সড়কে থেমে যাক মৃত্যুর মিছিল|114689|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
সড়কে থেমে যাক মৃত্যুর মিছিল

সড়কে থেমে যাক মৃত্যুর মিছিল

নতুন বছরের প্রথম দিনেই আবারও রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরল দুটি প্রাণ। পোশাকশ্রমিক এক তরুণী ও এক কিশোরীর মর্মান্তিক এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার মৌচাক-রামপুরা সড়কে যে ব্যাপক তাণ্ডব চলেছে তা-ও বিশেষভাবে লক্ষ করবার মতো। রাস্তা পার হতে গিয়ে ফ্লাইওভার থেকে নেমে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় নিহত হন ওই দুইজন। এর জেরে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা তাণ্ডবে প্রায় শখানেক গাড়ি ভাঙচুর এবং দুটি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। মালিবাগ রেলগেট থেকে রামপুরা বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, লাঠিপেটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত বিশ-পঁচিশজন আহত হয়।

সড়ক দুর্ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে আছে। মহানগর-নগর-শহর-বন্দর সবখানেই সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এসব দুর্ঘটনার জের ধরে নানা সময়ে দেশের নানা স্থানে বড় ধরনের সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা যেমন ঘটেছে তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও সংকট সমাধানে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত ফেলে আসা বছরের শেষভাগে রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। লাগাতার কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা শান্তিপূর্ণ ওই আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথের চিত্র পাল্টে দিয়েছিল। স্কুলের পোশাক পরিহিত কোমলমতি কিশোর-কিশোরীরা সকাল-সন্ধ্যা যেভাবে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছে দেশবাসীর তা অনেকদিন মনে থাকবে। সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুরোধে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সে সময় কয়েকদফা দাবি উত্থাপন করেছিল। তখন সরকারের তরফ থেকে সে সব মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবের মধ্যেও বিস্তর ফারাক রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে গত ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২৪ হাজার ৯৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর সরকারি হিসাবের গড়ে তা বছরে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার জনের মতো। দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা বিভিন্ন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও তার প্রতিকারে যেসব পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন, তাতে চালকদের লাইসেন্স ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব, অতিরিক্ত গতি, সড়ক-মহাসড়কের কাঠামোগত ত্রুটিসহ নগর পরিকল্পনার নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে।

নতুন বছরের শুরুতে রাজধানীতে এই সড়ক দুর্ঘটনায় পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু এবং তার জেরে ব্যাপক গাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে নগর পরিকল্পনার বিষয়টিতে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক নগর পরিকল্পনায় কেবল বাড়িঘর, অফিস-আদালত, দালানকোঠা, রাস্তাঘাটের কাঠামো নয়, কোন জনগোষ্ঠী কী সংখ্যায় সেখানে থাকবে সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। কিন্তু রাজধানী ঢাকার পরিকল্পনায় কখনই এই বিষয়টি তেমনভাবে সামনে আসেনি।

মঙ্গলবারের দুর্ঘটনাস্থল মালিবাগ-রামপুরা এলাকাটি রাজধানীর মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচরসহ তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর কয়েকটি মূল কেন্দ্রের অন্যতম। এখানকার সড়কগুলোতে প্রতিদিনই থাকে পোশাকশ্রমিকদের উপচেপড়া ভিড়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কেবল রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেই কারখানায় দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পোশাকশ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের ওই তাণ্ডবের পেছনে হয়তো পোশাকশ্রমিকদের মনে জমা থাকা নানা অসন্তোষও কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু ভাঙচুরের সময় যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ওইসব গাড়িতে বা রাস্তায় ছিলেন তারা যে নির্মম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন তা কোনোভাবে কাম্য নয়। কোনো অবস্থাতেই জনভোগান্তি সৃষ্টি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।

ভুলে গেলে চলবে না, শুধু পোশাকশ্রমিক নয়, অগুনতি সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পারাপার করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে পদচারী সেতু, জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও পথচারীরা আইন অমান্য করে এভাবে রাস্তা পার হন। ঢাকার মতো জনবহুল ও ব্যস্ত মহানগরীতে নাগরিকদের অবশ্যই এ সব বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আমরা আশা করব সড়কে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই সচেষ্ট হবেন।