সমাজের কল্যাণে মেরাজের শিক্ষা|133758|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:০৫
সমাজের কল্যাণে মেরাজের শিক্ষা

সমাজের কল্যাণে মেরাজের শিক্ষা

দুনিয়ার ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ‘মেরাজ’, যা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ মুজিজা এবং আল্লাহতায়ালার কুদরতের এক অপার নিদর্শন। নবী-রাসুলুদের মধ্যে একমাত্র বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এ অনন্য মর্যাদা দেওয়া হয়। যাতে তিনি সৃষ্টিকর্তার ঊর্ধ্বজগতের নিদর্শনগুলো ও তার নিয়ামত রাজি স্বচক্ষে দেখে উম্মতকে তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে পারেন।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বলোকে সফর সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তার বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছিলাম, তাকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১)

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ৫০ বছর বয়সে নবুওয়াতের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে মেরাজের বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।

ওই রাতে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবা শরিফের চত্বরে (হাতিমে) অথবা কারও মতে উম্মে হানির ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) সেখানে এসে তাকে ঘুম থেকে জাগালেন, অজু করালেন, ‘সিনা চাক’ করলেন এবং বিশেষ বাহন ‘বোরাকে’ চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছালেন। সেখানে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ‘ইমামুল মুরসালিন’ হিসেবে তার ইমামতিতে সব নবী-রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি আবার ‘বোরাকে’ চড়ে মহাকাশ পরিভ্রমণ করলেন। এ সময় বিভিন্ন আকাশে নবীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও সালাম বিনিময় হয়। এরপর সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক স্থানে পৌঁছান, যেখানে হজরত জিবরাইল (আ.) থেমে যান।

এরপর নবী করিম (সা.) একাকী ‘রফরফে’ চড়ে ‘বায়তুল মামুরে’ উপনীত হয়ে আরশে মুয়াল্লায় আল্লাহতায়ালার দরবারে উপস্থিত হন। এখানে তিনি শুধু একটি পর্দার অন্তরাল থেকে আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করেন এবং আল্লাহতায়ালার সঙ্গে একান্ত আলাপে মিলিত হন। এ সময় আল্লাহতায়ালা নবী করিম (সা.)-কে সমগ্র সৃষ্টি রহস্য বুঝিয়ে দেন এবং বেহেশত-দোজখ দেখান। সবশেষে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে আবার বোরাকে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যে ধরণির বুকে ফিরে আসেন। সংক্ষেপে এই হলো মেরাজের প্রকৃত ঘটনা।

লাইলাতুল মেরাজের ঘটনাপ্রবাহ ও প্রকৃতি এতই অস্বাভাবিক, সাধারণ মানুষের এটা বুঝে আসে না বা জ্ঞানে ধরে না। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে। হিজরতের কিছুদিন আগে মেরাজের ঘটনা ঘটে। একটি সৃজিত জাতির জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বাস্তব প্রশিক্ষণই ছিল এই মহামিলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ রাতেই অবহিত করা হয়। বস্তুত মেরাজ হলো ইসলামি গতিধারার মূল উৎস। তাই মুসলিম জাতিসত্তার জন্য নবী জীবনের মেরাজ এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।

মেরাজের উপহার সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত এক উল্লেখ আছে, মেরাজ রজনীতে নবী করিম (সা.) ও তার উম্মতের জন্য কয়েকটি জিনিস দেওয়া হয়। প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; যা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, তার উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, আল্লাহ তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। তৃতীয়ত, সুরা আল-বাকারার শেষাংশ। চতুর্থত, সুরা বনি ইসরাইলের ১৪ দফা নির্দেশনা।

যথা- ১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, তার সঙ্গে কারও শরিক না করা, ২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, ৩. আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মুসাফিরের হক মেনে চলা, ৪. অপচয় না করা, ৫. অভাবগ্রস্ত ও প্রার্থীকে বঞ্চিত না করা, ৬. হাত গুটিয়ে না রেখে সব সময় কিছু দান করা, ৭. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা না করা, অথচ আমাদের দেশে যেভাবে মানুষ হত্যা ও গুম-খুন চলছে, যা সম্পূর্ণ মেরাজের চেতনাবিরোধী, ৮. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, ৯. ব্যভিচারের নিকটবর্তী না হওয়া, ১০. এতিমের সম্পদের ধারে-কাছে না যাওয়া, ১১. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তা অনুসন্ধান করা, ১২. মেপে দেওয়ার সময় সঠিক ওজন পরিমাপ করা, ১৩. প্রতিশ্রুতি পালন করা ও ১৪. পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা না করা।

সমাজসংস্কার এবং একটি কাক্সিক্ষত সুখী-সমৃদ্ধিশালী পৃথিবী গড়তে হজরত রাসুলে করিম (সা.) মহান রবের কাছ থেকে এসব বিধিবিধান নিয়ে এসেছেন। এগুলোর অনুসরণের মধ্যে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন সফলতা নির্ভর করছে। বর্তমান সময়ের এই অশান্ত পৃথিবীর জন্য শান্তির বার্তা পাওয়া যায় বরকতপূর্ণ রাতে উম্মতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনায়। সে হিসেবে বলা চলে, আল্লাহতায়ালার দেওয়া ১৪ দফা উপহার কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে।

মেরাজের রাতে আল্লাহতায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিয়েছেন। একটি কল্যাণময় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নামাজের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ নামাজ মানুষকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত যথাযথভাবে হক আদায় করে নামাজ আদায় করা।

বস্তুত মেরাজের শিক্ষার আলোকে যদি সমাজ বিনির্মাণ করা হয়, তবে বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের অন্যায়, জুলুম, দুর্নীতি ও অশান্তি দূর হবে। দেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে- ইনশা আল্লাহ।