বিআরটিএর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য|132371|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ মার্চ, ২০১৯ ১৩:৪৪
বিআরটিএর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিআরটিএর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য

ড. শামসুল হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। একই বিভাগ থেকে তিনি গণপরিবহন প্রকৌশলে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন সড়ক অবকাঠামো ও গণপরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার সংকট ও সমাধান নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশরাফুজ্জামান মণ্ডল।

দেশ রূপান্তর : সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ মনে করা হয় চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স না থাকাকে। আইনে থাকলেও বিআরটিএ কেন এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?

শামসুল হক : এটাই একমাত্র সমস্যা নয়। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেক কারণ থাকে। মহাসড়কে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে চালকদের অবশ্যই প্রশিক্ষিত হতে হবে। তাদের সাইড, সংকেত, সড়কবাতি বুঝতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা কমবে এ ধারণা আংশিক সত্যি। ধরুন, আমি সব মেনে গাড়ি চালালাম কিন্তু হঠাৎ সড়কে একটা গরুর গাড়ি কিংবা নছিমন-করিমন এসে তাকে সাইড দিতে গিয়ে দুর্ঘটনা হলো, তখন দোষ কাকে দেবেন? ফলে মহাসড়ক বলতে আমাদের বোঝানো হচ্ছে তার সকল সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। তবে আরবান এলাকায় এটা ভিন্ন কথা।

দেশ রূপান্তর : এখানে বিআরটিএর ব্যর্থতা কী?

শামসুল হক : অনেক বড় ব্যর্থতা তাদের। প্রতিষ্ঠানটিকে তৈরি করা হয়েছিল পুরো পরিবহন ব্যবস্থাপনা দেখার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো তারা সিস্টেমটাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে, এখানে যে কেউ আসলেই লাইসেন্স পেয়ে যায়, ফিটনেস না থাকলেও রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। ফলে সড়কে চালকের অদক্ষতা বা গাড়ির ত্রুটিতে দুর্ঘটনা ঘটে তখন সবার আগে বিআরটিএ এর ওপর দায় পড়ে। এ ক্ষেত্রে তাদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। উন্নত বিশ্বে এমনটা হলে বিআরটিএ সবার আগে কাঠগড়ায় থাকত। কিন্তু এদেশ চমৎকার দেশ! এখানে কর্র্তৃপক্ষ কখনই কাঠগড়ায় দাঁড়ায় না। যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য কালপ্রিট বেচারা একজন ড্রাইভার।

দেশ রূপান্তর : ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়ক থেকে সরানো যাচ্ছে না! গাড়ির ফিটনেস নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ কী হতে পারে?

শামসুল হক : ফিটনেস চেকিংয়ের জন্য আমরা টোলপ্লাজাগুলো ব্যবহার করতে পারি। এখানে যে গাড়ির ফিটনেস পাওয়া যাবে না তৎক্ষণাৎ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিআরটিএ একটা সেন্ট্রালাইজড সিস্টেম করে রেখেছে। কয়টা গাড়ি আসতেছে? কয়টা ইন্সপেক্টর তাদের আছে? এমন পরিবেশ তারা তৈরি করেছে যে এটা এমনিতেই দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দেশে যেভাবে ফিটনেস দেওয়া হয়, পৃথিবীর কোনো দেশে সম্ভবত এমন অদ্ভুত পদ্ধতি নেই। পুরো প্রক্রিয়াটাই বিআরটিএ কিছু সুবিধাবাদী লোক দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। একে ফিটনেস পরীক্ষা বলে না, একে টাকা দিয়ে ছাড়পত্র নেওয়া বলে। অপরদিকে রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরা পড়লে আমাদের পুলিশ ভাইদের মেরিট এতই কম যে, অল্প পয়সাতেই তাদের ম্যানেজ করা যায়। সুতরাং দুদিক যখন ম্যানেজেবল, তখন কেন মানুষ বিশুদ্ধ জায়গায় আসবে?

দেশ রূপান্তর : দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, হত্যার উদ্দেশ্য ছিল কি না তা দেখতে হবে। এটা কতটা যৌক্তিক?

শামসুল হক : এটার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। সড়ক দুর্ঘটনার পর বিআরটিএ, সড়ক বিভাগ, মালিকপক্ষ, সবাই নিরাপদ থাকবে শুধু নিরীহ চালক কেন শাস্তি পাবে? আমি বারবার বলছি সড়ক দুর্ঘটনায় চালক একটি মাত্র নিয়ামক, এর সঙ্গে বহুপক্ষ জড়িত। শাস্তি হতে হলে সার্বজনীন শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমার মনে হয় যারা শুধু চালকের দায় নির্ধারণ করছে তারাও এখানে দায়ী। সে জন্য আমি বলছি আগে সিস্টেম কারেকশন করতে হবে। এরপর যে দায়ী হবে, তাকে ফাঁসি দিতে হবে। চালকের সব ঠিক থাকার পরও সড়কের এলোমেলো অবস্থার কারণে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় কার? ফলে বিশুদ্ধ সিস্টেম না করে শুধু একজনের শাস্তির পক্ষে আমি নই।

দেশ রূপান্তর : গণপরিবহনের চালক ও সহকারীদের দৈনিক মজুরিতে গাড়ি চালাতে দিলে তারা অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করে বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। চালক ও সহকারীদের মাসিক বেতনে নিয়োগ দিতে অসুবিধা কোথায়?

শামসুল হক : চালকদের অবশ্যই ভালো অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে হবে। এতে তাদের নিরাপত্তা বাড়ে। মালিক যদি তাদের দৈনিক টাকার পরিমাণ ঠিক করে দেয়, এতে তারা বেপরোয়া হয়ে পড়ে। এক বাসের যাত্রীদের ধরার জন্য আরেক বাস ধাক্কাধাক্কি করে। আমি মনে করি, তাদের দৈনিক মজুরি থেকে বের করে এনে মাসিক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। আট ঘণ্টা ডিউটির ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিতে হবে মালিকদের। মাল্টিপল অপারেটর এবং লিজ সিস্টেম এই দুইটাকেও আমি বড় অভিশাপ হিসেবে বলব। আর এর সিম্পটম হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কারণ এখানে শুধুই মালিক ব্যবসা করছে।

দেশ রূপান্তর : ট্রাফিক আইন না মানার ক্ষেত্রে নাগরিক এবং পরিবহন চালকদের কার কতটা দায়? এ ক্ষেত্রে সড়ক আইন ও সড়কের কাঠামোগত সমস্যা আছে বলে মনে করেন কি?

শামসুল হক : পথচারী এবং চালক সবাই হচ্ছে সড়কের ব্যবহারকারী। তাকে যদি আইন মানাতে হয় তাহলে অবকাঠামোও সে অনুযায়ী হতে হবে। উদাহরণ হিসেবে ক্যান্টনমেন্টের কথা বলি। অনেকে মনে করে বন্দুকের ভয়ে সবাই ক্যান্টনমেন্টের আইন মেনে চলে। আমি মনে করি এটা ভুল ধারণা। কারণ ক্যান্টনমেন্টে গেলে আপনি এলোমেলো সড়ক পাবেন না, ফুটপাত দখল দেখবেন না। ফলে পরিবেশ দেখেই মানুষ এটা মেনে চলে। কিন্তু বাইরে এর ছিটেফোঁটা পরিবেশও নেই।

দেশ রূপান্তর : রাজধানী ঢাকা বা এমন বড় নগরগুলোতে সিটিং সার্ভিসে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের ভাড়া একই রকম নয়। সব কোম্পানিকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা, একই ভাড়া নির্ধারণ করা কি সম্ভব? এ বিষয়ে কোনো আইন আছে কি?

শামসুল হক : আইনে সিটিং সার্ভিস বলে কিছু নেই। যারা বেশি ইনকাম করতে চায় তারা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট সার্ভিস তৈরি করে। এটাকে বাস সার্ভিস বলে না। এটা দুর্নীতি করার একটা কায়দা মাত্র। যখন তারা দেখল এই পদ্ধতিতে আপত্তি তোলার কেউ নেই তখন তারা এটা পেয়ে বসে। উন্নত বিশ্বে এক কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস দেয়। ফলে তারা নিজেরা এক্সপ্রেসওয়ে, ট্রাম, এসি ইত্যাদি উন্নত পরিবহন তৈরি করে। যেমন মোবাইল কোম্পানিগুলো। একের ভেতর অনেক সেবা। এখন ঢাকায় যেটা হচ্ছে সেটা লাগামহীন। গণপরিবহন কিন্তু এন্ড টু এন্ড করা হয়নি। যাত্রীর চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটা স্টেশনে তাকে সেবা দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বাসমালিক সমিতি এবং পরিবহন শ্রমিক সমিতি সাধারণ নাগরিক বা যাত্রীদের প্রায়ই জিম্মি করে ফেলে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কেন?

শামসুল হক : গণপরিবহনের জন্মটাই সরকার এমনভাবে দিয়েছে যে সব ক্ষমতা মালিকদের হাতে। হাজার হাজার বাসমালিক। একটি কোম্পানির মালিক থাকে অন্তত চার-পাঁচজন। এর বাইরে মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইংল্যান্ডে এক মালিকে বাস সার্ভিস দেওয়া হয়। ফলে সেখানে পরিবহন মালিক সমিতির দরকার নেই। বাসের কোনো সমস্যা হলে মালিককে সহজেই সরকার ধরতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে আপনি কাকে ধরবেন? এক বাসের কয়েকজন মালিক ফলে দিনের পর দিন পরিবহন ধর্মঘট করলেও তাদের ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি দুর্ঘটনার পর জাবালে নূর এবং সুপ্রভাত বাস কোম্পানির রুট পারমিট বাতিল করা হয়। কিন্তু তারা রাতারাতি নাম বদল করে নতুন নামে একই বাস নিয়ে তারা রাস্তায় নামছে। আইনের বিধান কী বলে?

শামসুল হক : এখানে আইনের বিধান যাই থাকুক, কাজে আসবে না। কারণ তারা জানে যে বিআরটিএ, পুলিশ কেউ তাদের ধরতে পারবে না। ধরলেও সহজে ম্যানেজ করা যাবে। এতে তারা সাহস পেয়ে যাচ্ছে। ২৯ তারিখের ঘটনায় জাবালে নুরের মাত্র দুটি গাড়ির মাত্র রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু দেখুন, ওই কোম্পানির অন্তত ৫০টি মালিকের বাস আছে। আলাদা আলাদা রুট পারমিট আছে। সেগুলো বাতিল করা সম্ভব হয়নি। বিআরটিএর এ সাহসও নেই। বাতিল করতে হলে পুরো কোম্পানির সমস্তগাড়ির রুট পারমিট বাতিল করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক আইন সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কি? কেমন সংস্কার প্রয়োজন?

শামসুল হক : আইনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সংস্কার চাই। এখন ৩৫ লাখ গণপরিবহন চলছে দেশে। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আগামীতে গাড়ির চাপ বাড়বে। থাইল্যান্ডে সাড়ে তিন কোটি গাড়ি চলছে। ভিয়েতনামে ৫ কোটি। আমি মনে করি এ পরিমাণ গাড়ি আমাদের দেশে চলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক যে দক্ষতা দরকার, সেগুলোতে আমাদের কোনো স্টেক হোল্ডারের নেই। পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক কর্র্তৃপক্ষের যোগ্যতা, দক্ষতা বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান ঢেলে সাজাতে হবে। তাই বলব সরকার যে আইনটা করেছে, সেটা পরিপক্ব হয়নি। আইন করে শাসন করা যাবে না, যদি পরিকল্পনাতে গলদ থাকে।

দেশ রূপান্তর : আপনার বক্তব্যে বারবার রুট পারমিটে ত্রুটির কথা আসছে, সমস্যাটা কোথায়Ñএকটু পরিষ্কার করবেন?

শামসুল হক : যে আসে তাকেই চালানোর জন্য অনুমতির ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে এমনটা হয় না। সেখানে কেউ যদি পরিবহন সেবা দিতে চায় তাহলে টেন্ডার ডাকা হয়। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে একটা কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এই প্রক্রিয়ার কোনো বাছ-বিচার নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় যে-ই আসে, সে-ই পারমিট পেয়ে যায়।