নদীর বুকে চাষাবাদ|118252|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৫:১৫
নদীর বুকে চাষাবাদ

নদীর বুকে চাষাবাদ

অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘উত্তরাঞ্চলে খরস্রোতা নদীতে চাষাবাদ’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি উদ্বেগের। কারণ নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীর সেই চিরচেনা রূপ আর এখন নেই। শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, সারা দেশের নদ-নদীগুলোর এখন একই চিত্র। নদীতে পানি নেই। নাব্য সংকট। নৌযানগুলোও এখন আর আগের মতো চলতে পারে না। এমনকি এমন অনেক নদী আছে, যেগুলোতে খেয়া পারাপারেরও প্রয়োজন পড়ে না। মানুষ হাঁটুপানি ভেঙেই পাড়ি দিচ্ছে।

জলবায়ুজনিত অভিঘাত অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি কিংবা বন্যা, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। অনেক সময়ই আগাম বন্যার কবলে পড়ে ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হয়। কপাল পোড়ে কৃষকের। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পদ্মা ও তিস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। এসব নদীর উৎসমুখ উজানের দেশ ভারতে। পার্শ্ববর্তী বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি দীর্ঘদিন ধরে উজানের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে তিস্তা, পদ্মা বর্ষার মৌসুম শেষ হতে না হতেই পানিশূন্য হয়ে পড়ে। মূলত ভারত উজানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারাজ তৈরি করে একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী এখন পানির অভাবে মৃতপ্রায়। এমনকি ভারত তিস্তার পানি আটকে ভারত অংশে মহানন্দা নদীতে, জলপাইগুড়ি জেলার দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কুচবিহার জেলায় সেচসুবিধা নিচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে উজানের পানি আটকে দেওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এখন ধীরে ধীরে মরূকরণের দিকেই এগোচ্ছে, যা অনৈতিক এবং বাংলাদেশের মানুষের ওপর এক বড় অবিচার। এ নিয়ে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও আশ্বাস ছাড়া কার্যত কিছুই মিলছে না।

এক দশক আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হবে, এমনই কথা ছিল। সে সময় মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আর আসেননি। ফলে ড. মনমোহন সিংয়ের শত ইচ্ছা থাকার পরও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আর হয়নি। অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির শিকার তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। যার কারণে তিস্তার পানি চুক্তির আশ্বাস বারবার মিললেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিদি মমতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে তৃতীয় মেয়াদে আবার শপথ নিয়েছে। সময়ের অঙ্কে যা কোনোভাবেই কম নয়। অথচ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে ভারতকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। সরকারের এই মেয়াদে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফল হবেন এটাই মানুষের প্রত্যাশা। এ বিষয়ে সরকার কী করবে, যা দেখার জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, উজানের পানি একতরফাভাবে আটকে ভারত যেভাবে ভাটির দেশের মানুষের ওপর অবিচার চালাচ্ছে, যাতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য, চাষাবাদ সবই আজ হুমকির মুখে। ছোট্ট ভূখণ্ডের বাংলাদেশের জনসংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যভা-ারখ্যাত উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক চাষাবাদকে নির্বিঘ্ন করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই। অথচ তিস্তায় পানির অভাবে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় পানির এখন বড়ই আকাল। নদ-নদীগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এমন একসময় ছিল, পানিতে ভরা টইটম্বুর নদীগুলোয় মেশিন বসিয়ে পানি উত্তোলন করে সেচভিত্তিক চাষাবাদ করা হতো। সে সময় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের তেমন কোনো প্রয়োজন হতো না। সেসব অবস্থা এখন শুধুই স্মৃতি। একমাত্র সেচভিত্তিক উচ্চফলনশীল চাষাবাদই মানুষের দুবেলা দুমুঠোর খাবার নিশ্চিত করেছে।

এখন নদীগুলোয় পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানিই একমাত্র অবলম্বন। মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের অনেক জায়গায় এখন মাটি খনন করে গভীরে শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির আধারও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদ বিঘিœত হবে। যার বিরূপ প্রভাবে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্যের জোগান পাওয়াও কঠিন হবে। শুধু কি তাই? মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানিতে স্বাস্থ্যহানিকর আর্সেনিকের মাত্রাও দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। এমতাবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে এনে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য দেশের শুকিয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো খনন করে পানি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থাৎ বন্যা ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। এমনকি বৃষ্টির পানি, নদীর পানি পরিশোধন করে খাওয়ার উপযোগী করতে হবে। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রতিবছরই পর্যায়ক্রমে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যন্ত ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ উপযোগী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এ নিয়ে ন্যূনতম শৈথিল্য মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য নিকট ভবিষ্যতে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাস্তবতা হচ্ছে, উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া আমাদের মৌলিক অধিকার। অথচ সে অধিকার থেকে বছরের পর বছর আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম দেশের কাছ থেকে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়, যা দুই দেশের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে জনগণের বন্ধুত্বে পরিণত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করেছে। তাদের এ ঋণ পরিশোধ হওয়ার মতো নয়। অথচ তারাই আমাদের উজানের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। আমরা আশাবাদী, বন্ধুপ্রতিম ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনে ত্বরিত ব্যবস্থা নেবেন।

শুধু তিস্তা, পদ্মা নদীই নয়, আরেক খরস্রোতা নদ ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র নদও ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা কুড়িগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। খরস্রোতা সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে এ অঞ্চলের মানুষের আবাদি জমি, বসতভিটা, অনেক উন্নয়ন স্থাপনা প্রতিবছরই নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্রও এখন নাব্য হারিয়ে শুষ্ক মৌসুমে মরা নদীর মতোই হয়ে গেছে। অথচ বর্ষাকাল এলে এ নদীর রূপ পাল্টে যায়। দুই কূল ভরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পানিতে কৃষকের চাষাবাদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্রের উজানে ভারত অংশে বাঁধ দিয়ে এর পানিও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে ব্রহ্মপুত্রও এখন তিস্তা, পদ্মা, সুরমা নদীর মতোই মরা খালে পরিণত হচ্ছে। সংগত কারণে শুধু তিস্তাই নয়, অভিন্ন প্রতিটি নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে উজানের দেশ যেন কোনোভাবেই একতরফাভাবে প্রত্যাহার করতে না পারে, যা নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।

আবার নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে সুবিশাল চর আর চর। এমনকি নদীর তলদেশেও এখন আর পানি নেই। চাষিরা এসব চরে নির্বিঘ্নে নানা জাতের ফসলের চাষাবাদ করছে। দেখলে মনে হবে, এ যেন নদী নয়, সবুজে ভরা কোনো ফসলের মাঠ। এ দৃশ্য শুধু তিস্তা নদীতেই সীমাবদ্ধ নেই, ব্রহ্মপুত্র নদের বুকেও চলছে লাউ, কুমড়া, তরমুজ, শসা, ডাল, কলাই ও ধানের চাষাবাদ। যদিও আগাম বন্যার কবলে পড়ে অনেক সময়ই নদী চাষিদের কপাল পুড়ে। আমরা নদীর বুকে চাষাবাদ করতে চাই না। নদীতে মৎস্যজীবীরা মাছ ধরে স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা নির্বাহ করবেন। নদীকেন্দ্রিক মানুষের রুটিরুজি নদীকে ঘিরেই নিশ্চিত হবে। পাল তুলে নৌকা না চললেও শ্যালো ইঞ্জিন বোট চলবে সহসাই। আমরা চাই, নদীতে ফিরে আসুক নদীর চিরচেনা সেই ঐতিহ্য। আর আগের অবস্থায় নদীগুলোকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে উত্তরাঞ্চল তথা সারা দেশের মানুষের জীবনমান, জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকিতে পড়বে, তেমনি পানির অভাবে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্য উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা সারা দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে বড় অন্তরায় সৃষ্টি হবে।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও কলামনিস্ট