অফিস রাজনীতির দশ কৌশল|148378|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০
অফিস রাজনীতির দশ কৌশল
সৈয়দ আখতারুজ্জামান

অফিস রাজনীতির দশ কৌশল

অফিস রাজনীতির নাম কম-বেশি সবাই শুনেছি। কিন্তু আপনি কি কখনো এই রাজনীতির শিকার হয়েছেন? বিস্তারিত জানালেন বিয়ন্ড ইনস্টিটিউট অব ট্রেনিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনাবিষয়ক লেখক ও প্রশিক্ষক সৈয়দ আখতারুজ্জামান

 

অফিস রাজনীতির উদ্দেশ্য কী? কেন রাজনীতি হয়? কী ধরনের রাজনীতি হয়? এখানে আপনার ভূমিকা কী হবে? কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন? সমস্যা সমাধানে এবং বিশ্লেষণে এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানতে হয়। মূল্যবোধের জায়গা থেকে, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষার জন্য এবং নিজের আত্মরক্ষার জন্য আপনি বীরদর্পে রাজনীতি করতেই পারেন। তবে অন্যকে ফাঁদে ফেলে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এবং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার রাজনীতি অত্যন্ত নিন্দনীয় অপরাধ। এবার যে যে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে অফিস রাজনীতি বেশি হয় এবং আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে সেদিকে আলোকপাত করা যাক।

এক. নিয়োগ : যোগ্যতার স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রার্থীর দেশের বাড়ি কোথায়, প্রার্থী সরকারিভাবে কোন দলের সাপোর্টার, প্রার্থী কোন বড় কর্মকর্তার নিকটাত্মীয় ইত্যাদির ভিত্তিতে যখন নিয়োগ হয় তখন এ সংক্রান্ত রাজনীতির চেহারা আপনি দেখতে পাবেন। এ রাজনীতির ক্ষেত্র অভ্যন্তরীণের চেয়ে অফিসের বাহ্যিক পরিম-লে বেশি দেখা যায়। নিয়োগ শেষ হয়ে গেলে এই রাজনীতিরও অবসান হয়। কিন্তু শুরু হয় নতুন প্রেক্ষাপটের রাজনীতি।

দুই. পদোন্নতি : পদোন্নতি এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য সবচেয়ে বেশি রাজনীতির চর্চা চলে অফিসের অভ্যন্তরে। এ রাজনীতির কার্যক্রম প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের। চাকরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ রাজনীতির শেষ নেই। প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থানে থাকলে আপনি চাইলেও এ রাজনীতি পাশ কাটাতে পারবেন না। হয়তো কাউকে আপনি শিকার করবেন অথবা আপনি কারও শিকার হবেন।

তিন. নতুন দায়িত্ব : অফিসে নতুন কোনো লোভনীয় প্রজেক্ট এলে এর দায়িত্ব নিয়ে শুরু হয় কাড়াকাড়ি। কে এ দায়িত্ব পাবেন! কে হবেন নতুন প্রজেক্টের হেড! কে পাবেন নতুন গাড়ি, সুযোগ সুবিধা! ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের রাজনীতি সিজনাল। কখনো আছে, কখনো নেই। তবে আপনি যদি দূরদর্শী হন তাহলে অনেক আগেই আঁচ করতে পারবেন। আগে থেকেই যদি আটঘাট বেঁধে কাজে নামেন তাহলে আপনার প্রতিযোগিদের সঙ্গে হাড্ডহাড্ডি লড়াইয়ে নামতে পারবেন। ঝানু পলিটিশিয়ান হলে লক্ষ্য অর্জনেও সফল হতে পারেন।

চার. শত্রুকে বিপদে ফেলতে : শত্রু যদি জেনে যায় আপনি তার শত্রু তাহলে এই খেলা কঠিন হয়ে যাবে। আপনি শত্রুর সবচেয়ে বড় ক্ষতি করতে পারবেন যদি শত্রুকে সত্যিই ভালোবাসতে পারেন। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। ঝানু রাজনীতিবিদরা এই কাজটি অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে করেন। এমনকি ক্ষতি করার পরেও আপনি জানতে পারবেন না আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। বড় কঠিন এ খেলা!

পাঁচ. নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে : কে চায় নিজের কর্তৃত্ব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে! আমরা ক্ষমতা দখল করতে ভালোবাসি, ক্ষমতা ধরে রাখতে ভালোবাসি, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে ভালোবাসি। তাই যারা ভালো ভালো কাজ করে, দক্ষতা দেখিয়ে, বাজিমাত করে এগিয়ে আসছেন তারা সাবধান হয়ে যান। ক্ষমতাবানরা সহজে আপনাদের জায়গা ছেড়ে দেবেনÑ এমনটা আশা করা ঠিক হবে না। এমতাবস্থায় আপনার কাজ হবে কর্তৃত্ববানদের চিনতে পারা। তাদের দুর্বলতা বুঝতে পারা। আপনার কাজের মূল্যায়ন ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কি না সেদিকে সবচেয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

ছয়. নিজেকে সেরা বানাতে : নিজেকে সেরা বানানোর অনেক উপায় আছে। আপনি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে এমনিতেই সেরা হয়ে যাবেন। কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে কাজ করাতো সহজ নয়। অনেকেই অপরের করা কাজের কৃতিত্ব নিজের খাতায় লিখিয়ে নিতে চান। এও এক ধরনের রাজনীতি। বস-স্থানীয় কর্মকর্তারা এই রাজনীতি বেশি করেন। সহকর্মীরাও এ রাজনীতিতে পিছপা হন না। কষ্ট করবেন আপনি ফলভোগ করবে অন্য কেউ। তিনি নিজেকে সেরা বানাবেন আপনার ঘাম ঝরানো শ্রমে। তাই আপনি যদি দক্ষ হন তাহলে চেষ্টা করবেন যেকোনো কাজ একা একা করতে। যাতে পুরো কাজের কৃতিত্বে অন্য কেউ ভাগ বসাতে না পারে। ম্যানেজমেন্ট দেখতে পাবে, আপনি কতটা দক্ষ। আর আপনি যদি দুর্বল হন,তাহলে দলগতভাবে কাজটা করতে চাইবেন। তাতে আপনার দুর্বলতা কিছুটা হলেও ঢাকা পড়বে। এভাবে কাজ যখন বণ্টন করা হয় তখনো রাজনীতির সুযোগ আছে। 

সাত. পরশ্রীকাতরতা : অন্যের ভালো দেখতে ভালো লাগে নাÑ এ কারণেও রাজনীতি হয়। পরশ্রীকাতরতা থেকে কখনো কখনো আপনি আঘাত প্রাপ্ত হতে পারেন। তাই আপনি ভালো কাজ করলে সাবধান থাকবেন, তার প্রচার যেন মাত্রা না ছাড়ায়।

আট. মালিকপক্ষের কাছ থেকে দাবি আদায় : এ রাজনীতির পরিধি অনেক বড়। দলগতভাবে একত্রিত হয়ে যুক্তিসংগত ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনমত আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে হবে। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশেষ করে শ্রমিক নির্ভর প্রতিষ্ঠানে এ রাজনীতির চর্চা বেশি দেখা যায়।

নয়. রাষ্ট্রীয় রাজনীতির প্রভাব : এই ধরনের রাজনীতি কদাচিৎ হয়। দেশকে এবং সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে যে হানাহানি, আগুন লাগানো, শ্রমিক ধর্মঘট ডাকা, ভাঙচুর করা ইত্যাদি এই ধরনের রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। এতে সরকার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি সাধারণ শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশও নির্দিষ্ট পণ্য-ক্যাটাগরিতে তাদের ভাবমূর্তি হারায়।

দশ. স্রেফ বদ অভ্যাস : কোনো কারণ নেই, স্রেফ বদ অভ্যাসের জন্য কেউ কেউ অফিসে রাজনীতি করে। এই রাজনীতিতে তার নিজস্ব কোনো স্বার্থ নেই। তবুও কাউকে ঝামেলায় ফেলতে পারলে কেউ কেউ বিমল আনন্দ উপভোগ করে। জগতে কিছু মানুষের আচরণ বড় অদ্ভুত!