বিনিয়োগের প্রধান বাধা তিনটি|150933|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০
বিনিয়োগের প্রধান বাধা তিনটি
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিনিয়োগের প্রধান বাধা তিনটি

প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংস পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হলে তার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। ঘোষিত বাজেটে ট্রেড লাইসেন্সের ওপর আরোপিত বাড়তি করের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, এতে ব্যবসা আরও কঠিন হবে। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশ পাঁচ ধাপ পিছিয়ে যেতে পারে। 

গতকাল সোমবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম। মূল রিপোর্ট তুলে ধরেন গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমলেও বাংলাদেশে বেড়েছে। ২০১৮ সালে দেশে বেড়েছে ১৪৬ কোটি ১৮ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৬৮ শতাংশ। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কেননা বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংসের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব বিবেচনা করা ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস খুব শিগগিরই কার্যকর করা হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদায়ী ২০১৮ সালে দেশে এফডিআই এসেছে ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। ২০১৭ সালে যা ছিল ২১৫ কোটি ১৫ লাখ ডলার। প্রতিবেদনে মোট বিনিয়োগকে তিনটি স্থরে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নতুন বিনিয়োগ, কোম্পানির আয় পুনরায় বিনিয়োগ এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে নিজস্ব ঋণ। প্রতিবেদন অনুসারে আগের বছরের ২১৫ কোটি ১৫ লাখ ডলারের বিপরীতে ২০১৮ সালে মোট এফডিআই এসেছে ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে নতুন বিনিয়োগ হয়েছে ১১২ কোটি ৪১ লাখ ডলার, পুনরায় বিনিয়োগ ১৩০ কোটি ৯১ লাখ ডলার এবং কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১৮ কোটি ডলার। খাতভিত্তিক বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১০১ কোটি ২০ লাখ ডলার, খাদ্য খাতে ৭২ কোটি ৯৬ লাখ ডলার, বস্ত্র খাতে ৪০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ব্যাংকিং খাতে ২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার, টেলিকম খাতে ২১ কোটি ৯৮ লাখ, বাণিজ্য খাতে ১০ কোটি ১৯ লাখ এবং অন্যান্য খাতে ৭৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় জমির অভাব, অবকাঠামো স্বল্পতা এবং বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুইং (বিজনেস সহজ ব্যবসা করার সূচক) র‌্যাঙ্কিং বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা। বর্তমানে ১৯০টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬। তবে এ অবস্থার উত্তরণের জন্য কাজ চলছে বলে জানিয়ে সালমান এফ রহমান বলেন, ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে বিশ^ব্যাংকের ডুইং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে ৫০তম অবস্থানের কাছাকাছি নেমে আসবে। বিশ^ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রাথমিকভাবে আমাদের অগ্রগতি ভালো। আশা করি চলতি বছর সূচকে আমরা ব্যাপক অগ্রগতি করব। কারণ অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু পর্যালোচনায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম।

প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংস পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হলে সেটার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সালমান এফ রহমান বলেন, এ বিষয়ে অনেক জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। এটা সিরিয়াসলি আমরা কনসিডার করছি। এখানে দুটি জিনিস। একটা হলো রিটেইনড আর্নিংসের ওপর ট্যাক্স। এচকুয়ালি এটা ডাবল ট্যাক্স হয়ে যাচ্ছে। রিটেইনড আর্নিংস অলরেডি ট্যাক্স পেইড। এটা পয়েন্টেট আউট করা হয়েছে। রিটেইনড আর্নিংসের ওপর কর আরোপ করা হলে তা ডাবল করে রূপান্তরিত হবে, যা কোম্পানির বিনিয়োগ বাড়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। ফলে চূড়ান্ত বাজেটের আগে সরকার বিষয়টি সিরিয়াসলি বিবেচনা করবে।

সালমান এফ রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা, বাংলদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ-বেজা, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বেপজাসহ সরকারের সব সংস্থা কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের খুব সহজে সেবা দেওয়ার কাজ চলছে। উদ্যোক্তারা আমাদের কাছে আগে। এজন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস খুব শিগগিরই কার্যকর হবে। একটি সেবা সংস্থার আওতায় সব সেবা মিলবে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাজেটে ট্রেড লাইসেন্স করতে ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০০ টাকা করার প্রস্তাব  দেওয়া হয়েছে। এটা করা হলে ডুইং বিজনেসে আরও পাঁচ ধাপ পিছিয়ে যাবে। এ বিষয়গুলো এনবিআরের কাছে তুলে ধরতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ এফডিআই বাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে পুনঃবিনিয়োগ। অর্থাৎ আগের বছরে যেসব কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে, ওই কোম্পানি মুনাফার অর্থ পুনঃবিনিয়োগ করেছে। যতটুকু নতুন বিনিয়োগ এসেছে, তার মধ্যে বেশি অবদান রেখেছে দুটি প্রকল্প। এর মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার কিনে নিয়েছে চীনের শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ। এই প্রকল্পে চীনের ১১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া জাপান টোব্যাকো কোম্পানি আকিজ গ্রুপের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে, এটি বিনিয়োগে যোগ হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে আলোচ্য বছরে বাংলাদেশে বেশি বিনিয়োগ করেছে চীন। এ সময়ে দেশটির মোট বিনিয়োগ ১০৩ কোটি ডলার। এরপরই রয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির বিনিয়োগ ৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ ৩৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, সিঙ্গাপুর ১৭ কোটি ১০ লাখ, হংকং ১৭ কোটি ডলার, ভারত ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

সংস্থাটির রিপোর্ট অনুসারে ২০১৮ সালে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিভিন্ন দেশে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে  স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৯৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবে এর ব্যাখ্যায় বিডা বলেছে, এটি বিদেশিরা লভ্যাংশ হিসেবে নিয়ে গেছে।