এখনকার আমি দর্শকের খুব প্রিয়|142735|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০
এখনকার আমি দর্শকের খুব প্রিয়
মাসিদ রণ

এখনকার আমি দর্শকের খুব প্রিয়

একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যব্যক্তিত্ব ড. ইনামুল হক। দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাড়া জাগানো নাটকে অভিনয় করেছেন। এখনও নিয়মিত দাঁড়ান ক্যামেরার সামনে। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কিছু দিক নিয়ে মাসিদ রণ’র সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। ছবি : নূর

এই পর্যায়ে এসে জীবনকে কীভাবে দেখেন?

জীবনের সার্থকতার পেছনে যে জিনিসগুলো কাজ করে তা হলোÑ নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা ও একাগ্রতা। এই জিনিসগুলো যদি নিজের মধ্যে ধারণ করা যায়, তাহলে সার্থক একটি জীবন পাওয়া যায়। আমিও অল্প বয়স থেকে এই জিনিসগুলো মূল্যায়ন করেছি এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করেছি।

 

আপনার ছোটবেলা বলতে এখন কী মনে আসে?

সভ্য মানুষ হওয়ার জন্য এবং সুস্থ মনন তৈরির জন্য যে ধরনের পরিবেশ দরকার, তা আমাদের বাড়িতে ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই স্বকীয়তা তৈরি করা, নিজেকে মূল্যায়ন করা, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়াÑ এ বিষয়গুলো আমার মধ্যে ছিল। একটা ঘটনা বলিÑ আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। এক দিন আমি আর আমার ফুপা বসে আছি। এক লোক এসে ফুপার সঙ্গে গল্প করছেন। একপর্যায়ে তিনি ফুপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি তার কে হই।’ ফুপা বললেন, ‘আমার শালার ছেলে’। আমি তো সত্যিই ফুপার শালার ছেলে। কিন্তু ‘শালা’ কথাটা যে খারাপ তা আমি ওই বয়সেই অনুধাবন করতাম। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ফুপুকে কেঁদে কেঁদে বললাম, ‘ফুপা যেন আমাকে কখনো শালার ছেলে না বলেন!’ এই শিক্ষা আসলে ঘরের মধ্যেই তৈরি করতে হয়। এখন আমি নাটকের প্রয়োজনে অনেক আজে বাজে সংলাপ বলি, পরে খুব খারাপ লাগে। পারতপক্ষে আমি গালাগাল শুনতে বা বলতে অভ্যস্ত নই।

 

আপনি হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটক করতে গিয়ে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন...

নাটকটির নাম ‘নক্ষত্রের রাত’। আমি যে চরিত্রটি করেছিলাম, সে তার আর্থ-সামাজিক অবস্থার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পতিতাদের দালাল হয়ে যায়। এমনকি নিজের মেয়েকে পর্যন্ত এই লাইনে নামায়। চরিত্রটি করার কথা ছিল আমার ছাত্র তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক ও অভিনেতা মোজাম্মেলের। কিন্তু সে ভেবেছিল ছাত্রদের কাছে তাকে ইমেজ সংকটে পড়তে হবে। পরে হুমায়ূন আমার ব্যাপারে মোজাম্মেলকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো করলে না, এবার তোমার গুরুর কাছে যাচ্ছি। দেখবে তিনি ঠিকই লুফে নেবেন।’ আমিও তখন বুয়েটের শিক্ষক। কিন্তু আমাকে প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যাই। কারণ আমি সব সময় আধুনিক চিন্তার মানুষ। আমাদের দেশে না হলেও এ ধরনের চরিত্র বিদেশি নাটকে আমি অনেক পড়েছি। তা ছাড়া আমি জানিÑ এটি একটি শিল্পকর্ম। এটা তো আমি বাস্তবে করছি না। আর শিল্প তৈরি হয় আমাদের চারপাশের বিষয়বস্তুর অনুপ্রেরণায়। ফলে সমাজকে যথার্থভাবে তুলে ধরতে গেলে তো এই নেতিবাচকতা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। নাটকটি সে সময় ব্যাপক আদৃত হয়। আর আমার সাহসিকতার জন্য ছাত্ররা খুব প্রশংসা করে।

 

আপনাদের দল ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’ নিয়ে কিছু বলুন...

একসময় মঞ্চই ছিল ধ্যান-জ্ঞান। প্রচুর সময় দিয়েছি। এখন সরাসরি মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত নেই। বয়স ৭৫ পেরিয়েছে, তাই মঞ্চে যে এনার্জি নিয়ে কাজ করতে হয় তা খুঁজে পাই না। এখন আমার স্ত্রী লাকী ইনাম, দুই মেয়ে হৃদি হক ও পৈত্রী হক, ছোট মেয়ের স্বামী সাজু খাদেম দলের জন্য নিয়মিত কাজ করছে। বিশেষ করে লাকী আর হৃদির জন্য সুবিধা হলোÑ তারা সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গ যেমন নাচ, গান, অভিনয় সবই শিখে এসেছে। সুতরাং কাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তারা ভালো বোঝে।

 

জীবনসঙ্গী লাকী ইনামের সঙ্গে সম্পর্কের শুরুর গল্পটি শুনতে চাই...

আমি মাত্র ২২ বছরে বুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করি। পেশাজীবনে চার-পাঁচ বছর পেরোতেই বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসতে লাগল। সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও প্রেমের সম্পর্ক ছিল না আমার। ফলে বউ খোঁজার দায়িত্ব পড়ল বাড়ির ওপরেই। মামার কথামতো লাকীকে দেখতে যাই। তখন সে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। বাগদানের ছয় মাস পর আমাদের বিয়ে হয়। সময়টা তখন খুব ভালো নয়, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭০। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অল্প কিছুদিন আগের ঘটনা। এ জন্য আমরা কখনো বিবাহবার্ষিকী পালন করি না। এ রকম ছোট ছোট জিনিস মেনে চলেছি বলেই হয়তো আজও মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি।

ছুটির দিনগুলোতে ঢাকা থেকে বাসে চড়ে কুমিল্লা যেতাম। আমাদের বিয়ের পর পাঁচ বছর কুমিল্লাতে ছিলাম। তখন আমরা সচেতনভাবেই কোনো সন্তান নিইনি। কারণ ওখানে জন্ম নিলে সন্তান বাই বর্ন একটা টান অনুভব করবে। পরে ঢাকায় এসে আমাদের ঘরে হৃদি ও পৈত্রী আসে। তারাও বিয়ে করেছে দুই অভিনেতাকে। সব মিলিয়ে তারা বেশ ভালো করছে। আমরা সবাই পাশাপাশি থাকি।

 

প্রিয় সহশিল্পীদের নিয়ে কিছু বলুন...

সবার সঙ্গেই খুব ভালো সখ্য আমার। তবে বিশেষ করে বলতে হয় সৈয়দ হাসান ইমাম ভাইয়ের কথা। তার নির্দেশনায় অনেক কাজ করেছি। ফেরদৌসী মজুমদার, এটিএম শামসুজ্জামান আর দিলারা জামান আমার সমবয়সী। তাদের সঙ্গেও কাজ করতে ভালো লাগে। এ ছাড়া ডলি জহুর, লতার সঙ্গেও অনেক কাজ করেছি। আর আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় আমার সব সময় ভালো লাগে।

 

আবুল হায়াতের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুঞ্জন শোনা যায়। বিষয়টি স্পষ্ট করবেন?

আসলে বিষয়টি তেমন কিছু নয়। আমরা বন্ধুই বলা যায়। ওর সঙ্গে অনেক কাজ করেছি মঞ্চে। ইনফ্যাক্ট মঞ্চে সে খুব ভালো অভিনয় করত। এক কথায় বলতে গেলে সাবলীল অভিনয় করত। কিন্তু টেলিভিশনে যে একই ধারার অভিনয় করে চলেছে, কোনো বৈচিত্র্য নেই। তবে এ ক্ষেত্রে দায়ী পরিচালকরা। তারা ওর কাছে শুধু ওই ধরনের চরিত্রই নিয়ে যায়। এ ছাড়া দর্শনগত দিক দিয়েও আমাদের কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে তা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

 

জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে শুনতে চাই...

আমি নিজেকে খুবই প্রতিভাবান শিল্পী মনে করি না। তবে আমি কিছু নিয়ম পালন করে এসেছি আজীবন, যা আমাকে আজকের আমিতে রূপদান করেছে। এই আমি দর্শকের খুবই প্রিয়। এখনকার অনেক তারকার পাশে একই সঙ্গে অনেক পাবলিক প্লেসে গিয়ে দেখেছি, দর্শক আমাকেই বেশি ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে। সরকার আমাকে একুশে পদকে ভূষিত করে মনে করিয়ে দিয়েছে আমিও দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছি। আর অপ্রাপ্তি বলতেÑ আমার অনেক সময় মনে হয়েছে আর একটু শারীরিকভাবে যদি লম্বা হতাম, তাহলে হয়তো আরও উচ্চতা ছুঁতে পারতাম। তবে সব মিলিয়ে আমি খুশি।