খেলাপি ঋণে সঞ্চিতি বেড়েছে ২৫ শতাংশ|148436|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০
খেলাপি ঋণে সঞ্চিতি বেড়েছে ২৫ শতাংশ
আলতাফ মাসুদ

খেলাপি ঋণে সঞ্চিতি বেড়েছে ২৫ শতাংশ

আগ্রাসী ঋণ বিতরণের মাধ্যমে সুদ আয় বাড়লেও তা দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফায় তেমন প্রভাব ফেলছে না। খেলাপি ঋণের কারণে পরিচালন মুনাফার উল্লেখযোগ্য অংশই সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ বেড়েছে ২৫ শতাংশ। আর এ সময় ব্যাংকগুলোর সুদ আয় বেড়েছে ১৮ শতাংশের বেশি। চলতি প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, খেলাপি ঋণ বাড়ার তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ২৩টিতে সঞ্চিতি বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বেশি। এর মধ্যে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সঞ্চিতি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, ৩৫০ শতাংশ।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় ভালো গ্রহীতাদের কিছু অংশ এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে না। এ ছাড়া যেসব ঋণ আদালতের রিটের কারণে খেলাপি দেখানো যায়নি, সেসব রিট এখন ভ্যাকেট (শূন্য) হয়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। অনেকে আবার ঋণ পুনঃতফসিল করেও কিস্তি না দেওয়ার কারণেও খেলাপি বাড়ছে।

গত ১৬ মে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ২ শতাংশ এককালীন জমায় মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ও ১০ বছরের মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তীকালে উচ্চ আদালত সুবিধাটি আটকে দেয়।

২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। সে সময় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা বা ৬ শতাংশ। আর চলতি প্রথম প্রান্তিকে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।

আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের সুদ ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ সময় এসব ব্যাংকের সম্মিলিত সুদ আয় হয় ৫ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। চলতি প্রথম প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয় ১০ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি।

তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে এ ব্যাংকটি খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৩০২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

এক বছরে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সঞ্চিতি বেড়েছে ৩৪৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে এ ব্যাংকটির সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা চলতি বছরের একই সময়ে ১৩৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। যদিও ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফাও চলতি প্রথম প্রান্তিকে ২৫ শতাংশ বাড়ে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের সঞ্চিতির কারণে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে গেছে প্রায় ২৬ শতাংশ।

মন্দঋণের বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের সঞ্চিতি বেড়েছে ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চিতির পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১১০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে সাউথইস্ট ব্যাংক সঞ্চিতি রেখেছে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে সঞ্চিতিতে ছাড় পেলেও এবার ৬৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চিতি ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চিতি ১৮৮ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংকটিতে চলতি প্রথম প্রান্তিকে ৯০ কোটি ৬১ লাখ টাকা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে। একই সময়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সঞ্চিতি বেড়েছে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে ট্রাস্ট ব্যাংক সঞ্চিতি রেখেছে ৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া আরব বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৭৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, এনবিএল ৩৫ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ৪৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৮১ কোটি ৮১ লাখ টাকা, আইএফআইসি ৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, এনসিসি ৮৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ওয়ান ব্যাংক ৬১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৪২ কোটি টাকা, রূপলী ব্যাংক ২১ কোটি ৮ লাখ টাকা, শাহজালাল ব্যাংক ৪৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা চলতি প্রথম প্রান্তিকে সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করেছে। বিপরীতে সিটি, ইস্টার্ন, এক্সিম, যমুনা, স্ট্যান্ডার্ড, ইউসিবি ও উত্তরা ব্যাংকের সঞ্চিতি আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ঋণদান প্রক্রিয়ায়ও গলদ রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিরও অভাব রয়েছে, যার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঋণমানের উন্নতি ঘটাতে হবে। আর খেলাপির কারণে যেসব টাকা আটকে গেছে, তা উদ্ধারে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, সঞ্চিতি বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমবে। ফলে শেয়ারের দর কমে গিয়ে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মূলধন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।