ঢাকা মহানগরের বৃক্ষকাহন|149161|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০
ঢাকা মহানগরের বৃক্ষকাহন
ফিরোজ আহমেদ

ঢাকা মহানগরের বৃক্ষকাহন

ঢাকার বহু সড়কে এবং উদ্যানে বৃক্ষ পরিকল্পনা ঠিক যেন কোনো কাষ্ঠ ব্যবসায়ী করেছিলেন! যেন অদূরেই তার কোনো কাঠচেরাইয়ের কারখানা আছে, সেখানে সরবরাহ অটুট রাখার জন্য মেহগনি, মেহগনি আর মেহগনির অরণ্য। বৃক্ষ হিসেবে মেহগনির বিরুদ্ধে আলাদা কোনো বিরাগ থাকার কিছু নেই। বরং নিজের ঋতুতে খুব কড়া মিষ্টি গন্ধের অথচ প্রায় দৃষ্টির অগোচরে থাকা একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফুল ঝরানো গাছটির অর্থনৈতিক মূল বিশাল। ১৯৮০-এর দশকের বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস লিখতে গেলে, কৃষি, অবকাঠামো প্রভৃতি খাতে মেহগনির ভূমিকা বিশেষভাবে লিখতে হবে। সেই ভূমিকা আছে এমনকি ইউক্যালিপটাসেরও, কিন্তু সে ভিন্ন আলাপ। কিন্তু গাছ তো কেবল কাঠ হিসেবেই মূল্যবান নয়। এর নান্দনিক সৌন্দর্যের গুরুত্ব আছে, আছে ফল হিসেবে, ফুল হিসেবে মানুষ থেকে শুরু করে পোকামাকড় পর্যন্ত সবার খাদ্য হিসেবে এর উপস্থিতির তাৎপর্য। সেই কারণে নগরে বৃক্ষরোপণের সময়ে গাছের বাণিজ্যিক মূল্যের সঙ্গে এসব মূল্যকেও আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েই ভাবা দরকার। সবার আগে মনে রাখতে হবে, শৌখিন বাড়ির ছাদ আর উদ্যান কিংবা সড়কের প্রয়োজন আলাদা, সেই নিরিখেই তাদের আলাদা আলাদা সৌন্দর্যের গড়ন পরিকল্পনা করতে হবে। সেই জন্য পরিকল্পনাবিদ, স্থপতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিবিশারদ, বৃক্ষবিশারদ এবং উদ্যান বিশারদের সঙ্গে এমনকি প্রাণীবিদের মধ্যেও শক্তপোক্ত বোঝাপড়া জরুরি। শুধু ঠিকাদারি মনোবৃত্তির মুনাফার ঝোঁক দিয়ে এটি অর্জন করা সম্ভব হবে না।

 

ঢাকার গাছপালার পরিকল্পনায় সবচেয়ে কম দেখা যাবে ফলের গাছ। বিশেষ করে দেশি ফলের গাছ। কেন যেন খাদ্য জোগান দেয়, এমন কিছুর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের প্রতি আমলা মনোভাবের ব্যক্তিদের একটা অপ্রীতি আছে। ফলের গাছ? তার নিজস্ব বাগানবাড়িতে তা থাকবে। কিন্তু জনপরিসরে পরিকল্পনা করার ক্ষমতাও যেহেতু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন, সবার জায়গাতে তারা রাখবেন বিমূর্ত নান্দনিক সৌন্দর্য, কিংবা লাভজনক কাঠের গাছের সারি। হাতিরঝিল কিংবা ধানম-ি হ্রদের এলাকাগুলোতে ফলের গাছ প্রায় নেই। রমনার কিছু নির্বাচিত এলাকা বাদ দিলে কোনো নান্দনিক আবেদনও তৈরি করে না এসব বৃক্ষরাজি। ওসমানী উদ্যানের সঙ্গে রমনা উদ্যানে পাখিদের তুলনা করলেই বোঝা যাবে, গাছের পরিকল্পনাটা জীবনের জন্য কতটা জরুরি। রমনাতে বেশ কিছু খামতি থাকা সত্ত্বেও সেখানে ওসমানী উদ্যানের চেয়ে প্রাণপ্রাচুর্য বেশি। কারণ রমনার পরিকল্পনায় উদ্যানবিদের হাত আছে, যদিও তা ঔপনিবেশিক সৌন্দর্যবোধ আর প্রয়োজন দিয়ে চালিত। ভৌগোলিক দিক দিয়ে ঢাকা বলতে গেলে দেশের কাঁঠালের রাজধানী অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। রাজশাহী অঞ্চল যেমন গঙ্গার তীর ধরে আগানো আম্র সাম্রাজ্যের বলা যায় শেষ প্রান্ত, কাঁঠাল তেমন ঢাকা-গাজীপুর অঞ্চলের বিশেষ ফল। ঢাকার সড়কে কাঁঠালগাছ কতগুলো দেখা যাবে?

 

সড়কে ও উদ্যানে ফলগাছ লাগানোর বিরুদ্ধে কর্তাদের আপত্তিটা কী? আমি বহুবার জিজ্ঞেস করে করে একটা উত্তর আঁচ করেছিলাম, তারপর আকস্মিক একজন বলেই ফেললেন, ‘মানুষ খেয়ে ফেলবে’। অথচ মানুষ খাবে বলেই এসব গাছপালার আয়োজন থাকাটা জরুরি ছিল। চাইলে এমনকি এগুলোর সীমিত বাণিজ্যিক বিপণনও সম্ভব ছিল। কিন্তু সড়কে এবং উদ্যানে যদি ঢাকার প্রয়োজনীয় ফলের একটা বড় অংশ উৎপাদন হয়, সেটা শুধু স্বাস্থ্যকর আর তাজা, রাসায়নিক মুক্ত খাবারের নিশ্চয়তা দিত না, ঢাকার পরিবেশকেও অনেকখানি নিরাপদ রাখত। তাপমাত্রা কমিয়ে রাখতে সক্ষম হতো। হাতিরঝিলের মতো এলাকার কথাই ভাবুন। সেখানে বেড়াতে যাওয়া মানুষগুলো যদি সরকারি কিংবা আধা সরকারি ব্যবস্থাপনায় সুলভে জন্মানো নানা ফলও খেতে পারত, কোনো সন্দেহ ছাড়াই সেটা একটা বিরাট পর্যটন আকর্ষণ তৈরি করত। একই কথা ভাবা সম্ভব বুড়িগঙ্গার তীর ধরে সড়ক ও খাসজমিগুলোতে। শত শত প্রজাতির দেশি (ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশিও) প্রজাতির ফলের গাছ এখানে রোপণ করা রীতিমতো জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফলের গাছের বাইরে আছে আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ গাছ, যেগুলো সাংস্কৃতিক বা নান্দনিক মূল্য অপরিসীম। বলধার উদ্যানে একটা অপূর্ব গাছ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, খয়েরি সাদাটে নরম শরীরের একটা গাছ, বাকলগুলো স্তরে স্তরে আলগা হয়ে আসে। তার নাম হলো ভূর্জপত্র! হিমালয় অঞ্চলের গাছ, প্রাচীন পুঁথিপত্র লেখা হতো এই গাছেই। নিমেষেই যা আপনাকে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেয়, এমন একটা গাছ তো প্রতি পাড়াতে অন্তত একটা থাকার কথা। এমন কথা বলা যেতে পারে বাওবাব, রুটিফল প্রভৃতি বিদেশি গাছের বেলাতেও। থাকুক অন্তত একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর। শিশুরা দেখে দেখে যুক্তবোধ করুক নিজের দেশের মতোই বিশ্ব ইতিহাসের সঙ্গে।

 

বৃক্ষ পরিকল্পনা এমনও হওয়া দরকার, যেন পুরো ঢাকার সবগুলো এলাকার একটা সবুজ-সংযোগ তৈরি হয়। যেন এক এলাকা থেকে পাখি, পতঙ্গ, প্রাণী ও ছোটখাটো সরীসৃপের মতো জীবরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর অভাবে ঢাকাতে মশারা প্রায় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কেননা, মশারা যাদের নিয়মিত খাদ্য, সেই পতঙ্গ, পাখি ও আর সব প্রাণী খুবই কায়ক্লেশে জীবনযাপন করছে এই শহরে। মশার অন্যতম বড় শত্রু ফড়িং ঢাকা থেকে প্রায় উধাও হয়েছে। শহরের সড়কে এই অবিবেচক বৃক্ষরোপণ জনস্বার্থকেই বিপন্ন করছে। গাছে যদি ফল-ফুল-মধু হয়, পতঙ্গরা যদি তার আকর্ষণে সেখানে আসে আর সেটা যদি কোনো না কোনোভাবে সারা বছর এমন সমৃদ্ধ থাকে কোনো না কোনো গাছের সূত্রে, মশা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণই এ শহরে থাকবে না। ফলের গাছের মতোই ফুলের গাছ নিয়েও ভাবাটা জরুরি। সৌন্দর্যবোধ আর পরিকল্পনা যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়। সড়কে যেখানে ছায়া দরকার, সেটি নিশ্চিত করে আর সব প্রাণীদের বাসস্থান নিশ্চিত করে, ফুল-ফল-মধু-পতঙ্গের বন্দোবস্ত নিশ্চিত করে, তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই তারপর জায়গা অবশিষ্ট থাকলে মৌসুমি ফুল কিংবা অন্যদের কথা ভাবা উচিত। উদ্যানে আবার পুষ্প এবং বৃক্ষের প্রয়োজনীয় ভারসাম্য থাকা উচিত। কিন্তু কোনোভাবেই যেন নিছক সৌন্দর্যবোধ প্রাকৃতিক প্রয়োজনীয়তার বোধকে, ভারসাম্যকে ছাড়িয়ে না যায়। গাছ লাগাতে হবে, তাই ফরমায়েশি ঠিকাদারকে দিয়ে যেকোনো একটা কিছু লাগিয়ে ফেলার কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই সবচেয়ে বেশি প্রকট। হাতিরঝিলের অপর্যাপ্ত ও পরিকল্পনাহীন গাছপালা দেখে ভয় হয়, ঢাকার যে উদ্যানগুলো প্রকৌশলীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, নতুন করে সেগুলোর বন্দোবস্ত করার জন্য, সেগুলোও কি সেই জনসম্পৃক্ততাহীন ইট-কংক্রিটের কাঠামোর সঙ্গে দু-চারটা এটা-সেটা গাছের ঠাঁই হবে, নাকি সেখানে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হবে উদ্যানটি যারা ব্যবহার করেন, সেই নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনা আর যথাযথ গাছপালাকে? আর ঢাকায় যেহেতু উদ্যানের পরিমাণ এমনিতেও প্রয়োজনের চেয়ে বহু গুণ কম, তাই সড়কগুলোকেও বৃক্ষরোপণের বেলায় বিশাল গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। ঢাকার সড়কগুলো কাঠবাদাম, ছাতিম, গগনশিরীষসহ হাজারো রকমের অজস্র বৃক্ষসারিতে ভর্তি হয়ে যাক, ঢাকার গাছরা, ফুলরা, মৌমাছিরা পরিণত হোক তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশে।

 

লেখক : রাজনীতিক ও কলামনিস্ট