জেল থেকে নুসরাত হত্যার নির্দেশ দেন সিরাজ|136153|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০
জেল থেকে নুসরাত হত্যার নির্দেশ দেন সিরাজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

জেল থেকে নুসরাত হত্যার নির্দেশ দেন সিরাজ

কারাগারে থেকে ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে উপজেলার ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা খুনের নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাদের ভাষ্য, দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যা করা হয়েছে। পরিকল্পনা হয় মাদ্রাসার হোস্টেলে। হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বোরকা পরা চারজনের তিনজনই ছিল ছেলে। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পিবিআইয়ের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার।

পিবিআইপ্রধান বলেন, ‘গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন। কারাগার থেকেই সিরাজ নির্দেশ দেন নুসরাতকে হত্যার। অধ্যক্ষের নির্দেশ বাস্তবায়নে ৫ এপ্রিল রাতে মাদ্রাসার হোস্টেলে বৈঠক করে খুনিরা। ওই বৈঠকেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। এই প্রস্তাব অন্যরা গ্রহণ করে কীভাবে হত্যা করা হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা করে নূর উদ্দিন ও শামীম। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরের দিন সকাল থেকেই তিনটি গ্রুপে ভাগ হয় খুনিরা। একটি গ্রুপ মাদ্রাসার ভেতরে সাইক্লোন শেল্টারের টয়লেটে, একটি গ্রুপ মাদ্রাসার পরীক্ষাকেন্দ্রের পাশে এবং আরেকটি গ্রুপ মাদ্রাসার বাইরে গেটের সামনে অবস্থান নেয়।’

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া একটি মেয়ের দায়িত্ব পড়ে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন তেল আনা। সে ঘটনার দিন সকালেই মাদ্রাসায় তিনটি বোরকা ও কেরোসিন তেল পলিথিনের ব্যাগে নিয়ে আসে। সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সাইক্লোন শেল্টারে ক্লাস হওয়ার সময় শাহাদাত হোসেন শামীমের কাছে এগুলো হস্তান্তর করে ওই মেয়ে। পরে ওই মেয়েসহ চারজন সাইক্লোন শেল্টারের ওপরে দুটি টয়লেটের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছু সময় আগে শম্পা বা চম্পা নামের এক মেয়ে নুসরাতকে বলে ওপরে নিশাতকে মারধর করছে। নুসরাত দ্রুত ছাদে উঠলে সেখানেই ওই চারজন মিলে নুসরাতকে ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই তারা পালিয়ে যায়। ওই চারজনের তিনজনই ছিল ছেলে।

পিবিআইয়ের ভাষ্য, ঘটনার দিন সকাল থেকেই পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে নুরুদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি দল গেট পাহারা দিতে থাকে। এ ছাড়া আরও একজন ভেতরে ছিল। নুসরাতের শরীরে আগুন লাগানোর পর হত্যাকারীরা অন্যান্য পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সহজেই পালিয়ে যায়।

গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই জানায়, নুসরাত খুনের পেছনে দুটি কারণ ছিল। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করে নুসরাত আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করে তার সহযোগীরা। আরেক কারণ হলো, শামীম দীর্ঘদিন ধরে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। নুসরাত তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই ক্ষোভ থেকেই শামীম তাকে পুড়িয়ে হত্যার প্রস্তাব দেয়। 

বনজ কুমার জানান, নুসরাতের হত্যাকারীদের ধরতে পিবিআইয়ের ছয়টি ইউনিট কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ১৩ জনের মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত সাত আসামি এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলার এজাহারভুক্ত গ্রেপ্তারকৃত সাতজন হলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৫), মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন (২০) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯) ও আফসার উদ্দিন (৩৫)। এজাহারে নাম উল্লেখ থাকা হাফেজ আবদুল কাদের পলাতক। বাকি পাঁচজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সন্দেহভাজন যে ছয়জন গ্রেপ্তার আছেন, তারা হলেন কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ও আলাউদ্দিন।

পিবিআইয়ের প্রধান বলেন, এর আগেও নুসরাতের মুখে চুন মারার পর সে ঘটনা সামলে নেয় আসামিরা। তারা ভেবেছিল, এবারও ঘটনাটি সামলে নেবে।

গত ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তার নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় থানায় মামলা করলে গ্রেপ্তার হন অধ্যক্ষ। আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতকে ৬ মার্চ পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে সাইক্লোন শেল্টারে কৌশলে ডেকে নিয়ে শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন। তার শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা অবস্থায় গত বুধবার রাতে মৃত্যু হয় নুসরাতের।