রামের নামে উত্তপ্ত চৈত্র শেষে ভোটবাজার|136158|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০
রামের নামে উত্তপ্ত চৈত্র শেষে ভোটবাজার
সিদ্ধার্থ কাশ্যপ, কলকাতা

রামের নামে উত্তপ্ত চৈত্র শেষে ভোটবাজার

শেষ চৈত্রের ঠা-ঠা গরমে যখন পারদ স্তর ছত্রিশ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই, তখন ভোটের বাজারে আরও উত্তাপ বাড়াল রামনাম। কলকাতাসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় ঘটা করে রামনবমী পালনের ডাক আগেই দিয়ে রেখেছিল বিজেপি এবং সংঘ পরিবার। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে শোভাযাত্রা হবে। বের করা হবে সশস্ত্র মিছিল, বাইক মিছিল।

এই নিয়ে যাবতীয় বিতর্ক, বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে শনিবার তেমনটাই হলো। রামের নামে গেরুয়া রঙের জোয়ার তুলে এদিন ভোট প্রচারে বাড়তি শান দিয়ে নিল বিজেপি। আর একবার হিন্দুত্বের ঝড়ো বাতাস লাগিয়ে নিল নির্বাচনের পালে। খোদ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ খড়গপুরে তলোয়ার, গদা নিয়ে রামনবমীর মিছিল করলেন। গেরুয়া বসন আর পাগড়ি-শোভিত হয়ে ঘুরলেন আখড়ায় আখড়ায়। মেদিনীপুর সংসদীয় কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী তিনি। কলকাতা উত্তরের বিজেপি প্রার্থী তথা দলের অন্যতম কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিনহাও নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রে  বের করলেন বিশাল শোভাযাত্রা। যাতে প্রদর্শিত হলো দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির রামভক্তির বর্ণাঢ্য ছবি। রাহুলের দাবি, ভারতবাসী মানেই রামভক্ত। ছবিতে লেখা ছিল : ‘আমাদের রামভক্ত রাষ্ট্রপতির জন্য আমরা গর্বিত।’

সদ্য তৃণমূল কংগ্রেস ছুট যাদবপুরের বিজেপি প্রার্থী অনুপম হাজরার নেতৃত্বে গড়িয়া থেকে বের হয়ে নগর পরিক্রমা করে রামনবমীর গেরুয়া মিছিল। শুধু শহর কলকাতা নয়, এমন ছবি এদিন উঠে এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকেও।

নির্বাচনী প্রচারের সময় কোনো রকম ধর্মীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার বিধিবহির্ভূত। এই যুক্তি তুলে ধরে গেরুয়া শিবিরের এই কর্মসূচির বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেস ও বামেরা। আপত্তি তুলেছিল রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসও। কিন্তু এসব আপত্তি ধোপে টেকেনি। নির্বাচন কমিশন শুধু রাজ্য সরকারের অনুরোধ মেনে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এক কোম্পানি করে বাড়তি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠিয়ে দেয় ব্যারাকপুর ও আসানসোলে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারের সময় এমন ধর্মীয় উৎসবের জিগির তোলা নিয়ে বিশেষ হেলদোল দেখা যায়নি কমিশনের কর্তাদের মধ্যে।

তবে বিরোধীদের যাবতীয় যুক্তি এক কথায় নস্যাৎ করে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রা এদেশের ঐতিহ্য। ভোট বলে, রাজ্য সরকার চাইছে না বলে এই সাংস্কৃতিক পরম্পরা ছেড়ে দেব এটা হতে পারে না।’ এই সঙ্গে তার হুঙ্কার, ‘রামনবমী পালনে বাধা দিলে তার ফল ভয়ঙ্কর হবে।’

শুধু বিজেপি নয়, ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সশস্ত্র মিছিলে রামনবমী পালনের ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পূর্ব ভারতের সংগঠন সম্পাদক শচীন্দ্রনাথ সিংহও। বলেছেন, ভোটের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এসব কর্মসূচিতে বিজেপি নেতাকর্মীরাও থাকবেন বলে স্বীকার করে নিয়েও তার মন্তব্য, ‘এরা আসবেন ব্যক্তিগতভাবে, দলের হয়ে নয়।’

সব মিলিয়ে এদিন রামের নামে সরগরম ভোটের বাজার। বাড়তি উত্তাপ। নির্বাচনকে পটভূমিতে রেখে ধর্মের খোলস সাজিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির যে উৎসব পালিত হলো এদিন, বলাবাহুল্য, তাতে শামিল হলো রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলও। বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র জমিও বিজেপিকে ছাড়তে বাজি নয় তারা তা সে লড়াইটা যে মাঠেই হোক। বিজেপিকে হিন্দুত্বেও টেক্কা দেওয়ার জন্য রামনবমীতে শামিল হলেন তৃণমূলের প্রার্থী, নেতাকর্মীরা।

বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদের মোকাবিলায় ‘নরম হিন্দুত্ব’ শব্দযুগল ইদানীং বড় বেশি শোনা যাচ্ছে ভারতের রাজনীতিতে। রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, গেরুয়া শিবিরের মোকাবিলায় একেই আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। তারাও যে হিন্দুত্বের মাপকাঠিতে কোনো অংশে কম নন, সে কথা সম্প্রতি বারংবার উচ্চারিত হতে শোনা গেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে। অন্যদিকে হিন্দুত্বের ওপর বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্যকে খর্ব করতে মন্দিরে-মন্দিরে ঘুরতে হয়েছে রাহুলকে।

রাজনৈতিক পন্ডিতদের মতে, বিজেপির জিত এখানেই। রাহুল হোক বা মমতা, রাজনীতির খেলায় তাদের নিজের মাঠে টেনে আনতে পেরেছে বিজেপি। ধর্মের গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে খেলাটা এখন তাদের হোমগ্রাউন্ডে। ফলে অ্যাডভান্টেজ বিজেপিই।

এদিনও রামনবমী নিয়ে যতই মাতুন তৃণমূল নেতানেত্রীরা, ভোটের বাজারে লাভটা ওঠাল বিজেপিই। এমনটাই মত পর্যবেক্ষকদের। এই বাংলায় বাম-কংগ্রেসের জমি কেড়ে বিজেপির উত্থানের নেপথ্যে যে কারণগুলো ক্রিয়াশীল তার মধ্যে অন্যতম যে প্রতীকী হিন্দুত্বের উগ্র-গরিমা সে কথাটি খুব ভালো বোঝেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানেন, হিন্দুত্বের ভাবাবেগকে উসকে দিয়ে এই রাজ্যের জমিতে অনেকটাই শিকড় ছড়িয়ে নিতে পেরেছে বিজেপি। ফলে এর মোকাবিলায় নিজেকে একজন একনিষ্ঠ হিন্দু হিসেবে তুলে ধরতে তাকে একাধিক সভায় একনাগাড়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়েছে, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বাণী, হিন্দুত্বের প্রকৃত আদর্শ ব্যাখ্যা করতে দেখা গেছে। এই বাংলার ৭০.৫৪ শতাংশ হিন্দুর সামনে নিজের মুসলমান-তোষণের ‘বদনাম’ মুছে দিয়ে ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তার এই নিরলস প্রয়াসের নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছে বিজেপিকে তাদের নিজের তৈরি খেলায় টেক্কা দেওয়ার তাগিদ।

উভয় শিবিরের এহেন তাগিদের সূত্রেই রামনবমী, গণেশ চতুর্থীর মতো ধর্মীয় উৎসবগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে যেমনটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।