জমিলার আরেক সংসার|148795|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০
জমিলার আরেক সংসার
আব্দুল মোমেন

জমিলার আরেক সংসার

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের এক গ্রামের বাজারের কসাই তিনি। দিনে তিন-চারটি, শুক্রবারে আট-দশটি আর ঈদে ৬৫-৭০টি গরুর মাংস কেটে বিক্রি করেন। নিপুণ ব্যবসায়ী জমিলা বেগমের ক্রেতা পাশের নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও এমনকি পঞ্চগড়ের মানুষও। তাকে নিয়ে লিখে, ছবি তুলেছেন আব্দুল মোমেন

 

চারপাশে ইট, সিমেন্টের দেয়াল, মাথার ওপরে টিনের ছাউনি। দোকানের সামনে কোনো ঝাঁপ নেই। খোলা বা বন্ধ করার কোনো উপায়ও নেই। তাতে কি প্রতিদিন সকালে মাছি মারার ওষুধ দিয়ে দোকানটি মাছিমুক্ত করা হয়। কর্মচারীরা প্রতিদিন নিয়ম করে এই নির্দেশ পালন করেন। ঝাড়ু দিয়ে মুছে তাদের ঘর পরিষ্কার রাখেন। এই দোকানের মালিক জমিলা বেগম এখনো নিজে গিয়ে গরু কেনেন। আগে দালালরা ভালো গরু চিনিয়ে দিতেন, কিন্তু ২০ বছরের টানা অভিজ্ঞতায় এখন গরুর গায়ে হাত দিলেই তিনি বুঝতে পারেন, সেটি সুস্থ নাকি কোনো রোগে আক্রান্ত। তেমন কোনো গরু কোনো দিন শত অভাবেও কেনেননি তিনি। ফলে তার কোনো গরু কিনে আনার পর কখনো মরেনি। তারপরও তার শান্তি হয় না। জমিলা নিয়ম করে তাদের দেবারু পাড়া গ্রামের গরুর ডাক্তারকে (পশু চিকিৎসক) দিয়ে প্রতিটি গরু রোগমুক্ত আছে কি না পরীক্ষা করান। গরু নিয়ে এসে ‘মায়ের দোয়া মাংস ভান্ডার’র পাশের খোলা মাঠে জমা করেন। সে জন্য বাজার কমিটির মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের খাতে গরুপ্রতি ৬০ টাকা দিতে হয়। রাতে সেগুলোর পাহারায় থাকেন কর্মচারীরা, ছেলে জহিরুল ইসলামও ঘুরে দেখেন। ভোর সকালে জমিলা ওদের সঙ্গে বরাবরের মতো কথা বলেন। শেষ বিদায় নেন। সকালে বাজারের পাশের মসজিদের ইমামকে দিয়ে জবাই করান। তিনি গরুপ্রতি পান ৪০ টাকা।

গরুগুলোর মাংসে যাতে কোনো ধরনের ধুলোবালি না পড়ে, সে জন্য দোকানের সামনে তারা মশারি বা পাতলা কাপড় টাঙিয়ে দেন। মাংস হাড় থেকে আলাদা করে, বড় বড় টুকরো করে রাখেন সবাই মিলে। এরপর নিজের হাতে জমিলা ছোট ছোট করে মাংস কাটেন ও আধুনিক মেশিনে মাপ দেন। বিয়েবাড়ি, ছেলেদের আকিকা, খতনাসহ আশপাশের গ্রাম-শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তার দোকানের মাংস যায়। বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানের ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাংস সরবরাহ করেন। তাদের দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার আশপাশের উপজেলা, পাশের জেলা নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও এমনকি পঞ্চগড় থেকেও ক্রেতারা তার দোকানের মাংস নিয়মিত কিনতে আসেন। বন্ধের দিন সোমবার বাদে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারটি গরু জবাই হয় এই দোকানে। তাতে সাত-আট মণ মাংস পান তারা। শুক্রবারে বিক্রি বেড়ে যায় বহু গুণে। ৯ থেকে ১০টি গরু সেদিন কেটে বিক্রি করতে হয়। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসেন জমিলা। মাঝে খাওয়া ও সামান্য বিশ্রাম বাদে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা কাজ করেন। আগের মতো শরীরে এখন আর বল পান না ৪৮ বছরের এই নারী। তারপরও না এসে পারেন না। অন্যবারের মতো এই রোজার ঈদেও তাকে অনেকগুলো গরু কেটেছেন।  এবার ৮০টি গরু কিনেছেন। ৪০ লাখ টাকার বাজেট ছিল। প্রতিবারের মতো ১৫ রোজার পর থেকে হাটে হাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এবারও গিয়েছেন এলাকার গরয়া, কাহারোল, পাকের হাট, রেলবাজার ও বীরগঞ্জের হাটে। অন্য সময় তার ছেলে জহিরই যান। জমিলা এসেছেন দেখে এখনো গরুর ব্যাপারীরা বাকিতে গরু দিয়ে দেন। তার দোকানের নামেও বাকি চলে। অনেক বছর আগে ১০০ টাকা রোজগার পকেটে নিয়ে গিয়েছিলেন হাটে। তাকে দেখেই চিনে ফেলেছিলেন ব্যাপারীরা। বাকিতে দুটো গরু দিয়েছিলেন। পরে মাংস বিক্রি করে টাকা শোধ করেছেন। এখনো সেই বহু বছরের নিয়মে বাকি শোধ করেন। ব্যাপারীদের পরে গরুপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দেন। প্রয়োজনে সে নিয়মেই এক বা দুদিনের জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নেন। তার লাভ অল্প, বিক্রি বেশি। প্রতি কেজি মাংসের গড় দাম ৫০০ টাকা। হাড় বা হাড্ডি এখানে বিক্রি হয় না। সেগুলো আলাদা করে কেজি দরে হালিমের দোকানদারের কাছে চলে যায়। হয়তো কোনো দিন মাংস থেকে যায়। বাকিতে আত্মীয়রা সেগুলো কিনে নিয়ে যান। এই দোকানে দেশি, আড়িয়া গরুর মাংস কাটা হয়। গায়ের রং, খাবারের অভ্যাস, চামড়া ও পা দেখেই তিনি দেশি গরু চিনে ফেলেন। বলেন, আড়িয়া বা সুস্বাদু ষাঁড় গরুর চাহিদাই বেশি। এই গরুর মাংসে লাভ বেশি, মাংসও বেশি।

তিনি একসময় ৪০ টাকা থেকে মাংস বিক্রি শুরু করে আজকের এ পর্যায়ে এসেছেন। বাজারের ১৫টি মাংসের দোকানের মাত্র চারটি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তার এই সাফল্যের একমাত্র রহস্য ‘সততা’। বলেন, ‘মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসা করলে ক্ষতি হয়। তবে সৎ থাকলে ব্যবসায় সফলতা আসে।’ এখন এক টাকা না নিয়ে হাটে গেলেও শ-খানেক বা যত ইচ্ছা গরু নিয়ে ফিরতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন। তবে এখন তিনি সব সময় হাটে যেতে পারেন না। একমাত্র ছেলে ৩৩ বছরের জহিরুল ইসলাম ও কর্মচারীরা হাটে যান। গরু কেনা থেকে সব কাজ করেন।

ক্রেতাদের এখনো জমিলা বেগমের ওপর খুব আস্থা। তিনি ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন। শুরুতে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন ক্রেতা আসতেন, এখন দিনে গড়ে দেড় শ ক্রেতা তার দোকান থেকে মাংস কেনেন। শুক্রবারে তারা হয়ে যান ডাবল। খুব আস্থাবান বানার হোসেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক মতিউল ইসলামের মতো ১৫ বছরের পুরনো ক্রেতাও কয়েকজন আছেন। তারা যেন তার আত্মীয়। তিনি গরুগুলোর চর্বি ও ভুঁড়ি আড়াই থেকে ৩০০ টাকা দরে আলাদা বিক্রি করেন। প্রতি পিস চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা হিসেবে বিক্রি হয়। দোকানের ট্রেড লাইসেন্স করেছেন ‘মায়ের দোয়া মাংস ভান্ডার’। এই নামটি তার মা ফুল বেওয়া খাতুনের নামে রাখা। আরও লিখেছেন ব্যানারে ‘সততাই ব্যবসার মূলধন’। ফলে এখনো তার নিজের গরু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি। এই কোরবানির ঈদে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কর্মচারীদের বেতন, গরু রাখার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের দিনে খরচ বাদে হাজার দু-এক থাকে। এখন দোকানে আছেন পাঁচ কর্মচারী। তারা ২১ বছরের নয়ন ইসলাম, ২২ বছরের নাসির হোসেন, ২৫ বছরের ফরিদ হোসেন, ২৯ বছরের শামীম রানা ও ৩০ বছরের কাবেল উদ্দিন। তারই আত্মীয়, অভাবে পড়েছেন। তাদের চাকরি দিয়ে রেখেছেন। বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

জমিলার সংসার জীবন শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্যভাবে। ভালো পরিবারের মেয়ে তিনি। চার বোন ও এক ভাইয়ের তৃতীয়। বাবা জাকির হোসেন ছিলেন পাইকারি পান বিক্রেতা। মা বলেছিলেন, জমিলা বেগমের জন্ম ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই। গরিবের মেয়ে। অভাব ও লোকলজ্জা তাকে লেখাপড়া শিখতে দেয়নি। তখন অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার চল ছিল। ফলে ১৫ বছর বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দিলেন বাবা। পাত্র বগুড়ার ছেলে, পেশা কসাই। নাম রফিকুল ইসলাম ভান্ডারি। তাদের বাজারেই তার দোকান। বাড়ি বগুড়ার গোকুল গ্রামের উত্তর পাড়ায়, স-মিল এলাকায়। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে দোকানে অবসরে বসতে বসতে চোখে দেখে অনেকটাই কসাইয়ের কাজ শিখে ফেললেন জমিলা। দেড় বছরের মধ্যে সংসার আলো করে জহিরের জন্ম হলো। এরপর দ্বিতীয় সন্তানের কামনা করছিলেন স্ত্রী। তবে তত দিনে জমিলা জেনে গেছেন, তার স্বামীটি মাদকাসক্ত। মাদক খেয়ে স্ত্রীকে বাড়িতে এসে মারধর করতেন। পরে জানা গেল, তার আরও একটি স্ত্রী আছে। বিভিন্নভাবে মানুষের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা ধার করলেন রফিক। এরপর চলে গেলেন। ফলে ২০০০ সালে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন গর্ভবতী মেয়ে ও তার ছোট্ট সন্তান। বাবার সামান্য সাড়ে ৫ শতাংশ জমিই তাদের ভরসা। এই জমিটিই মায়ের অনুমতি নিয়ে বিক্রি করলেন। বাজারে এই জায়গা কিনলেন। মেয়ে কসাইয়ের কাজ করেন, মা নাতি-নাতনি সামলান। মা তার সর্বক্ষণের উৎসাহ। তখন তাদের তিনবেলা খাবার জোটেনি। দোকানের চারপাশে কাপড় দিয়েও তাদের থাকতে হয়েছে। এভাবে চলেছে। মহিলা মানুষ, বাজারের কসাইয়ের দোকান দিয়েছেন এই বলে অন্য কসাইরা আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে তার নামে বাজার কমিটি, পরে না পেরে থানা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদেও অভিযোগ করলেন। নারী হয়ে ব্যবসা করবেন, ধর্ম সইবে না। তবে ভালো ব্যবহার ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করে নিজেকে আড়াল করে রাখলেন তিনি। সাধারণ ক্রেতারাও এই ভালো ব্যবসায়ীকে ব্যবসা থেকে সরতে দেননি। তখন থেকে তিনি ভাগ্য বদলানোর জন্য নেমেছেন। নিজেকে আস্তে আস্তে প্রমাণ করেছেন। ছেলেমেয়েরাও বড় হয়েছেন। স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি। মাংস বিক্রির টাকা দিয়েই দোকানের কয়েক গজ দূরে জমি কিনে বাড়ি করেছেন জমিলা বেগম। ২০১৫ সালে সাড়ে চার শতাংশ (দুই কাঠা) জমি তিনি সাড়ে চার লাখ টাকায় কিনেছেন। ইটের পাকা বাড়ি আছে তার। এক ঘরে তিনি ও মেয়ে; আরেক ঘরে জহিরুল ও তার বউমা, তাদের সন্তান থাকেন। তাদের ঘরে ঘরে আলো আছে। পরে আরও ১০ শতক (পাঁচ কাঠা) জমি কিনেছেন। সেই ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি। ছেলেকে ছোট থেকে ব্যবসায় সঙ্গী করতে হয়েছে বলে লেখাপড়া করাতে পারেননি। তবে মেয়ে সোহাগী আক্তার এখন নাইনে পড়েন। ঝাড়বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। “শুরুতে ‘তোর মা কসাই’ অনেকে বলত, মিশতেও চাইত না কেউ কেউ। তবে ভালো ছাত্রী হয়ে সে সমস্যার সমাধান করেছি”Ñ বললেন সোহাগী। তাকে প্রতিক্ষণ সময় দেওয়া মায়ের সময় হয়ে ওঠে না। বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কী, পড়ছে কী নাÑ খবর রাখতে ভুল হয় না। তাকে তিনি উচ্চশিক্ষিত করতে চান। স্বামী বেঁচে থাকলেও সম্পর্ক নেই। আজীবন কসাইয়ের ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। কারণ এখনো ক্রেতারা তাকে না দেখলে মাংস কিনতে চান না। ২০ বছরের অন্য এই সংসারে আসতে না পারলে তারও ভালো লাগে না।