সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আজ|149895|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জুন, ২০১৯ ০০:০০
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আজ
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আজ

১৮-১। গোলের ব্যবধান নয়। জয়-পরাজয়ের। তার মানে আজ কিংবদন্তি দস্যুবীর রবিন হুডের নটিংহ্যামের ট্রেন্ট ব্রিজে অস্ট্রেলিয়া অসম্ভব এগিয়ে। এগিয়ে তারা ২০১৯ বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচের চারটিতে জিতেও। যেখানে সমান ম্যাচে দুই জয়ে দেয়ালে এখনো পিঠটা ঠেকে আছে প্রতিপক্ষের। কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষে এখন কোনো প্রতিপক্ষকে ‘ফেভারিট’ বলবেন কীভাবে!

সাকিব আল হাসান এখন একদিক দিয়ে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে যেভাবে ৩২২-এর লক্ষ্যে ছুটে বিরাট ব্যবধানে সহজে রেকর্ডগড়া জয় তুলল সেদিন বাংলাদেশ, তাতে সবার চোখ ছানাবড়া। বিশ্বকাপের আরেক বিজ্ঞাপন তাই বাংলাদেশ দলও। তারা আগে ব্যাট করলে ৩৩০ রান করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে। আবার প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে জিতে প্রবল হুঙ্কারে ঘুরে দাঁড়ায়।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একমাত্র সুখস্মৃতিটা সেই ২০০৫ সালের। কার্ডিফে মহাকাব্যিক জয়টা এখনো মুখে মুখে ঘোরে। সেই যুক্তরাজ্যে এমন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করতে থাকা দলটির পক্ষে আরেকটা জয় তুলে নেওয়ার দিন কেন নয় এটা তাহলে? হ্যাঁ, ২০ দেখায় ১৮টিতে হেরেছে। তাই বলে ‘ডার্কহর্স’ বাংলাদেশ আরেকবার প্রচণ্ড গর্জনে আকাশে চির ধরাতে কেন পারবে না?

বাংলাদেশ দলের প্রত্যেকে বিশ্বাস করেন, ‘পারব’। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে সাকিব বলে গেলেন, তাদের না পারার কোনো কারণ নেই। আর ২০১৫ সাল থেকে বদলে যাওয়া মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার দল তো ভবিষ্যতে ক্রিকেট ফোকলোরের গবেষণার বিষয় হতে বাধ্য।

পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া খুব জানে, অতর্কিত এক লাফে বাঘরা তাদের টুঁটি চেপে ধরতে পারে। কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে মাঝের দিনগুলোতে তাই খুব মাথা ঘামাতে হয়েছে। দুরন্ত অলরাউন্ডার মার্কাস স্টয়নিসকে ফিট করে তুলতে দলের চিকিৎসা বিভাগ সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের বিপক্ষে তাকে নামাবেন কি না সেই প্রশ্ন সচতুরভাবে এড়িয়ে যান প্রধান কোচ।

সাকিবের বাঁহাতি স্পিন অস্ট্রেলিয়ার আরেক মাথাব্যথার নাম। সঙ্গে মেহেদী হাসান মিরাজ কিংবা অকেশনাল স্পিনার মোসাদ্দেক হোসেনও। তাদের ভারতীয় স্পিন বোলিং উপদেষ্টা শ্রীধরন শ্রীরামও ব্যস্ত-সমস্ত সারাক্ষণ। ইংল্যান্ড সফরে থাকা অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দল থেকে বাঁহাতি স্পিনার অ্যাস্টন অ্যাগারকে তাই টানা হয় অস্ট্রেলিয়ার নেটে। দুই ভারতীয় রিস্ট-স্পিনার প্রদীপ সাহু ও কেকে জিইয়াও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নেট বদলাতে থাকেন। নিয়মিত।

বিশ্বকাপের আগে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টানা জয়ে অস্ট্রেলিয়ার কারিগর ছিলেন নাথান লায়ন ও অ্যাডাম জাম্পা। গেল দুই ম্যাচে স্টয়নিসের অনুপস্থিতিতেও তারা বসে। কারণ, এটা এখনো পেসারদের বিশ্বকাপ। শীর্ষ দশের সাতজনই সিমার। অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কের ১৩ উইকেট। প্যাট কামিন্সের ১১। সাত নম্বরে বাংলাদেশের মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের ৯ উইকেট। ১১-তে অবস্থান যার সেই ‘কাটার মাস্টার’ মোস্তাফিজুর রহমানের ৭টি। অস্ট্রেলিয়া তাই পেস বোলারদের নিয়ে ঝাঁপাবে। স্পিন সামলাবে।

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা দুই ম্যাচে বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে পরাজিত। তা ১৯৯৯ ও ২০০৭-এ। গেল আসরেরটি বৃষ্টির কারণে হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, তারা বৃষ্টি চান না। ১ নয়, পুরো ২ পয়েন্ট নিয়ে সেমিফাইনালের দিকে আরেকধাপ এগোনো একমাত্র লক্ষ্য।

মাশরাফীর এই একাদশটাকে আপাতত ‘ড্রিম ইলেভেন’ বলাই যায়। এমন না যে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারলেই তাদের সেমির স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। নিজেদের আগের অর্জন সামনেও টিকিয়ে রাখবে আশা। ভারত-পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার আগে আত্মবিশ্বাসের পারদটাকে আরেকটু চড়িয়ে নিলে তার কি আর তুলনা চলে। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়াকে দীর্ঘকাল বধ করা হয় না। এই অতৃপ্তিও মেটে।

ব্যাটিংয়ে তামিম ইকবাল, সাকিব, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহর খেলা ম্যাচের যোগফল হাজারের মতো। এমন অভিজ্ঞ ব্যাটিং কার আছে এই আসরে? তার ওপর যে ফর্মে আছেন সাকিব। তামিম ফিরছেন। শুরু থেকেই মুশফিক রানে আছেন, শেষ ম্যাচে কেবল বিপত্তি ঘটেছিল। গেল বিশ্বকাপে দুই সেঞ্চুরি হাঁকানো মাহমুদউল্লাহ রান করলেও নিজেকে প্রমাণের বড় সুযোগ এখনো পাননি। এর মধ্যে বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচ খেলতে নেমে লিটন কুমার দাস কী কাণ্ডটাই না করলেন সেদিন! ক্যারিবিয়ান বোলিং তছনছ করেছেন তারুণ্যের প্রতিভাময় স্পর্ধায়। নিচে মোসাদ্দেক হোসেনকে মনে আছে তো? আয়ারল্যান্ডে ফাইনালে যা করেছেন তা তো অমরকীর্তি। একেবারে ওপরে সৌম্য সরকার প্রতি ম্যাচে দুর্দান্ত শুরুর পরও ইনিংস বড় করতে পারছেন না বলে আজও পারবেন না?

ফিল্ডিং সব দুশ্চিন্তা ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে শেষ ম্যাচের দুর্ধর্ষ প্রমাণে। বোলিংয়ে মাশরাফী দ্য বস। উইকেট না পেলেও লম্বা স্পেলে প্রতিপক্ষকে রান করতে দিচ্ছেন না। সাইফউদ্দিন খরুচে হচ্ছেন। ‘ফিজ’ নিজেকে ফিরে পাচ্ছেন। গেল ম্যাচে শেষটায় যখন ঠেকানো যাচ্ছে না ক্যারিবিয়ান ব্যাটারদের তখন এক ওভারে দারুণ মূল্যবান জোড়া উইকেটে সাতক্ষীরার অমিত প্রতিভাবান বাঁহাতি বোলারই তো ফেরালেন দলকে। সাকিব-মিরাজ নিয়মিত ভালো করছেন।

কিন্তু চিন্তার জায়গাটা মাঝের ওই বোলিং। এ মাঠেই ইংল্যান্ডের সেই ৪৮১ রানের রেকর্ড। আর বাংলাদেশ ডেথ ওভারের কাছাকাছি গিয়ে খেই হারানোর ঝামেলা এখনো পুরো এড়াতে পারেনি। অ্যারন ফিঞ্চের দুর্ধর্ষ ইনফর্ম ব্যাটিং লাইনআপের কঙ্কাল বের করতে তাই শুরুতে আরও বেশি উইকেটের চেষ্টা থাকবে বাংলাদেশের। আরও ভালো বোলিং মাঝে। এবং দুর্দান্ত ফিনিশিং। পেসাররা অবশ্য আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন। বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ স্টিভ রোডস ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশকে নিয়ে বিশ্বাস আরেকটু ঝালিয়ে নেওয়ার কাজ সেরেছেন অবসরে।

এবার লড়ার পালা। মাশরাফীর সেই বিখ্যাত উক্তি ‘ধইরে দিবানি’ কিন্তু ট্রেন্ট ব্রিজে উপস্থিত সিংহভাগ বাংলাদেশি দর্শকের প্রাণে-মুখে উচ্চারিত হওয়ার অপেক্ষায়। যেন নিজের ঘরেই খেলবে টাইগাররা। তাহলে? ক্রিকেটবিশ্ব কি আরেকটি বড় ঝাঁকুনি খাওয়ার প্রতীক্ষায়? প্রশ্নটা সহজ হলেও জবাব এখনো অজানা।