মাছ বিক্রেতা-রিকশাচালক এখন এমবিবিএস ডাক্তার!|136512|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:০৬
মাছ বিক্রেতা-রিকশাচালক এখন এমবিবিএস ডাক্তার!
সরোয়ার আলম

মাছ বিক্রেতা-রিকশাচালক এখন এমবিবিএস ডাক্তার!

ওয়ালী উল্লাহ রেজা। যশ-খ্যাতিসম্পন্ন এমবিবিএস চিকিৎসক হিসেবেই এলাকায় বেশ নামডাক তার। ‘শিশুদের’ রোগ বিশেষজ্ঞ তিনি। আট বছর ধরেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফার্মেসি ও প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখেন। তাকে দেখানোর সিরিয়াল নিতে তদবিরও করতে হয় রোগী ও স্বজনদের। অথচ তিনি এসএসসি পাস! কোনোরকম সনদ ছাড়াই হয়ে উঠছেন চিকিৎসক। র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পর থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। তার প্রকৃত পরিচয় জেনে হতবাক হয়ে পড়েন রোগীরা।

সম্প্রতি ভুয়া চিকিৎসক হিসেবেই তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এভাবেই ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত সহস্রাধিক ভুয়া চিকিৎসকের কাছে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা অসহায় মানুষ। তাদের দৌরাত্ম্যে অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা।

এদিকে ভুয়া চিকিৎসকদের প্রতারণা ঠেকাতে আগামী মাসে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) জোরালো অভিযানে যাচ্ছে। এরই মধ্যে এ দুুটি সংগঠন চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছে প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন ও মোবাইল নাম্বার দিতে। এগুলো কেউ ব্যবহার না করলে চিকিৎসকদের সনদ স্থগিত করা হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া চিকিৎসকদের কারণে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের সঙ্গে অপকর্ম করছেন। সনদ না নিয়েই তারা এমবিবিএস চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন। বিএমডিসির মাধ্যমে আমরা প্রকৃত চিকিৎসকদের বলে দিয়েছি প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন ও মোবাইল নাম্বার দিতে হবে। এখনো অনেকে ব্যবহার করেন না বলে অভিযোগ এসেছে। তবে আগের চেয়ে প্রকৃত চিকিৎসকদের সচেতনতা বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী মাস (মে) থেকে আমরা জোরালো অভিযানে যাব। প্রেসক্রিপশনে রেজিস্ট্রেশন ও মোবাইল নাম্বার না দিলে সনদ স্থগিত করা হবে।’ বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সম্প্রতি র‌্যাব ও পুলিশের অনুসন্ধানে ভুয়া চিকিৎসকদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে অনেক। এতে দেখা গেছে, এক সময়ে মাছ বিক্রেতা বা রিকশাচালকরা পর্যন্ত নিজেদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অনেকের লেখাপড়ার দৌড় অষ্টম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত। পাড়া-মহল্লার ফার্মেসি ও ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই তাদের আস্তানা। সনদ ছাড়াই তারা নামিদামি চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নজরদারি না থাকায় তারা অপকর্ম করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা মনে করছেন।

পুলিশ ও র‌্যাবের একটি প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়,  সরকারি হাসপাতালগুলোর আশপাশে মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই চিকিৎসকরা বেশি প্রতারণা করছেন। ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরেও এর প্রকোপ বেশি। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের পরিবার প্রতারণার শিকার হচ্ছে। ডাক্তারি সার্টিফিকেট না থাকলেও চিকিৎসক সেজে দিব্যি রোগী দেখছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর বাইরে সক্রিয় দালাল চক্র।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী সরকারি হাসপাতালে ঢুকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন দালাল চক্রের চক্রান্তে। বুঝিয়ে শুনিয়ে দালালরা ভুয়া চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যায় রোগীদের। অনেক সময় প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তারা করে বসেন নানা অপারেশন। কয়েক বছরে বিভিন্ন স্থানে ধৃত ভুয়া চিকিৎসকরা স্বীকার করেছেন, তাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেটও নেই। অথচ অপারেশন পর্যন্ত করছেন তারা।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত সহস্রাধিক ভুয়া চিকিৎসক সক্রিয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকৃত চিকিৎসকদের নামও ব্যবহার করেন। ওইসব ভুয়া চিকিৎসকের সঙ্গে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও ফার্মেসি মালিকদের রয়েছে গভীর সখ্য। তারা সবকিছু জেনে রোগী দেখার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এমনকি অসাধু পুলিশ সদস্যদের সঙ্গেও তাদের সখ্য আছে। ডাক্তারি পেশায় আসার আগে কেউ কেউ মাছ বিক্রেতা থেকে শুরু করে রিকশা পর্যন্ত চালিয়েছিলেন। র‌্যাব বা পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশকিছু ভুয়া চিকিৎসককে সাজা দিয়েছে। কিন্তু দণ্ডিত চিকিৎসকরা জামিন নিয়ে বের হয়ে ফের ওইসব অপকর্ম চালাচ্ছেন। ঢাকার রাস্তা-ফুটপাত, বাজার, স্টেশনগুলোতেও আছেন ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক। ওইসব চিকিৎসক কিডনি, এইডস এবং বিনা অপারেশনেই অর্র্শ্ব-ভগন্দরসহ নানারকম জটিল রোগ নিরাময়ের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।

মহাখালীতে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসা চালাচ্ছেন ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক তুফান মিয়া। তিনি রাস্তায় লোকজন জড়ো করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেন। তার অদ্ভুত কথাবার্তা শুনে কেউ হাততালি দেন, আবার কেউ পড়েন গভীর চিন্তায়। বিশেষ করে সব ধরনের যৌন রোগসহ এইডসের ভয়াবহ বর্ণনা তুলে ধরেন তুফান মিয়া। এসবের সমাধানও আছে তার কাছে বলে প্রচার করতে থাকেন। তুফান মিয়ার মতোই রাস্তাঘাটে ভুয়া চিকিৎসক লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা করছেন।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, মোল্লা সামসুদ্দিন আহম্মেদ নামে এক ভুয়া মেডিসিন চিকিৎসক দেড় বছর ধরে গাজীপুরের জয়দেবপুরে সুপ্রিম স্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করছিলেন। শ্রমিকদের উল্টোপাল্টা প্রেসক্রিপশন দিলে বিদেশি ক্রেতাদের সন্দেহ হয়। তারা গার্মেন্টস মালিককে অবহিত করেন। মালিক ওই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন। তার সনদ দেখতে চান। মালিককে সনদও দেখান। তারপরও ক্রেতাদের মন ভরেনি। পরে কর্তৃপক্ষ র‌্যাবের শরণাপন্ন হন। র‌্যাব অভিযান চালায়। সামসুদ্দিন র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেন তিনি কোনো চিকিৎসক নন। এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। একসময় তিনি রিকশা চালাতেন।

বছর দশেক আগে আশুলিয়ায় এক ফার্মেসির মালিকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর চিকিৎসক হয়ে যান। গার্মেন্টসে তার বেতন ছিল ৬০ হাজার টাকা। আশুলিয়ায় আধুনিক হসপিটালের মালিক সামসুদ্দিন। প্রায় সাত বছর ধরেই তিনি এসব অপকর্ম করছেন।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রতন কৃষ্ণ মজুমদার একসময় ছিলেন খুলনার মাছ বিক্রেতা। পড়ালেখা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। অথচ তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে পরিচিত একজন ‘অর্থোপেডিক সার্জন’ হিসেবে। স্থানীয় একটি ক্লিনিকে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসার নামেই অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন। এমনকি তিনি রোগীর শরীরে ড্রিলমেশিন দিয়ে ফুটো করে কথিত অপারেশন করতেন। বছর চারেক আগে তাকে গ্রেপ্তার করে তিন বছরের সাজা দিয়েছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু মাসখানেক পর জামিনে বেরিয়ে যান তিনি।

বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হসপিটালে দীর্ঘদিন ধরেই ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন মো. সেলিম, রনি শিকদার ও শাহরিয়ার ইমন, শ্যামলী ক্রিসেন্ট হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মোহাম্মদ হাসান ও মোহাম্মদ আনোয়ার, কক্সবাজারের ফেমাস ডেন্টাল কেয়ার ও ওরাল ডেন্টাল কেয়ারে ডা. এম নজরুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ, আশরাফউদ্দিন হায়দার, শাখাওয়াত হোসেন, ঢাকার মোহাম্মদপুরে নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতালে বিআর আহম্মেদ শরীফ ও কক্সবাজারের আশা মেডিকেল হলে কমল কান্তি ভট্টাচার্য, মোহাম্মদপুরে টেকনো হাসপাতালের ‘ডা. এম কে পাল (এমবিবিএস, ঢাকা; বিএইচএস (আপার), ডিএমইউ (ঢাকা), পিজিটি (মেডিসিন, হƒদরোগ ও বাতজ্বর), সনোলজিস্ট ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার), একই এলাকার মহানগর হাসপাতালের ডা. আতিয়ার, মেডিল্যাব হাসপাতালের ডা. মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ডা. আবদুল মালেক, মিরপুরে পিসিল্যাবের ডা. গোলাম কিবরিয়া প্রমুখ দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন।

তারা সবাই ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক। তাদের বিএমডিসির সত্যয়ন না থাকলেও তারা ভুয়া সনদ তৈরি করে অপকর্ম চালাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের সাজা দিয়েছে। কিছুদিন সাজা খেটে আবার একই কারবার চালাচ্ছেন বলে তথ্য এসেছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া চিকিৎসকদের প্রতিরোধ করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। পাশাপাশি র‌্যাবও কাজ করছে। প্রতারকরা চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। ভুয়া চিকিৎসকদের প্রতিরোধ করতে ঢাকার ৫০টি থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভুয়াদের প্রতিহত করতে চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়ে চলেছে। তাদের দমন করতে র‌্যাবের একাধিক টিম কাজ করছে। ঢাকাসহ সারা দেশে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। ওইসব চিকিৎসক পড়ালেখা জানে না বললেই চলে। অথচ তারা ‘এমবিবিএস’ ডিগ্রিধারী চিকিৎসক। তাদের কারণে আসল চিকিৎসকদের বদনাম হচ্ছে। তাদের প্রতিরোধ করতে বিএমডিসি ও বিএমএকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ও ডিজিটাল কিউআর কোড ব্যবহার করলে ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশ কমে আসবে বলে তিনি আশা করেন।