আগামী দিনের রাজনীতি|116168|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৩:৪৮
আগামী দিনের রাজনীতি

আগামী দিনের রাজনীতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ব্যতীত সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণভাবে সব দলের অংশগ্রহণে সুসম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ব অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে জাতিসংঘসহ সবাই নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। একই সময়ে যে সব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার সুষ্ঠু তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো রাষ্ট্র। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, মিডিয়াসহ বিভিন্ন কর্নার থেকে তথ্য-উপাত্ততে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যতটুকু অনিয়ম হয়েছে তার হিসাব করলে পক্ষ-বিপক্ষ ছিল, থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। যারা হেরে গেছে তারা সবকিছু একটু ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলবে এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ। হেরে যাওয়ার পর নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা, এটাও বাংলাদেশের নতুন কোনো ঘটনা নয়।

তবে যারা হেরে গেছে তারা সব হারিয়েছে এরকম না ভেবে যদি আত্মসমালোচনা, পর্যালোচনা ও নির্মোহ মূল্যায়নপূর্বক নিজেদের শক্তি  এবং দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করে আগামী দিনের কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে তাহলে সেটা তাদের নিজেদের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য শুভকর হবে। আর তা না করে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি যদি ২০১৪-২০১৫ সালের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নেয় তাহলে সেটা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, এসব বাংলাদেশের মানুষ চিরদিনের জন্য বিদায় করে দিয়েছে। সুতরাং বিএনপির বুদ্ধিজীবী মহল থেকে পরামর্শ আসছে, তারা যেন কোনো রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেয়। আমার প্রত্যাশা ছিল বিএনপির বুদ্ধিজীবীরা আরেকটি পরামর্শ দেবেন এই মর্মে যে, তারা যেন জামায়াত ত্যাগ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতিতে ফিরে আসে, যেখানে বাহাত্তরের সংবিধানের মৌলিক আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তারা তাদের দলের গঠনতন্ত্রে সন্নিবেশিত করবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত ও নিদর্শন বিএনপির কোনো জায়গা থেকে এখনো শোনা যায়নি।

২০১৪ সালের নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান, পরবর্তী সহিংসতা এবং তারপর হিল্লি-দিল্লি, ওয়াশিংটন, লন্ডন, দুবাইয়ে তারা দৌড়াদৌড়ি করেছে তাতে কোনো কিছুই বিএনপি অর্জন করতে পারেনি, কোনো লাভ হয়নি। বরং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ চাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানুষ বিএনপির প্রতি আরও অসন্তুষ্ট হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলে অগ্রহণযোগ্য করার জন্য বিএনপির নেতা-পাতি নেতারা চিৎকার কম করেনি। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০১৪ সালের নির্বাচনকে সাদরে গ্রহণ করেছে, স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা প্রমাণ, ২০১৪ সালের নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবের হোসেন চৌধুরী যথাক্রমে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন এবং ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণে ব্যাপক হারে ভোটারের ভোটদানের মধ্য দিয়ে সুসম্পন্ন হয়েছে, যার স্বীকৃতি এরই মধ্যে সারা বিশ্ব থেকে পাওয়া গেছে। যতটুকু অনিয়ম হয়েছে বা বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো দেশ, যে কথা লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি। এ ধরনের আহ্বান তো একটা রুটিন ব্যাপার। যে কোনো অভিযোগ, তা সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক না কেন সেটি যদি আমলযোগ্য হয় তাহলে তার তদন্ত হওয়া উচিত, এ কথা সবাই বলবে। অনিয়ম কিছু হয়ে থাকতে পারে, যেমনটি হয়েছে বিগত দিনের সব নির্বাচনে। সাড়ে আট কোটি ভোটার ভোট দিয়েছে, ৪০ হাজারের ঊর্ধ্বে কেন্দ্র এবং ২ লাখের ওপরে বুথ ছিল। এর মধ্যে কতজন ভোটার অনিয়মের শিকার হয়েছে এবং কতটা কেন্দ্র ও বুথে আমলযোগ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সবের সঠিক হিসাব নিলে দেখা যাবে শতকরা হিসাবে এটা হবে খুবই নগণ্য। এটা নিয়ে এত বড় একটা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই, যৌক্তিকতাও নেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে প্রথম যে কথাটি বলতে হবে তাহলো যে কোনো প্রাণহানিই দুঃখজনক এবং অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এবারের তুলনায় আগের নির্বাচনগুলোতে আরও বেশি সহিংসতা হয়েছে, বেশি সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং এই নির্বাচনকে বিএনপি কর্তৃক অগ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই বিএনপি যদি দলকে টিকিয়ে রাখতে চায়, সামনে এগোতে চায় তাহলে আত্মোপলব্ধির পথে আত্মমূল্যায়ন করে নিজেদের ৪০ বছরের রাজনীতি এবং বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব, তার সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে দলকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি পাকিস্তানের মতো সন্ত্রাসী ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের সাহায্য চেয়েছিল যাতে চীন বর্তমান সরকারকে সমর্থন না করে। কিন্তু তাতে উল্টো কাজ হয়েছে।

নির্বাচনের ফল বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের সর্বকালের ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সবার আগে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দুনিয়া বদলে গেছে, বিএনপি বদলায়নি। তাই টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে দলের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। ৩০ ডিসেম্বর ভোটের ফল প্রমাণ করেছে জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রথিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, পাকিস্তান মতাদর্শের রাজনীতি বাংলাদেশে চলবে না। জিয়াউর রহমানের রাজনীতিকে বাতিল এবং মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে পারলে আবার ঘুরে দাঁড়াবার সম্ভাবনা বিএনপির রয়েছে। যেহেতু তাদের তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় কাঠামো রয়েছে, তাই নতুনভাবে নব আদর্শে দলকে পুনর্গঠিত করা খুব কঠিন কাজ হবে না। এর ফলে সামান্য একটি অংশ দল ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু তার জন্য দলের সার্বিক কোনো ক্ষতি হবে না। এটা যদি তারা করতে পারে তাহলে বিএনপি নামের দলটি বাংলাদেশে টিকে থাকবে। আর তা না হলে বিশে^র সব সামরিক শাসকদের সৃষ্ট দলের মতো বিএনপির নামও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

অবশ্য আগামী কয়েক বছরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিএনপির নামটা হয়তো থাকবে না, যার জন্য সে স্থানে স্বাভাবিক সহজাত সূত্র মতে আওয়ামী লীগের বিপরীতে নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থান ও আবির্ভাব ঘটবে, যারা পরিপূর্ণভাবে হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনুসারী। বিএনপি নিজেরাও জানে পাকিস্তানপন্থি রাজনীতি বাংলাদেশে চলতে পারে না, চলবে না। তাই তারাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ওই বলে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে, বিভ্রান্ত করে এতদিন টিকে ছিল। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির মহাবিপ্লবের ফলে এদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের ধূম্রজালকে ছিঁড়ে ফেলে, ভেদ করে বিএনপির আসল মুখোশটি উন্মোচন করে দিয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা দেখেছে বাংলাদেশের বিএনপি নামক দলটির প্রার্থী ঠিক করে দিচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, যাদের সঙ্গে তারেক রহমানের একাধিক গোপন বৈঠক, সিনিয়র নেতা খোন্দকার মোশাররফ হোসেনের ফোনালাপ ইত্যাদি সবকিছু মিলে বিএনপির আসল চেহারাটি তরুণ প্রজন্মের কাছে একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। চার কোটি তরুণ ভোটার প্রত্যাখ্যান করায় বিএনপির এমন ভরাডুবি ঘটেছে।

বিএনপির লেভেল প্লেইং ফিল্ডের চিৎকারও মানুষ কর্ণপাত করেনি। কারণ, একাত্তরের ফাউল খেলার জন্য যে জামায়াতকে লালকার্ড দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মাঠ থেকে বিদায় করে দিয়েছিল, সেই লালকার্ডধারী জামায়াতকে নিজেদের জার্সি ধানের শীষ মার্কা দিয়ে মাঠে নামিয়ে নিজেদেরই সর্বনাশ ডেকে এনেছে। অন্যদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো কোনো সম্বলই বিএনপির ছিল না। সুতরাং বিএনপি যে সব মনগড়া অভিযোগ এখন উত্থাপন করছে তার গ্রহণযোগ্যতা দেশে-বিদেশে কোথাও পাবে না। তবে এ কথা এখনো বলতে হবে, আওয়ামী লীগের পরে জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপিই দ্বিতীয় দল। তাই বিএনপির পরবর্তী অবস্থান এবং নতুন সরকারের জনপ্রত্যাশা পূরণের ফলাফলই আগামী দিনে রাজনীতির পথ দেখাবে।

লেখক : সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও কলামনিস্ট