উঠে দেখি ওজন ১৭ পাউন্ডই কমে গেছে!|113588|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
উঠে দেখি ওজন ১৭ পাউন্ডই কমে গেছে!

উঠে দেখি ওজন ১৭ পাউন্ডই কমে গেছে!

বাংলাদেশের সাঁতারের ইতিহাস লিখতে গেলে অন্যতম চরিত্র হিসেবে আসবে আপনার নাম। প্রায় সবকটি রেকর্ডই নিজের করে নিয়েছিলেন। সেসব কথাই শুনতে চাই আজ।

মোশাররফ হোসেন : খেলা ছেড়েছি ৩২ বছর হতে চলল। অথচ সোনালি ওই দিনগুলো একটিবারের জন্যও ভুলতে পারি না। সাঁতারের শুরু দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়। বিক্রমপুরের ছেলে আমি। তখন আমাদের এলাকায় একটা সাঁতার প্রতিযোগিতা হতো। দেড় মাইল সাঁতার। গ্রামের ছেলে বলেই সাঁতারটা শিখেছিলাম একেবারে ছোটবেলায়। আমার গৃহশিক্ষক আবদুস সোবহান সিকদার একদিন আমাকে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বললেন। নাম নিবন্ধন করে পাশের পুকুরে তার অধীনে শুরু হলো অনুশীলন। ওই প্রতিযোগিতায় অনেক সিনিয়রদের পেছনে ফেলে প্রথম হই। এরপর থেকেই সাঁতারের প্রতি ভালোবাসার শুরু। ঊনসত্তরে পূর্ব পাকিস্তান সাঁতারে প্রথম হলাম। তৎকালীন জাতীয় কোচ আবদুল কাদের আমার দিক্ষাগুরু। ক্যারিয়ারের শেষ অবধি তিনি ছিলেন আমার ট্রেনার।

বর্ণময় ক্যারিয়ার ছিল আপনার। গড়েছেন অসংখ্য কীর্তি।

মোশাররফ : স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়নশিপে জিতি চারটি স্বর্ণপদক। স্বাধীনতার পর জিতেছি আরো ৯৬টি স্বর্ণপদক। মজার ব্যপার হলো, জাতীয় পর্যায়ে কখনোই দ্বিতীয় হইনি আমি। স্বর্ণপদকের সেঞ্চুরি যেমন গড়েছি, তেমনই নিজের গড়া রেকর্ড ভেঙেছি বহুবার। ৬৪টি জাতীয় রেকর্ডের মালিক ছিলাম।

আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে?

মোশাররফ : ১৯৭৬ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিদেশের মাটিতে স্বর্ণপদক জিতে দেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম। ক্যারিয়ারে জিতেছি ৪৪টি স্বর্ণপদক, বাকি পদক অসংখ্য। বিভিন্ন বৈশ্বিক আসরে ১৯ বার দেশের পতাকা বহন করার গৌরবও আমার। ১৯৮৪ সালে নেপালে প্রথম সাফ গেমসের কোনো অনুশীলন ছাড়াই অংশ নিয়ে জিতি ৬টি রৌপ্যপদক। পরের বছর ঢাকা সাফ গেমসে জিতেছিলাম ৭টি পদক, যার ৫টি স্বর্ণ এবং ২টি রৌপ্য। আমার দুর্ভাগ্য, সাফ গেমস যখন শুরু হয়, তখন আমার বয়স ত্রিশের কোটায়। এটা সাঁতারের জন্য মোটেই উপযুক্ত বয়স নয়।

ক্যারিয়াজুড়ে খেলেছেন স্বল্পদৈর্ঘ্যরে সাঁতার। অথচ স্বাধীন দেশে আপনিই একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল জয় করেছেন। সেই গল্পটা শুনতে চাই।

মোশাররফ : ইচ্ছেটা অনেক আগে থেকেই ছিল। কারণ আমার আগের দুই বাঙালি ব্রজেন দাস এবং আবদুল মালেক এই কীর্তি গড়েন। তবে তাদের নামের পাশে কিন্তু বাংলাদেশ লেখা নেই। ১৯৮৬ সালে সিদ্ধান্ত নিই আর খেলব না। ১৯৮৮ সালে নিয়মিত সাঁতার কাটতে যেতাম সোনারগাঁও হোটেলের পুলে। সেখানেই ক্রীড়া সংগঠক কে জেড ইসলাম আমাকে বললেন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে। বললেন, আর্থিক সহায়তাও দেবেন। তার সহায়তা নিয়ে চলে যাই লন্ডন। সেখানে চলে আড়াই মাসের অনুশীলন। আমাকে তো প্রথমে ইংলিশ চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিচ্ছিল না কারণ আমার শরীরে মেদ ছিল কম। শীতলজলে মেদ চাদর হিসেবে শরীরকে রক্ষা করে। ফলে মেদ বাড়াতে এক মাস খাওয়া বাড়িয়ে দিলাম। সে সময় আমার ওজন বেড়েছিল ১৭ পাউন্ড। অনুমতি নিয়ে সাঁতার শুরু করলাম। সময় লেগেছিল ১০ ঘণ্টা ১৬ মিনিট। উঠে দেখি ওজন ১৭ পাউন্ডই কমে গেছে! এই উপমহাদেশের যত সাঁতারু ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন এ যাবৎকালে তাদের সবার মধ্যে আমার টাইমিংই সেরা। আরো মজার ব্যাপার হলো, সে সময় আমার ম্যানেজার ছিল আমার স্ত্রী আনিলা মোশাররফ।

স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি স্বাধীনতা পদক। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারসহ আরো অসংখ্য প্রাপ্তি আছে আপনার। এত কিছুর মধ্যে কোনো অপ্রাপ্তি?

মোশাররফ : ক্যারিয়ারে একটা বড় অপ্রাপ্তি হচ্ছে অলিম্পিকে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে না পারা। আশিতে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরও যাওয়া হয়নি। আর পরেরবার অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছিলাম ভাইভায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও। রাগে খেলাও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম।

সাঁতারের বর্তমান নিয়ে কী বলবেন?

মোশাররফ : এখন যারা খেলাটা চালাচ্ছেন তারা অবশ্যই যোগ্য। তবে তাদের আরো একটু সক্রিয় হতে হবে। এখনকার সাঁতারুদের বলব আরো বেশি নিবেদিত হতে। এমনও সময় ছিল, দিনে তিনবেলা অনুশীলন করেছি। এরশাদ সাহেব বলেছিলেন, তুই দেশকে দে, দেশ তোকে দেবে। আমিও বলি, দেশকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেই বড় মানুষ হওয়া যায়।