জাগরণের দিশা হোক পহেলা বৈশাখ|136095|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০
জাগরণের দিশা হোক পহেলা বৈশাখ

জাগরণের দিশা হোক পহেলা বৈশাখ

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার নবীনতম স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ইতিহাস-ঐতিহ্যে দুনিয়ার প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম আমাদের এই ভূখণ্ড। বঙ্গীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেছে আধুনিক বাংলাদেশে।  পুরাকালে

বিস্তৃত ভূগোলে ছড়িয়ে পড়ার কারণে একদা এই দেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল ‘বৃহৎ বঙ্গ’ হিসেবে।  হিমালয়ের পাদদেশে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার মিলিত অববাহিকার বঙ্গীয় সভ্যতা পুরাকালের বিশ্বসভ্যতায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সমৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। প্রাচ্য ইতিহাসের বিশ্লেষকরা দাবি করে থাকেন প্রাচ্যের দুই বৃহৎ সভ্যতা ভারত ও চীনের ঐতিহাসিক মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এই প্রাচীন বঙ্গ।  নৌ ও সমুদ্রবিদ্যায় পারদর্শী প্রাচীন বঙ্গের বিজয় অভিযান বঙ্গোপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল পশ্চিমের সিংহল দ্বীপ থেকে শুরু করে পূর্বের সুমাত্রা-জাভা দ্বীপ অবধি। সভ্যতার হাজার বছরের পালাবদলে ‘বৃহৎ বঙ্গ’ তার বিস্তৃতি হারিয়েছে এবং ‘বঙ্গ’ বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ নামে দুই ভাগে ভাগও হয়েছে। কিন্তু উৎসভূমিতে বঙ্গের আধুনিক রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মধ্য দিয়েই।

বাংলার এই ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বিকাশ ঘটেছে শত সহস্র বছর ধরে বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। বৈচিত্র্যকে আপন করে নেওয়ার, নতুনকে আত্মস্থ করার, বহু মত-পথের মানুষের পাশাপাশি সহাবস্থানের সহজাত সক্ষমতা বাঙালি জাতির অন্যতম শক্তি। এ কারণেই পুরাকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের ইউরোপীয় উপনিবেশ অবধি বারবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে জর্জরিত হলেও বাঙালির প্রাণশক্তি ফুরিয়ে যায়নি, বাঙালি নিজের জাতিসত্তার মূল চেতনাকে হারিয়ে ফেলেনি। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি এখনো সেই বহু বৈচিত্র্যের মিলনের চিহ্ন-সূত্র ধারণ করে চলেছে। বাংলার মাটি বাংলার জলে যারাই আসুক না কেন, বাংলা যেমন সবাইকে আপন করে নিয়েছে, তেমনি সবাইকে নিজের মতো করে গড়েও নিয়েছে। বাংলায় বিভিন্ন ধর্ম-দর্শনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে মানবতা ও মুক্তির জয়গান সেই সাক্ষ্য বহন করছে। বাংলার লোকায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতির সেইসব আখ্যান আজও আমাদের প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হলেও নতুন

পাকিস্তানি উপনিবেশের জাঁতাকলে পড়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু অন্যায্য ওই শাসনের সূচনালগ্নেই বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় বারুদ জ্বালিয়েছিল আমাদের ভাষা আন্দোলন। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা নয়, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার অসাম্প্রদায়িক চেতনাই যে বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণশক্তি, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তারই গৌরবগাথায় ভাস্বর হয়ে আছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অনেক কিছুই যেমন হারিয়ে গিয়েছে, অনেক কিছুই ম্লান হয়েছে, অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার বাঙালির নবজাগরণের বিকাশে সে সবের অনেক কিছু ফিরেও আসছে।

অধুনা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নাগরিক উদ্দীপনা তেমনি এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা জাগানিয়া বার্তা বহন করছে। বাংলাদেশ বহু সংস্কৃতির মিলনের এমন এক দেশ যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সামাজিকভাবে এবং ব্যক্তিজীবনেও মানুষ তিনটি পঞ্জিকা ব্যবহার করে থাকে ইংরেজি বা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি, আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জি এবং বঙ্গাব্দ বাংলা বর্ষপঞ্জি। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে গ্রামীণ জীবনে বাংলা পঞ্জিকার বহুল ব্যবহার থাকলেও নাগরিক জীবনে তা প্রায় অগোচরেই থাকে। কিন্তু বিগত দশকগুলোতে নাগরিক বর্ষবরণের উৎসবের ব্যাপক প্রসার এই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। পহেলা বৈশাখের উৎসব এখন ঈদ-পূজা-বড়দিন-বুদ্ধপূর্ণিমার মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোর পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বাংলা নববর্ষ বরণের প্রভাতি অনুষ্ঠান আর সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোগ এই নাগরিক উৎসবকে সামনে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই দুটি আয়োজনের সাফল্য আমাদের এই বার্তাও দিচ্ছে যে, সাংস্কৃতিক জাগরণ যে কোনো বড় সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম পূর্ব শর্ত।

মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আগামীর বাংলাদেশের যে রূপরেখা আমরা দেখতে চাই, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি তার অন্যতম ভিত্তি হোক সাংস্কৃতিক জাগরণ। যে জাগরণে বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। যে জাগরণ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরও বিকশিত করবে। যে জাগরণ বাংলাদেশ নিজস্ব সংস্কৃতি, মনন ও দর্শন নিয়ে বিশ্ব দরবারে আরও মর্যাদার আসনে আসীন হবে এবং বিশ্ববাসীকে মানবতা ও মুক্তির পথ দেখাবে।