আমার ছেলেবেলা|129314|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০১৯ ১১:৪০
আমার ছেলেবেলা
স্টিফেন হকিং

আমার ছেলেবেলা

ছবি: এএফপি

[প্রখ্যাত মহাবিশ্ব তাত্ত্বিক স্টিফেন হকিংয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। গত বছর ১৪ মার্চ তার জীবনাবসান হয়। বিজ্ঞানের এই বিস্ময় ব্যক্তিত্ব তার শৈশবের কথা তুলে ধরেছেন ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘মাই ব্রিফ হিস্টোরি’ গ্রন্থে, সাংবাদিক ও বিজ্ঞানকর্মী জাহাঙ্গীর সুর যার বাংলান্তর করেছেন আমার এই ছোট্ট জীবন নামে। অনুবাদগ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য।]

আমার জন্ম ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি, ঠিক তিনশ বছর আগের যে দিনটায় মারা গিয়েছিলেন গ্যালিলিও। আমার অনুমান, এ দিন প্রায় দুই লাখ শিশুর জন্ম হয়েছিল। তবে এদের মধ্য থেকে আর কেউ জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহী হয়েছিল কি না, আমার তা জানা নেই।

ছেলেবেলার সবচেয়ে পুরোনো যে স্মৃতিটা আমার মনে গেঁথে আছে তা হলো, আমি হাইগেটে বায়রন হাউস স্কুলের নার্সারি ক্লাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে অঝোরে কাঁদছি। আমার চারপাশে শিশুরা খেলছে। ওদের খেলনাগুলো কী সুন্দর বলে মনে হচ্ছিল। ওদের সঙ্গে আমিও খেলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তখন আমার বয়স আড়াই বছর। সেই প্রথম অচেনা দলের মাঝে আমাকে একা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে আমি খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমার এমন অবস্থা দেখে মা-বাবা একটু অবাকই হয়েছিলেন। আমি ছিলাম তাদের প্রথম সন্তান। আমার লালনপালনে তারা শিশুদের বিকাশ বিষয়ক বইসই পড়তেন। সেসব বইতে বলা ছিল, দুই বছর বয়স হলেই শিশুকে সামাজিক সম্পর্কের জন্য তৈরি করা উচিত। কিন্তু ওই ভয়াবহ সকালের পর তারা আমাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর আরও দেড় বছর পর পর্যন্ত তারা আমাকে ওই বায়রন হাউসে আর রাখতে যাননি।

যুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হাইগেট এমন একটা এলাকা ছিল যেখানে বেশ কিছু বিজ্ঞানী আর শিক্ষাবিদ বসবাস করতেন। (অন্য কোনো দেশ হলে, তাদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ইংরেজরা কখনোই স্বীকার করেনি যে, তাদের কোনো বুদ্ধিজীবী আছে।) এসব মা-বাবা তাদের সন্তানকে বায়রন হাউস স্কুলে পাঠাতেন। কারণ, সে সময় সেটাই সবচেয়ে অগ্রসর স্কুল। কিন্তু আমার এখনো মনে আছে, মা-বাবার কাছে আমি একবার অভিযোগ করেছিলাম- এই স্কুলটা আমাকে কিছুই শেখাতে পারছে না।

ছেলেবেলার আরেকটা স্মৃতি মনে পড়ে; এটা কীভাবে আমি প্রথম খেলনা রেলগাড়ি পেয়েছিলাম তা নিয়ে। যুদ্ধের সময় খেলনা বানানো বন্ধ ছিল। অন্তত দেশের বাজারের জন্য তো নয়ই। কিন্তু খেলনা রেলগাড়ির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল প্রবল।

বাবা একবার কাঠ দিয়ে একটা রেলগাড়ি বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়াচড়া করতে পারে, এমন কিছু চেয়েছিলাম আমি।

পরে বাবা চাবিটানা একটি পুরোনো খেলনা রেলগাড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলেন। ঝালাই করে মেরামত করা রেলগাড়িটা তিনি আমাকে বড়দিনের উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। তখন আমার বয়স তিন বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সে রেলগাড়িটাও ঠিকমতো চলত না। যুদ্ধের ঠিক পরপরই আমার বাবা আমেরিকা বেড়াতে গিয়েছিলেন। কুইন মেরি জাহাজে চড়ে ফেরার সময় তিনি আমার মায়ের জন্য এনেছিলেন কিছু নাইলন, তখন যা ব্রিটেনে পাওয়া যেত না। আমার বোন মেরির জন্য বাবা এনেছিলেন একটা পুতুল, শোয়ালেই যেটা চোখ বুঁজে নিত। আর আমার জন্য বাবা এনেছিলেন একটা আমেরিকান রেলগাড়ির সেট। এতে ছিল রেললাইন থেকে বাধা দূর করার জন্য কাউক্যাচার। আর ইংরেজি আট আকৃতির একটা ট্র্যাক। বাক্সটা খুলতেই আমি যে কী রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম, এখনো তা মনে পড়ে।     

চাবিটানা রেলগাড়িগুলো যে বেশ চমকপ্রদ ছিল, তা বলতেই হয় বটে। কিন্তু আমি যা মন থেকে চাইতাম, তা হলো বিদ্যুৎচালিত রেলগাড়ি। হাইগেটের কাছে ক্রাউচ এন্ডে আমি  মডেল রেলওয়ে ক্লাব লেআউট দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম। আর স্বপ্ন দেখতাম বৈদ্যুতিক রেলগাড়ির। একবার মা-বাবা বাইরে কোথায় যেন গিয়েছিলেন। আমি সেই সুযোগে পোস্ট অফিসে আমার নামে যে সামান্য কিছু টাকা জমানো ছিল, তার সবটাই তুলে নিয়েছিলাম। এই টাকাগুলো ছিল বড়দের থেকে পাওয়া আমার উপহার। বিশেষ বিশেষ দিনে আর উৎসবে, যেমন আমার উৎসর্গের দিনে এসব উপহার পেয়েছিলাম। আমি এসব টাকা দিয়ে একটা বিদ্যুৎচালিত রেলগাড়ি কিনে ফেললাম। কিন্তু শেষে খুব হতাশ হয়েছিলাম। কারণ, এই রেলগাড়িটাও ঠিকমতো কাজ করল না। আসলে তখনই উচিত ছিল রেলগাড়িটা দোকানির কাছে ফেরত দিয়ে আসা। কিংবা যে কারখানায় সেটা তৈরি, সেখানে গিয়ে বদলে ভালো আরেকটা একটা সেট দাবি করতে হতো।

সে সময়ে মানুষ কিছু একটা কিনতে পারলেই যেন কৃতার্থ হতো। যদি কেনা জিনিসে কোনো খুঁত থাকত, তাহলে তা নিতান্তই ভাগ্যের পরিহাস আরকি। কাজেই আমি আরও কিছু টাকা খরচ করে ইঞ্জিনের মোটর মেরামত করিয়ে নিলাম। কিন্তু তারপরও রেলগাড়িটা ঠিকঠাক কাজ করেনি।

আরও পরে, কৈশোরে আমি খেলনা বিমান আর নৌকা বানিয়েছিলাম। এসব বানানোর ব্যাপারে আমি ততটা দক্ষ ছিলাম না। আসলে আমি এগুলো বানাতাম আমার স্কুলবন্ধু জন ম্যাকক্লিনাহানতে সঙ্গে নিয়ে। এগুলোতে ও খুব দক্ষ ছিল। ওদের বাড়িতে ওর বাবার একটা সারাইখানা ছিল। আমার লক্ষ্য ছিল এমন কিছু মডেল তৈরি করা যা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। মডেলটা দেখতে কেমন হলো, এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সম্ভবত একই তাড়না থেকে আমি বেশ কিছু খুব জটিল প্রকৃতির খেলা বানিয়েছিলাম, রজার ফারনিহো নামে আরেক স্কুলবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে।

এসব খেলার মধ্যে ছিল একটা নির্মাণবিষয়ক। এতে ছিল কয়েকটা কারখানা, যেখানে প্রতিটা ইউনিট ভিন্ন ভিন্ন রঙ দিয়ে বানানো হতো। আর ছিল যাতায়াতের জন্য সড়ক ও রেলপথ; ছিল একটা স্টক মার্কেটও। যুদ্ধবিষয়ক একটা খেলাও বানিয়েছিলাম আমরা। চার হাজার বর্গবিশিষ্ট একটা বোর্ডে এটা খেলতে হতো। এমনকি সামন্ততান্ত্রিক একটা খেলাও বানিয়েছিলাম। এতে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের একটা বংশতালিকাসহ পুরো রাজবংশ থাকত। আমার মনে হয় কি, রেলগাড়ি, নৌকা আর বিমানের মতোই এসব খেলা আমাদের মাথায় এসেছিল একই তাড়না থেকে। তা হলো: কোনো কিছু কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয়- এসব জানা ও বোঝা। পিএইচডি শুরু করার পর মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আমার গবেষণার মাধ্যমে আমি এই তৃষ্ণাটা মিটিয়েছি। জেনেছি, মহাবিশ্ব কীভাবে চলছে, তা বুঝতে পারলে কোনো একটা উপায়ে তাকেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীর সুর। আমার এই ছোট্ট জীবন। দেশ পাবলিকেশনন্স, ২০১৯। পৃষ্ঠা ১৯-২৯।