে নিয়ে নিজের দেশের বাজারের চাহিদা মেটানোর সুযোগও তৈরি হবে। এতে বাংলাদেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন চীনের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের প্রভাব নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে কেবল বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরেছে কমিশন।

বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে ওই প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। গতকালের  বৈঠকে ওই প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ই এফটিএ সইয়ের জন্য দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। পরে উভয় দেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনসহ ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার তথ্য আদান-প্রদান করেছে।

গত ২০-২১ জুন চীনের রাজধানী পেইচিংয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক হয়েছে।

সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয় এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সমীক্ষা সম্পন্ন করে চীনকে দেবে। আর চীন দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য, সেবা বাণিজ্য নিয়ে সমীক্ষা প্রতিবেদন বাংলাদেশকে দেবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ এখনও কোনো দেশের সঙ্গে এফটিএ করেনি।

এ অবস্থায় চীনের মতো একটি বড় রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে এফটিএ করার কৌশল কী হবে, তা নিয়েই চিন্তিত মন্ত্রণালয়। কারণ, চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে।

শুল্কারোপ থাকার পরও অনেক ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে চীনা পণ্যই সস্তা। এ অবস্থায় দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা করে এফটিএ স্বাক্ষরের উপায় বের করা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করতো।

পরের বছর থেকে ভারতকে টপকে বাংলাদেশে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠে চীন।

২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ৯৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এটি ওই বছর বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮ হাজার কোটি টাকারও কম।

তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে চীন বিনিয়োগে উৎসাহী। সফল দরকষাকষির মাধ্যমে এফটিএ করা গেলে উভয় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে তা ভূমিকা রাখবে। কিন্তু রাজস্ব স্পর্শকাতরা, স্থানীয় শিল্প সংরক্ষণ, বাংলাদেশে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সর্বাত্মক সতর্কতার সঙ্গে এটি করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ এর সুফল পাবে।