সাইফুলের উত্থান পতন|146204|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ জুন, ২০১৯ ০০:০০
সাইফুলের উত্থান পতন
  আবদুল আজিজ, কক্সবাজার

সাইফুলের উত্থান  পতন

কক্সবাজারের শুধু নয়, পুরো দেশের ‘ইয়াবা সাম্রাজ্যের রাজা ও ইয়াবা ডন’ হিসেবে পরিচিত টেকনাফের হাজি সাইফুল করিম গতকাল শুক্রবার ভোররাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াবা কারবারের    

মাধ্যমে নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি। অভিযোগ আছে, এই কারবারের জন্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন বিশেষ সখ্য। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে দেশের ‘নামকরা ব্যক্তিদের’ সঙ্গেও তার দহরম-মহরম সম্পর্ক। যেখানে ১০ বছর আগেও তার পরিবারের ‘নুন আনতে পান্তা পুরিয়ে যাওয়া’র মতো অবস্থা ছিল।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের শিলবুনিয়াপাড়ার মো. হানিফ প্রকাশ হানিফ ডাক্তারের ছয় ছেলের মধ্যে মেজ সাইফুল করিম। স্থানীয় এই পল্লী চিকিৎসকের আছে দুই মেয়ে। ১৯৯৪ সাল থেকে স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি টেকনাফ হাই স্কুলের সামনে বাবার ফার্মেসিতে বসতেন তিনি। এসএসসি পাসের পর উচ্চশিক্ষার আশায় পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম মহসিন কলেজে পড়ার সময় নগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকায় টেকনাফের বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে পণ্য বিক্রিতে সহায়তা করে খরচ জোগাতেন তিনি। এভাবেই কোনোরকম দিন চলত তার। তবে তার অভাব-অনটন বেশি দিন ছিল না। ধীরে ধীরে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে এক পর্যায়ে পরিচিতি পান দেশের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হিসেবে।

যেভাবে উত্থান : সাইফুল করিমের দাদাবাড়ি মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু থানা এলাকায়। সেখানে থাকার সুবাদে মংডুর ইয়াবা ডন খ্যাত মিয়ানমারের মোস্ট ওয়ান্টেড ‘মগা সুইবিন’ নামে এক আন্তর্জাতিক ইয়াবা কারবারির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। যার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০০ সালে টেকনাফ স্থলবন্দরে এসকে ইন্টারন্যাশনাল নামে আমদানিকারক ও ‘সিঅ্যান্ডএফ’ ব্যবসা শুরু করেন সাইফুল করিম। এই সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায় মিয়ানমার থেকে বেশিরভাগ কাঠ আমদানি করতেন তিনি। ওই কাঠ আমদানির আড়ালে ইয়াবার প্রথম চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসেন তিনি। ওই সময়ে ইয়াবা ট্যাবলেট সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন ধারণা না থাকায় ক্রমেই বাড়াতে থাকেন ইয়াবার কারবার। দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিচিতি পান ‘মাফিয়া সাইফুল’ হিসেবে। ২০০১ সালে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফ বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তার বোনকে বিয়ে করে টেকনাফ স্থলবন্দর নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। সে সময় টেকনাফের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ; যার আধিপত্য কাজে লাগিয়ে স্থলবন্দরে মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানির আড়ালে কৌশলে ইয়াবা আমদানি শুরু করেন তিনি।

ক্ষমতার পালাবদলে ‘হাত করে নেন’ বদিকে : ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর কৌশলে ভোল পাল্টে ‘হাত করে নেন’ আলোচিত-সমালোচিত উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সাংসদ আব্দুর রহমান বদিকে। অভিযোগ আছে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক ইয়াবার চালান বাংলাদেশে এলেও কেউ টু শব্দ করেনি। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কিছু কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ সাইফুল করিমকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে থাকেন। স্থল ও নৌপথে পাচার হওয়া সাইফুলের ইয়াবার চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সংস্থাই আটকের সাহস পেত না বলেও অভিযোগ আছে।

যেভাবে আসত ইয়াবা চালান : জানা গেছে, টেকনাফ স্থলবন্দরে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে মিয়ানমার থেকে কাঠ আমদানির আড়ালে ইয়াবার চালানের বিষয়টি যখন ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে শুরু করে, তখন রুট পরিবর্তন করে সাগরপথে মাছ ধরার ট্রলারে ইয়াবার চালান এনেছেন সাইফুল করিম। ওসব ইয়াবার চালান খালাস করা হয় চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে। চট্টগ্রামের বন্দর ও কোতোয়ালি থানার কতিপয় অসৎ পুলিশ পাহারা দিয়ে হাজি সাইফুলের ইয়াবার চালান গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেন। একের এক ইয়াবার চালান কারবারে সফল হওয়ায় তার ওপর বিশ^াস জমতে থাকে মিয়ানমারের ইয়াবা উৎপাদনকারীদের। এক পর্যায়ে মিয়ানমারে স্থাপিত ৩৮টি কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবা বিক্রির বাংলাদেশের একমাত্র এজেন্ট হন সাইফুল করিম। এভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও অঢেল টাকা জমানো ছাড়াও ইয়াবা কারবারির সুবিধার্থে হাজি সাইফুল মিয়ানমার-বাংলাদেশ চলাচলের জন্য একাধিক জাহাজ কেনেন। যদিও কাগজে-কলমে সাইফুল করিম টেকনাফ স্থলবন্দরের একজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী।

যেভাবে পতন : একের পর এক বড় বড় ইয়াবার চালান এনে সফল সাইফুল করিম দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ওসি-এসপি বা তাদের সমমানের কোনো অফিসার তাকে গ্রেপ্তার করার সাহস করেনি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সংক্রান্ত কোনো মামলা তো দূরের কথা, কোনো ধরনের প্রমাণও ছিল না। বিপত্তি দেখা যায় ২০১৭ সালে হঠাৎ কয়েকটি মাদক মামলায় আসামি হয়ে পড়ার পর। ২০১৮ সালে কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ১১৫১ জনের মধ্যে এক নাম্বারে ছিল সাইফুল করিমের নাম। ওই বছরের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ ঘোষণার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সারা দেশে জোরালো অভিযান শুরু করে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা সংস্থা। এরপর কোনো উপায় না দেখে সাইফুল করিম গা-ঢাকা দেন। কৌশলে পালিয়ে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন তিনি; যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি ইয়াঙ্গুনে থাকে। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রথম দফায় ১০২ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করার সময় সাইফুল করিম আত্মসমর্পণ করছেন বলে জোর গুঞ্জন ওঠে। কিন্তু তখন আত্মসমর্পণ করেননি আলোচিত এই ইয়াবা কারবারি।

ইয়াবা কারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রথম দফা আত্মসমর্পণের পর দ্বিতীয় দফা আত্মসমর্পণের সুযোগের ঘোষণা দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘোষণার পর গত ২৬ মে শনিবার রাত ১১টার দিকে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন তিনি। বলা হচ্ছে, সেদিনই পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বিশেষ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যান সাইফুল। অবশ্য, পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে জানান, ইয়াবা ডন সাইফুল করিমকে পুলিশ সম্প্রতি অস্ত্র ও মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করে। গতকাল শুক্রবার ভোররাতে টেকনাফে নাফ নদীর পাড়ে তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন দেশের এই শীর্ষ ইয়াবা কারবারি। এ সময় পুলিশের তিন সদস্যও আহত হন; ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১ লাখ ইয়াবা।

পুলিশের সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবা ডন সাইফুলকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে; যা পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে আসবে। ইয়াবা ডন সাইফুল করিমের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে কারা, আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কারা কারাÑ তাদের প্রত্যেকের নাম সে বলে দিয়েছে। এদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাও রয়েছেন। আমরা এসব ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’

ইয়াবা ডন সাইফুল করিম ছাড়া চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৭১ জন মাদক কারবারি। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২১ জন, বিজিবির সঙ্গে ১৫ জন, র‌্যাবের সঙ্গে ১৬ জন ও ‘ইয়াবা কারবারিদের গোলাগুলিতে’ ১৯ জন নিহত হন।