ব্যয়বহুল উন্নয়ন ও সস্তা শ্রমিকের দেশে বাজেট|148315|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০
ব্যয়বহুল উন্নয়ন ও সস্তা শ্রমিকের দেশে বাজেট
রাজেকুজ্জামান রতন

ব্যয়বহুল উন্নয়ন ও সস্তা শ্রমিকের দেশে বাজেট

আজই ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ধরনের ছক কষে তৈরি করা বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। অতীতের ধারাবাহিকতায় বাজেট প্রস্তাবনায় এবারও অনেক স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতির কথা লেখা থাকবে। যারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন আর যারা ঘাম ঝরিয়ে দেশকে গড়ে তুলছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাও প্রকাশ করা হবে বাজেট বক্তৃতায়। গর্ব করে বলা হবে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট পেশ করা হলো। আমাদের জিডিপি বৃদ্ধির হার বিশ্বে প্রায় সর্বোচ্চ, মাথাপিছু আয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে, যা এখন প্রায় দুই হাজার ডলার, রপ্তানি আয় বাড়ছে, শিল্পোৎপাদন বাড়ছে, গার্মেন্ট দ্রব্য রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান আমরা ধরে রেখেছি, আমরা এখন আর দরিদ্র দেশ নই, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি ইত্যাদি উচ্চস্বরে ঘোষণা হতে থাকবে।

আমাদের সরকার শ্রমিকবান্ধব, আমাদের দেশে বিশ্বের সেরা পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা তৈরি হচ্ছে একের পর এক, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বদ্ধপরিকরÑ এসব কথা পুরনো হলেও নতুন করে আবার শোনা যাবে বাজেট ঘোষণার সময়। কিন্তু এসব কথায় শ্রমিকের মন ভরলেও, তাদের অভাব মোচন বা দুঃখ দূর হবে কি? অতীতের প্রতিটি বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কতটুকু পূরণ হয়েছে আর তার ফলাফল কতটুকু অর্জিত হয়েছে, সে বিশ্লেষণ কি এই বাজেট বক্তৃতায় থাকবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলে এক কথায় এর উত্তর হবে, না, থাকবে না। বাজেট বলতে আমরা দেখে থাকি রাষ্ট্রের বার্ষিক আয় ব্যয়ের হিসাব। শ্রমজীবী মানুষ এই জটিল হিসাব দেখে বলে, হিসাবের আমরা কি বুঝি আর এসব হিসাব দিয়ে আমরা কী করব? এসব বড় বড় শিক্ষিত মানুষের ব্যাপার। কিন্তু বাজেট তো শুধু অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ নয়, বাজেটের একটা দর্শন আছে। বাজেটের জন্য যে অর্থ, তা কোথা থেকে আসবে আর তা কোথায় কার জন্য ব্যয় হবে, তা দিয়ে বুঝতে পারা যায় রাষ্ট্র কার পক্ষে কাজ করে। কোথায় বরাদ্দ দিতে টাকার অভাব হয় না আর কোথায় বরাদ্দ করার জন্য টাকা পাওয়া যায় না, তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় একটা বিষয় দৃশ্যমান হয়েছে, দেশের উন্নয়ন, উৎপাদন ও ভোগ, জিডিপি ও মাথাপিছু আয়, রপ্তানি, সমস্ত ক্ষেত্রেই শ্রমিক শ্রেণির জোরালো ভূমিকা থাকলেও বাজেট প্রণয়নের বেলায় তাদের কোনোই মতামত বা ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।

এবারের বাজেট প্রণয়নের আগে যেসব মতবিনিময় সভা হয়েছে, সেখানে ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা তাদের আকাক্সক্ষা ও দাবি পেশ করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার দাবি করেছেন। অর্থমন্ত্রী তাদের কথা শুনেছেন, কিছু ক্ষেত্রে আশ্বাস দিয়েছেন, কিছু কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হবে। অথচ দেশের অর্থনীতির প্রধান খাত বলে বিবেচিত কৃষি ও শিল্প খাতে নিয়োজিত কোটি কোটি শ্রমিকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা বা মতামত শোনার ন্যূনতম প্রয়োজন কেউ বোধ করেননি। শ্রমিকরা কি শুধুই উৎপাদনের যন্ত্র? দাস যুগে বলা হতো দুধরনের প্রাণীকে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়। একদল কথা বলতে পারে না আর একদল কথা বলতে পারে। আজও প্রায় সেই দৃষ্টিভঙ্গিই বহাল আছে। শ্রমিকরা হবে উৎপাদনে নিয়োজিত কথা বলা প্রাণীর মতো। তাদের আবার মতামত কী? তাদের খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা হলেই যথেষ্ট। কিন্তু বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে যদি গণতান্ত্রিক করতে হয়, তাহলে এই কোটি কোটি শ্রমিককে মতামত প্রদান থেকে দূরে রেখে তা কি করা সম্ভব? তাহলে যা হওয়ার তাই হয়। বাজেট হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছায় আমলা দ্বারা প্রণীত এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার বাজেট।

দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখছে তিনটি খাত। কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। এই তিন খাতের সঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমিক। কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান ১৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু এ খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং এ খাতে শ্রমিক ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। সেবা খাতে জিডিপির অবদান ৫৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এই খাত কর্মসংস্থান করে থাকে ৩৯ শতাংশ। এই শ্রমজীবীদের জন্য কিন্তু বাজেটে বিশেষ কোনো খাত নেই। শ্রম সম্পর্কিত দুটি মন্ত্রণালয় আছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ২২৭ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫৯৫ কোটি টাকা। বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ থেকেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই খাতের গুরুত্ব কতখানি।

বাজেটের আয়তন প্রতি বছর বড় হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার বাজেটের আয়তন ৫ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাজেটের টাকার বিরাট অংশ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা আসবে রাজস্ব আয় থেকে, যার সিংহ ভাগের জোগান দেবে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষের দেওয়া পরোক্ষ করের মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, পরোক্ষ কর অর্থাৎ ভ্যাটের আওতা বাড়াবেন। এরই মধ্যে ভ্যাটকে পাঁচ ধাপে আদায় করার প্রস্তাব এসেছে। এতে সর্বশেষ ক্রেতার ওপর তো পুরো চাপ পড়বে। তাহলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনের জন্য যা প্রয়োজন, সবকিছুর ওপর থেকেই তিনি কর নেওয়ার চেষ্টা করবেন। বড় ঋণখেলাপিদের ঋণ সুদ-আসলে মাফ করে দেওয়া আর সাধারণ মানুষের ওপর করের আওতা সম্প্রসারিত করার এই নীতির নাম কি গণতান্ত্রিক বাজেট হতে পারে?

পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসড়ক, ফ্লাইওভার, রেলপথ নির্মিত হয় যে দেশে, দ্রুত ধনী হওয়ার দিক থেকে যে দেশ বিশ্বে এক নম্বর, যে দেশ থেকে ক্রমাগত টাকা বিদেশে পাচার করছে একদল ধনী, সেই দেশের শ্রমিকরাই আবার বিশ্বের সবচেয়ে সস্তায় শ্রম দিতে বাধ্য হয়। বাসাভাড়া, চিকিৎসার খরচ, সন্তানের শিক্ষার খরচÑ সবই ছুটছে ঘোড়ার গতিতে, কিন্তু শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি হয় কচ্ছপের চেয়েও ধীর গতিতে। পাঁচ বছর পরপর যে মজুরি বাড়ে, তা শুনতে বড় শোনালেও শ্রমিক টাকা হাতে পেয়ে দেখেছে যে দ্রব্যমূল্যের বিবেচনায় তার মজুরি পাঁচ বছরের আগের জায়গাতেই আছে। একদিকে শ্রমিকের সঙ্গে এই প্রতারণাপূর্ণ আচরণ অন্যদিকে গার্মেন্ট দ্রব্য রপ্তানি বাড়ছে বলে সন্তোষ প্রকাশ দুটোই একসঙ্গে চলছে। পাটকল শ্রমিকরা বকেয়া বেতন আর পাটকল চালু রাখার আন্দোলন করছেন। শ্রমিকের বেতন বাকি থাকলেও আমলা প্রশাসনের কর্তাদের জন্য বরাদ্দে কিন্তু কোনো ঘাটতি নেই। নতুন বাজেটেও কি তার প্রতিফলন ঘটবে আবার?

অর্থনীতির সাধারণ বিবেচনায় বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশের উৎপাদন এবং ভোগের ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিকল্প নেই। শ্রমিক যত শোষিত হবে, তত তার ক্রয়ক্ষমতা কমবে, ফলে দেশে বৈষম্য ও বাজার সংকট ততই বাড়তে থাকবে। উৎপাদনের প্রধান শক্তি এবং খাদ্য-বস্ত্র-ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রধান ক্রেতা শ্রমজীবী মানুষ। তাদের আয় না বাড়লে, তাদের জীবনে স্থিতি না থাকলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসতে পারে না। বাজেটের প্রধান অর্থের জোগানদাতা শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাজেটে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ, তাই দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। আমরা মনে করি নিম্নোক্ত খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ দিলে তা শ্রমজীবী মানুষ এবং দেশের অর্থনৈতিক গতি বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে। 

ক. দেশের সব শ্রমিকের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করে আর্মি-পুলিশের মতো রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। খ. শ্রমজীবীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ ও ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। গ. শ্রমজীবীদের জন্য বাসস্থান নির্মাণে বরাদ্দ দিতে হবে। শ্রমজীবী মা ও সন্তানদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনে বরাদ্দ দিতে হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য ডরমিটরি স্থাপন করতে হবে। ঘ. ভবিষ্যৎ শ্রম শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শ্রমজীবীদের সন্তানদের শিক্ষায় বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। ঙ. শ্রমজীবীদের দুর্ঘটনায় নিহত আহত হওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিল গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।  চ. শ্রমজীবীদের জন্য পেনশন স্কিম চালু করতে হবে।

এটা তো ঠিক, শ্রমিকদের আয়ের প্রতিটি পয়সা দেশের অভ্যন্তরে ব্যয় হয়। অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রধান ক্রেতা শ্রমজীবীরা। শ্রমজীবীরা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে না, কর ফাঁকি দেয় না, বিদেশে টাকা পাচার করে না। তাদের জন্য বরাদ্দ করা প্রতিটি টাকা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। তাই বাজেটে শ্রমিকের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থেই প্রয়োজন।