আলী গুহার রোমাঞ্চ|130846|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ মার্চ, ২০১৯ ০৯:৪৮
আলী গুহার রোমাঞ্চ
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

আলী গুহার রোমাঞ্চ

এলাকাবাসীর কাছে আলীর সুরম নামে পরিচিত। সরকার পুরাকৃীতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু যে গুহার নাম আলীর নামে তা নয়। যে পাহাড়ে এই গুহার অবস্থান তার নামও আলীর পাহাড়। উপজেলার নাম আলীকদম। ধারণা করা হয়, আলীকদম, আলীর পাহাড় আর আলীর গুহা একই সূত্রে গাঁথা।

ঢাকা থেকে যাচ্ছি আলীর গুহা দেখতে। আমাদের দেছুট সংগঠনের পাঁচ বন্ধু।  রাতের বাসে রওনা হয়েছি। ঢাকা মহাসড়কের দীর্ঘ জ্যাম পার করে দুই ঘণ্টা লেট করে গাড়ি পৌঁছাল সকাল ১০টায় কক্সবাজারের চকরিয়াতে। যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। লোকাল বাসে গেলে আরও সময় লাগবে। অগত্যা দেরি হওয়াতে অনেকগুলো টাকা খরচ করে সময় বাঁচানোর জন্য আলীকদমের লোকাল বাসের বদলে, একেবারে পানবাজার পর্যন্ত চান্দের গাড়ি ভাড়া করলাম। সবাই চকরিয়া বাজারে নাশতা সেরে ব্যাগ-বোঁচকাসহ চান্দের গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ভাগ্য বোধহয় সহায় ছিল। আমাদের চান্দের গাড়ির ড্রাইভার নুরুল ইসলাম শুধু প্রাইভার না দক্ষ গাইডও হয়ে আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন। পাহাড়ি পথ দিয়ে গাড়ি চকরিয়া থেকে ফাঁসিয়াখালি দিয়ে দক্ষিণে আলীকদম সড়ক চলে গেছে এঁকেবেঁকে।

এই ধরনের চান্দের গাড়িতে সাধারণত ১৭ জন যেতে পারে। সেখানে আমরা মাত্র ৫ জন যাচ্ছি। মনের আনন্দে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সবাই যাচ্ছি। আমার বিশাল আয়তনের কারণে সহযাত্রী বন্ধুরা নানা কথা বলতে শুরু করেছে। তাদের আমার বিশাল আয়তনের দেহ নিয়ে নানা চিন্তা। কেউ বলছে আলীর গুহায় প্রবেশের আগে দুই পাহাড়ের মধ্যে আমার শরীর না আটকে যায়। কোথাও যাওয়ার আগে এমন সব সাবধানবাণী আমাকে বরাবরই আরও বেশি উৎসাহী করে তোলে। শিবাতলী বাজারে গাড়ি থামল।

যে যার মতো টুকটাক সদাইপাতি করলাম। লামা পেছনে ফেলে আর্মি ক্যাম্প পাশ কেটে পৌঁছে যাই আলীকদম উপজেলার পানবাজার। চকরিয়া থেকে পানবাজার ৫০ কিলোমিটার। রাস্তার দুইপাশের সবুজে ঢাকা পাহাড় দেখতে দেখতে কখন যে পথের শেষ হয়ে গেছে টেরই পেলাম না। এবার আমাদের হাঁটা পথের শুরু হলো। কিছুদূর হাঁটতেই পেয়ে যাই তৈন খাল। মাতামুহুরী নদীর পানি গড়িয়ে এসে এই খালে পড়েছে। তৈন খালের আশপাশ সবুজ প্রকৃতির আমাদের বিমোহিত করেছে। আমরা যে যার মতো ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

হাঁটু সমান স্বচ্ছ টলটলে পানিতে হেঁটেই পার হচ্ছি। বুনো পরিবেশে এখন কিছুটা হাইকিং-ট্রাকিং। তারপর স্যাঁতসেঁতে দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সরু পথে চলা। কখনো হাঁটু কখনো কোমর সমান পানিতে কখনো-বা আবার দুই পা দুই পাহাড়ের খাঁজে রেখে এগিয়ে যাওয়া। মনের মধ্যে ভিন্ন রকম অনুভূতি। এ পথে সূর্যের আলোও ঠিকমতো পড়ে না। এ রকমভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর পেয়ে যাই আলীর গুহায় প্রবেশের সিঁড়ি। লোহার সিঁড়ি খাড়া হয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে, খুবই পিচ্ছিল। পা পিছলে পড়লে পুরোই আলুরদম হতে হবে। তবুও মনের মধ্যে জয়ের নেশা, চোখে রয়েছে দেখার আশা। সঙ্গীদের সহযোগিতায় তরতর করে উঠে যাই ওপরে।

সিঁড়ি শেষে মূল সুড়ঙ্গে ঢুকতে কিছুটা ঝুঁকি। তবুও ঢুকে যাই। ঘুটঘুটে অন্ধকার জ্বলে ওঠে টর্চ। কিছুদূর এগোই একেই বলে প্রকৃতির আপন খেয়ালের নিদর্শন। আমরা প্রায় ৮০ মিটার পর্যন্ত ঢুকেছি। এর ব্যাপ্তি প্রায় ৭০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। কোনো কোনো পর্যটক ও এখানকার আদিবাসীরা সুরঙ্গের ২০০ মিটার পর্যন্ত গিয়েছে। এখানে আসার আগে শুনেছি এখানে অনেক বাদুড়ের বসবাস। বন্য জন্তুর বিষ্ঠার উটকো গন্ধ। বিষধর সাপও রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এসব কিছুই আমরা দেখতে পাইনি। তাই কান কথায় বিশ্বাস না করে ঘুরে আসুন নির্ভয়ে আলীর গুহায়।

যাবেন কীভাবে

ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলে চকরিয়া । চকরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে আলীকদম। চান্দের গাড়িতে পানবাজার নেমে আলীর সুড়ঙ্গ। ইদানীং সরাসরি আলীকদম পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। সেখান থেকে মোটর বাইকেও যাওয়া যাবে।

খাবেন কী, থাকবেন কোথায়

আলীকদম বা পানবাজারে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।

খরচপাতি

দুই দিনের ভ্রমণে মাথাপিছু খরচ হবে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা, তবে একটু কষ্ট করে ভ্রমণ করলে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যেও সম্ভব।