জনপ্রিয় ছয় পশ্চিমা রূপকথা|148088|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০
জনপ্রিয় ছয় পশ্চিমা রূপকথা

জনপ্রিয় ছয় পশ্চিমা রূপকথা

সিন্ডারেলা

একদা এক কাজের মেয়ে ছিল, নাম তার সিন্ডারেলা। আক্ষরিক অর্থে কাজের মেয়ে না হলেও তার জীবন এর চেয়ে কোনো অংশে ভালো ছিল না। কারণ তার সৎ মা তাকে দিয়ে সারা দিন কাজ করাত। তার সৎ দুই বোনও তাকে দিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করাত। এত পরিশ্রম করেও সিন্ডারেলার ছিল নজরকাড়া সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যের জন্য সৎ বোনেরা তাকে ঈর্ষা করত। তবে এই দুখী মেয়েকে বনের পশুপাখিরা ভীষণ ভালোবাসত। আর ভালোবাসত এক পরী। এই পরীর কারসাজিতেই রাজকুমারের সঙ্গে একদিন নাচার সুযোগ পায় সিন্ডারেলা। তার প্রেমে পড়ে যায় রাজকুমার। কিন্তু রাত ১২টার ঘণ্টা বাজতেই রাজকুমারকে রেখে দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে সিন্ডারেলা। আর ভুল করে ফেলে আসে একটি পাটি জুতা। এ জুতা দিয়েই তাকে খুঁজে বের করে রাজকুমার। সিন্ডারেলার দুই সৎ বোন অবশ্য জুতাটি নিজেদের বলে দাবি করেছিল। কিন্তু তাদের পায়ে জুতাটি কিছুতেই লাগল না। অবশেষে সিন্ডারেলাকে সবার সামনে আনা হয় এবং জুতাটি তার পায়ে লেগে যায়! এরপরই রাজপুত্রের সঙ্গে তার হয়ে যায় বিয়ে।

সিন্ডারেলার এই রূপকথাটি হাজার বছর ধরে পৃথিবীর যে প্রান্তেই বলা হয়েছে সেখানেই মানুষের মন জয় করেছে। তবে, সিন্ডারেলার আধুনিক ভার্সনটি এসেছে সপ্তদশ শতকে ফরাসি লেখক চার্লস পেরল্টের কাছ থেকে। এই রূপকথাটি পৃথিবীজুড়ে দেড় হাজার রকমভাবে প্রচলিত আছে। মিসরে প্রাচীনকাল থেকেই এই রূপকথাটি প্রচলিত ‘গোলাপ লাল জুতা পরা মেয়েটি’ শিরোনামে। নবম শতক থেকে চীনে এই গল্পটিই প্রচলিত আছে ‘ছোট পায়ের পাতার মেয়েটি’ শিরোনামে।

সিন্ডারেলা রূপকথা অবলম্বনে ১৯৫০ সালে ওয়াল্ট ডিজনি নির্মাণ করেছে আইকনিক কার্টুন। এছাড়াও এই গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য সিনেমাও। আধুনিক বিভিন্ন ঘটনাকেও এই রূপকথার সঙ্গে তুলনা করা হয়। ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স হ্যারি এবং অভিনেত্রী মেগান মেরক্যালের বিয়েকেও অনেকে সিন্ডারেলার কাহিনীর সঙ্গে তুলনা করেন।

বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট

পৃথিবীর অন্যতম রোমান্টিক রূপকথা বলা হয় ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’কে। এক অদ্ভুত দানবের হাত থেকে নিজের বাবাকে উদ্ধার করতে গিয়ে সেই দানবের হাতেই বন্দি হয় পরমা সুন্দরী বেল। কিন্তু বন্দি অবস্থায় ওই কিম্ভূতকিমাকার জন্তুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বেলের। এই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ভালোবাসায়। আসলে ওই জন্তুটি ছিল এক সুদর্শন রাজপুত্র। দম্ভ করার জন্য তার এমন পরিণতি হয়। বেলের ভালোবাসায় জীবনের ভুল বুঝতে পারে রাজপুত্র এবং আবারও পূর্বের চেহারায় ফিরে আসে। সিন্ডারেলার মতো এই রূপকথাটিও ফ্রান্স থেকে এসেছে। ১৯৪৫ সালে ফরাসি পরিচালক ককচিউ এই রূপকথা অবলম্বনে প্রথম সিনেমা নির্মাণ করেন। তবে, ডিজনি কার্টুনে এই গল্পটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ১৯৯১ সালে ওয়াল্ট ডিজনির ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ নামে এনিমেশন চলচ্চিত্রটি সাড়া ফেলে চারদিকে।

সম্প্রতি রূপকথার এই গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে আরও একটি সিনেমা। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ওই সিনেমায় বেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন হলিউডের হার্টথ্রব অভিনেত্রী এমা ওয়াটসন, আর জন্তুরূপী রাজকুমারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ড্যান স্টিভেন্স।

 

হ্যানসেল অ্যান্ড গ্রেটেল

এটি একটি জার্মান রূপকথা। হ্যানসেল ও গ্রেটেল দুই ভাইবোন। তাদের বাবা একজন গরিব কাঠুরিয়া। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সৎ মায়ের চক্রান্তে তাদের জঙ্গলের ভেতরে ফেলে আসা হয়। এক জাদুকরী রাক্ষসী তাদের অপহরণ করে ঘন জঙ্গলে একটি ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখে। ওই ঘরটি ছিল কেক আর মিষ্টি দিয়ে তৈরি। রাক্ষুসীর পরিকল্পনা ছিল একে একে দুই ভাইবোনকে রান্না করে খাওয়া। কিন্তু হ্যানসেল আর গ্রেটেল ছিল খুব বুদ্ধিমান। তারা শেষ পর্যন্ত ওই রাক্ষসীকে ধোঁকা দিয়ে তার আস্তানা থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয়, রাক্ষুসীকে তার চুলোর ভেতরেই ধাক্কা মেরে ফেলে আসে তারা। সঙ্গে অনেক মূল্যবান পাথর ও মণিমুক্তা নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখে ততদিনে মারা গেছে তাদের সৎ মা। দুই ভাইবোন বাড়ি ফিরে বাবার দুঃখ দূর করে এবং রাক্ষসীর কাছ থেকে পাওয়া সম্পদ দিয়ে তারা সুখেশান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

গবেষকদের ধারণা চতুর্দশ শতকের মহাদুর্ভিক্ষের পর এই রূপকথার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। পরবর্তীকালে রূপকথার সংকলক দুই গ্রিম ভাই এটিকে সংরক্ষণ করেন। বিভিন্নভাবে এই গল্পটি বিশে^র প্রায় সব দেশেই প্রচলিত আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রূপকথাটি ‘স্টোরি অব দ্য বার্ড দ্যাট মেড মিল্ক’ শিরোনামে প্রচলিত আছে। ভারতে এই রূপকথাটি ‘কাদের ও রাক্ষস’ নামে প্রচলিত। রাশিয়ানদের কাছে এটি ‘বাবা ইয়গা’ নামে প্রচলিত।

 

জ্যাক অ্যান্ড বিনস্ট্যাক

বিধবা মায়ের সঙ্গে একটি ছোট্ট কুটিরে থাকত জ্যাক। গোয়ালঘরে থাকা একটি গরুই ছিল দরিদ্র মা ও ছেলের একমাত্র সম্বল। গরুর দুধ বিক্রি করে চলত তাদের সংসার। কিন্তু গরুটি একসময় দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে জ্যাকের মা সিদ্ধান্ত নিলেন এটিকে বিক্রি করে দেওয়ার। মায়ের কথামতো গরুটি বিক্রি করতে বাজারে যায় জ্যাক। কিন্তু পথে একজনের সঙ্গে দেখা হয় তার। কিছু জাদুর শিমের বিচির বদলে গরুটি নিয়ে যেতে চায় সে। লোকটি জ্যাককে আশ^াস দেয়, শিমের বিচিগুলো তাদের সব কষ্ট দূর করে দেবে, প্রচুর অর্থ নিয়ে আসবে। জ্যাক লোকটিকে বিশ^াস করে তাকে গরুটি দিয়ে দেয় এবং শিমের বিচিগুলো নিয়ে ঘরে ফিরে আসে।

কোনো টাকা ছাড়াই ঘরে ফিরে আসায় ভীষণ রেগে গিয়ে শিমের বিচিগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয় জ্যাকের মা। মন খারাপ করে আশাহত জ্যাক সেদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সেই রাতে মাটিতে ছুড়ে ফেলা শিমের বিচিগুলো থেকে একটি দৈত্যাকৃতির লতানো শিম গাছের জন্ম হয়। ভোরবেলা জ্যাকের ঘুম ভেঙে গেলে সে তার জানালা দিয়ে বিশাল শিম গাছটি দেখে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর সেই শিমগাছ বেয়ে সে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে শিম গাছ বেয়ে একসময় সে এটির চূড়ায় পৌঁছে যায়। সেখানে জ্যাক দেখল এক বিশাল দুর্গ। গুটিগুটি পায়ে সেই দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করে জ্যাক। সেখানে বাস করত এক মানুষখেকো দৈত্য। দৈত্যটি জ্যাককে দেখতে পেয়েই তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। সে যাত্রায় জ্যাক কোনোভাবে বেঁচে যায় এবং দৈত্যটি একসময় ঘুমিয়ে পড়লে একটি সোনার মুদ্রা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে শিমগাছটি বেয়ে নিচে নেমে আসে। এভাবে আরও দু’বার শিমগাছ বেয়ে একটি সোনার ডিম দেওয়া হাঁস আর একটি জাদুর বীণা নিয়ে আসে জ্যাক। ঘরে ফিরে তার মাকে এসব দেখায়। তারপর একটি কুড়াল দিয়ে শিমগাছের গোড়াটি কেটে দেয় মা-ছেলে যেন দৈত্যটি আবার নিচে নেমে না আসে। গাছটি কেটে দেওয়ায় দৈত্যটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর জ্যাক ও তার মা সুখেশান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের আর কোনো অভাব থাকল না।

রূপকথার চরিত্র জ্যাক মূলত ইংল্যান্ডের সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, রূপকথার এই গল্পটি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে এই গল্পটি উপস্থাপন করা হয়। গত দশকে এই গল্প অবলম্বনে দুটি সিনেমাও নির্মিত হয়েছে।

 

রুপাঞ্জেল

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি শিশুদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে রূপকথার রুপাঞ্জেল চরিত্রটি। এই জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ রূপকথার রুপাঞ্জেলকে কার্টুনচিত্রের মাধ্যমে টেলিভিশনে উপস্থাপন। তবে, এর অনেক আগে থেকেই রূপকথাটি বড়দের মুখে শুনে আসছে শিশুরা। একদা এক দম্পতি জঙ্গলের পাশেই একটি বাড়িতে বসবাস করত। আর ওই জঙ্গলে বাস করত গোথেল নামে এক ডাইনি। এক রাতে, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য খাবারের সন্ধানে ওই জঙ্গলে প্রবেশ করে তার স্বামীটি। সঙ্গে করে নিয়ে আসে কিছু ফল আর সবজি। এগুলো দিয়ে তৈরি সুস্বাদু সালাদ খেয়ে আরও একটু খেতে চাইল স্ত্রী। অগত্যা কী আর করা। তার স্বামী দ্বিতীয়বার জঙ্গলে প্রবেশ করে। কিন্তু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার সময় ডাইনি গোথেল তাকে ধরে ফেলে এবং চুরির অভিযোগে তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়। কোনো উপায়ন্তর না দেখে ক্ষুধার্ত স্ত্রীর কথা বলল লোকটি। কিন্তু গোথেলের মন গলল না এতে। তবে একটি শর্তে লোকটিকে ছেড়ে দিতে রাজি হয় গোথেল। শর্ত অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর গর্ভ থেকে যে শিশুর জন্ম হবে তা দিয়ে দিতে হবে গোথেলকে। কিছুদিন পরই ওই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। শর্ত অনুযায়ী গোথেল সেই মেয়েটিকে নিয়ে যায় তার কাছে। গোথেল সদ্যোজাত মেয়েটির নাম দেয় রুপাঞ্জেল। ধীরে ধীরে ডাইনি গোথেলের কাছে বড় হতে থাকে রুপাঞ্জেল। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দ্য সুন্দরী হয়ে উঠল রুপাঞ্জেল। তার ছিল দীর্ঘ সোনালি চুল। গোথেল তাকে গভীর জঙ্গলে কাঠের তৈরি অনেক উঁচু একটি ঘরে বন্দি করে রাখে। সেই ঘরটির কোনো দরজা ছিল না। ছিল শুধু একটি জানালা। রুপাঞ্জেলের চুল এত দীর্ঘ ছিল যে, গোথেল মাঝেমধ্যে তাকে দেখতে এলে সে তার লম্বা চুল জানালা দিয়ে মেলে দিত। সেই চুল বেয়েই ওপরে উঠত গোথেল। এভাবেই কাটছিল রুপাঞ্জেলের দিনগুলো। একদিন সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল এক রাজকুমার। যাওয়ার পথে কোনো মেয়ের মিষ্টি কণ্ঠে গান শুনতে পেয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করে রাজকুমার। এভাবে খুঁজতে খুঁজতেই কাঠের বাড়িটির সন্ধান পায় রাজকুমার, যার জানালা দিয়ে গানটি ভেসে আসছিল। কিন্তু সেই ঘরটিতে প্রবেশের উপায় জানা ছিল না তার। অবশেষে একসময় রুপাঞ্জেলের চুল বেয়ে গোথেলকে ওপরে উঠতে দেখে রাজকুমার। গোথেল চলে গেলে সেও একইভাবে ওপরে উঠে রুপাঞ্জেলকে দেখতে পেল। রুপাঞ্জেলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল রাজকুমার। রুপাঞ্জেলও এই প্রস্তাবে রাজি। কিন্তু এত উঁচু থেকে রুপাঞ্জেল মাটিতে নেমে আসবে কীভাবে। এর জন্য রুপাঞ্জেলকে একটি রেশম কাপড়ের টুকরো দিল রাজকুমার। যেন এই কাপড় দিয়ে মই বানিয়ে নিচে নেমে আসতে পারে রুপাঞ্জেল। তার পর থেকে প্রতিরাতেই চুল বেয়ে রুপাঞ্জেলের সঙ্গে দেখা করতে যেত রাজকুমার। কিন্তু ডাইনি গোথেল এই সব কিছুই একদিন জেনে গেল। প্রচ- ক্রোধে চুল কেটে রুপাঞ্জেলকে আরও গহিন জঙ্গলে পাঠিয়ে দিল ডাইনি। সেই রাতে বাড়িটির নিচে গিয়ে রাজকুমার রুপাঞ্জেলকে ডাক দিতেই গোথেল রুপাঞ্জেলের কাটা চুল নিচে মেলে দিল। রাজকুমার ওপরে গিয়ে দেখতে পেল গোথেলকে। উপায়ান্তর না দেখে জানালা দিয়ে লাফ দেয় রাজকুমার। মাটিতে পড়ে পাথরের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে সে। এভাবে অনেক মাস কেটে গেল। তারপর একদিন অন্ধ রাজকুমার বনের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আরও গহিন জঙ্গলে গিয়ে পৌঁছল। এমন সময় সে রুপাঞ্জেলের কণ্ঠে গান শুনতে পেল। রুপাঞ্জেলও রাজকুমারকে দেখে ছুটে এলো এবং তাকে জড়িয়ে ধরল। রুপাঞ্জেলের স্পর্শে রাজকুমার তার দৃষ্টি ফিরে পেল।

জনপ্রিয় এই রূপকথার গল্পটির উৎপত্তি জার্মানিতে। ধারণা করা হয়, গল্পটি ইতালিয়ান গল্প ‘রুবাদা’ থেকে রূপান্তরিত হয়ে সপ্তদশ শতকে প্রকাশিত হয়।

 

স্নো হোয়াইট অ্যান্ড সেভেন ডর্ফ

বাংলায় রূপকথার এই গল্পটি তুষারকন্যা ও সাত বামুন নামে পরিচিত। একদেশে ছিল অনিন্দ্যসুন্দরী এক রানী। এক শীতের সকালে জানালার পাশে বসে সেলাই করছিলেন তিনি। বাইরে তুষারপাত হচ্ছিল। হঠাৎ রানীর হাত ফুটো হয়ে একফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল সেই তুষারের ওপর। শ্বেতশুভ্র তুষারের ওপর লাল রক্তের ফোঁটা দেখে রানী ঈশ^রের কাছে প্রার্থনা করল তার যেন এমন একটি মেয়ে হয় যে হবে তুষারের মতো শুভ্র আর তার ঠোঁট হবে রক্তের মতো লাল। কিছুদিনের মধ্যেই তার গর্ভে জন্ম নিল ফুটফুটে এক রাজকন্যা। সেই রাজকন্যার ধবধবে শুভ্র শরীর আর রক্তের মতো লাল ঠোঁট। তার নাম হলো তাই তুষারকন্যা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তুষারকন্যার জন্মের সময়ই তা মা মারা গেল। সৎ মায়ের সংসারে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল তুষারকন্যা। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে লাগল তুষারকন্যা। সৎ মায়ের জাদুর আয়নাও পৃথিবীর সেরা সুন্দরী হিসেবে তুষারকন্যাকে চিহ্নিত করল। আয়নায় নিজের পরিবর্তে তুষারকন্যাকে দেখে হিংসায় জ¦লে উঠল সৎমা। তিনি তার এক বিশ^স্ত সহচরকে দায়িত্ব দিলেন তুষারকন্যাকে হত্যার জন্য। তুষারকন্যাকে হত্যা করতে গভীর জঙ্গলে নিয়ে গেল ওই চর। কিন্তু তুষারকন্যাকে দেখে তার মায়া হলো। তাই তাকে না মেরে একটি খরগোশ মেরে তার রক্ত নিয়ে গিয়ে রানীকে দেখাল। এদিকে, গভীর জঙ্গলে একা একা ঘুরে একটি বাড়ি খুঁজে পেল তুষারকন্যা। বাড়িটি ছিল সাত বামুনের। তারা তুষারকন্যাকে আশ্রয় দিল। কিন্তু রানী ঠিকই জেনে গেল তুষারকন্যার বেঁচে থাকার কথা। কারণ তার আয়না তখনো সেরা সুন্দরী হিসেবে তুষারকন্যাকেই দেখাচ্ছিল। তুষারকন্যাকে হত্যা করতে ছদ্মবেশে তাই নিজেই জঙ্গলে প্রবেশ করলেন সৎমা। তিনি তুষারকন্যাকে একটি বিষ মেশানো আপেল খেতে দিলেন। সেই আপেল খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল তুষারকন্যা। সাত বামুন বাড়ি ফিরে মৃত তুষারকন্যাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। এমন সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক রাজকুমার। সে ঘোড়া থামিয়ে এগিয়ে এলো। কফিনের মাঝে অপূর্ব সুন্দরী তুষারকন্যাকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেল সে। তারপর রাজকুমারের ছোঁয়ায় মৃত্যু থেকে ফিরে এলো তুষারকন্যা।

রূপকথার এই গল্পটি পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রচলিত। রূপকথা অবলম্বনে এই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করেই প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ডিজনি। জানা যায়, রূপকথার তুষারকন্যার মতো বাস্তবেও এক নারী ছিলেন, যার নাম মার্গারেট। সম্ভ্রান্ত তরুণী মার্গারেটের ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছিল তুষারকন্যার গল্পটি।॥